.
১৪.
কৃষ্ণপক্ষ। তিথি বোধ হয় ত্রয়োদশী। ঘন অন্ধকার। আকাশের তারার আলোও এই নিবিড় অন্ধকারকে বিন্দুমাত্র হালকা করতে পারছে না। হয়তো মৃণালকুঞ্জের বড় বড় গাছগুলির মাথা থেকেও আঁধার ছড়িয়ে পড়েছে বলে চারপাশে কোনও কিছুই চোখে পড়ে না।
রাত শেষ হওয়ার মুখে। হেনা ঝোঁপের আড়াল থেকে যে বদ গন্ধটা ছড়ানো হয়েছিল সন্ধেবেলায়, সেটাও নেই। ফটকের সামনে ধুনুচি।
কিকিরা জানেন, একেবারে রাত ফুরোবার সময় অতি অস্পষ্ট একটু আলো ফুটতে পারে অল্পের জন্যে। সে কিছুই নয়। এখনও খানিকটা দেরি আছে তার। চৈত্রের এই শেষরাতে বাতাস দিচ্ছিল। এলোমেলো। তবু ঠাণ্ডা। গাছপালার পাতার শব্দ শোনাই যায় না।
মৃণালকুঞ্জের বাইরে মাঠঘাট অসাড়। যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
কিকিরা আর অপেক্ষা করলেন না।
প্রথমে ধরা যায় না, বোঝাও যায় না। সামান্য পরে বোঝা যায় এই শব্দবাঁশির। সাপুড়িয়ার বাঁশির সুর। জোর নয়, আবার ধীরেও নয়।
কিকিরাকেও চেনা যায় না। দেখাও অসম্ভব। ঘন কালো আলখাল্লায় গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা। পায়ের সরু পাজামাটাও কালো। মাথায় কালো রুমালের ফেট্টি। এ যেন কোনও ভৌতিক চেহারা। চোখমুখ অবশ্য স্বাভাবিক রেখেছিলেন কিকিরা।
মৃণালকুঞ্জের পেছনের দিকেই গাছের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন কিকিরা। তাঁর বুকের কাছে ঝোলানো বিদেশি ক্যাসেট প্লেয়ারে সাপুড়িয়া বাঁশির রেকর্ড করা টেপটা বাজছিল। এই প্লেয়ারটার সুবিধে হল, দেখতে ছোট-আওয়াজ অত্যন্ত স্পষ্ট, শব্দ বাড়ানো কমানো তো মামুলি ব্যাপার, তার চেয়েও বড় কথা, টেপের অটোমেটিক রিওয়াইন্ডিং সিস্টেম আছে। ফলে হাতে করে পালটাতে হয় না। টেপ শেষ হয়ে নিজের থেকেই আবার গোড়া থেকে বাজতে শুরু করে। একটানা যতক্ষণ খুশি বাজাও। তবে অসুবিধে এই যে, কিকিরাকে ব্যাটারিতে বাজাতে হচ্ছিল। যদিও এই জাতের ব্যাটারি হালে বাজারে এসেছে, আয়ু বেশি–তবু তার ইতি আছে একসময়।
আপাতত কিকিরা সে-কথা ভাবছিলেন না। ভাববার কারণও ছিল না।
কিকিরা ঠিক এক জায়গায় না দাঁড়িয়ে থেকে মাঝে মাঝে আড়াল রেখে সরে যাচ্ছিলেন। ফলে বাঁশির আওয়াজও নির্দিষ্ট একই জায়গা থেকে আসছিল না। সরে যাচ্ছিল।
পাঁচ দশ পনেরো কুড়ি মিনিটকতটা সময় কেটে যাচ্ছে তার হিসেব কিকিরা করছিলেন না।
শুকতারা জ্বলজ্বল করছে। চৈত্রের এই ভোররাতের বাতাসে গা সিরসির করে উঠল সামান্য।
এমন সময়, যা আশা করেছিলেন কিকিরা, তার আভাস পেলেন।
দেখা যায় না। তবু ছায়ার মতন কে যেন বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে। পেছনের দিকেই হেঁটে আসছিল।
কিকিরা জানেন, তারাপদ আর চন্দন–যে যার মতন জায়গায় লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজন বারান্দার থামের আড়ালে, অন্যজন কুয়োতলার বাঁধানো পাড়ের আড়ালে।
বিপদ হতে পারে কিকিরার, নাও হতে পারে। ঝুঁকি নেওয়ার দরকার কী! তা ছাড়া সাহায্যের প্রয়োজন কখন কী হয়!
এবার একটু আলোর মতন দেখা দিল। মাত্র মুহূর্ত কয়েক। কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশীর চাঁদের রেখা দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল।
লোকটা, যা ভেবেছিলেন কিকিরা, পায়ে পায়ে সাবধানে দু’-দশ পা এগিয়ে টর্চ জ্বালল। ছোট টর্চ। বোধ হয় কাঁচের ওপর হাত চাপা দিয়ে রেখেছে–যাতে আলো না ছড়িয়ে পড়ে।
এপাশ ওপাশ দেখতে দেখতে লোকটা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। কী ভাবল। ওর এক হাতে টর্চ থাকলেও অন্য হাত ফাঁকা নয়। তবে সেই হাতে কী আছে কিকিরা দেখতে বা অনুমান করতে পারছিলেন না।
ছোরা, ভোজালি, চপার? না কি অন্য কোনও অস্ত্র?
লোকটি এবার ধীরে ধীরে সাবধানে এগিয়ে তুলসীমঞ্চ পর্যন্ত গেল। দাঁড়াল। দেখল। বসল। নীচেটাও দেখল। এবার টর্চের কাঁচে হাত নেই।
কিকিরা টেপ বন্ধ করে দিলেন।
আর সঙ্গে সঙ্গে একবার টর্চের আলো ফেলে চারপাশ দেখে–লোকটি বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। টর্চ নিভিয়ে।
কিকিরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
তাঁর কাজ হয়ে গিয়েছে।
তবু সামান্য অপেক্ষা করে বাড়ির দিকেই পা বাড়ালেন কিকিরা।
হালকা শিস।
তারাপদ আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।
বারান্দায় চন্দন।
কিকিরা নিচু গলায় চন্দনকে বললেন, “কাল সকালেই তুমি হরিবাবুর কাছে চলে যাবে। বলবে, দেরি না করে গাড়ি নিয়ে চলে আসতে।”
.
১৫.
হরিচন্দনবাবু বললেন, “রায়, তুমি ওই তুলসীমঞ্চটা ভেঙে ফেলতে বলছ?”
“হ্যাঁ। একেবারে পুরোপুরি। মাটি পর্যন্ত খুঁড়ে ফেলতে হবে।”
মৃণালকুঞ্জর সকলেই হরিচন্দনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন।
হরিচন্দন সামান্য ইতস্তত করে বললেন, “এই চৈত্রমাসে তুলসীমঞ্চটা ভেঙে ফেলবে!”
“উপায় নেই, দাদা!”
জলধর হঠাৎ বললেন, “ওটা আমি বৃন্দাবন থেকে আনিয়েছি। পবিত্র বৃন্দাবন থেকে আনানো তুলসী চারাটাকে কষ্ট করে বাঁচিয়ে রেখেছি, ওটা আপনাদের কী দোষ করল?”
কিকিরা কোনও জবাব দিলেন না জলধরের কথার, হরিচন্দনকে এগিয়ে যেতে বললেন।
“বেশ। ওদের ডাকো।”
মালী চৈতন্য, কাজের লোক নকুল, এমন কী রাধুঠাকুরকেও ডেকে নিলেন কিকিরা। ড্রাইভার বনমালীকেও দেখা গেল।
ব্যাপারটা যে কী হচ্ছে, মৃণালকুঞ্জর বাসিন্দরা বুঝতে পারছিলেন না।
হরিচন্দনের পেছনে পেছনে সকলেই তুলসীমঞ্চর দিকে এগিয়ে গেলেন। রোদ চড়ছে। নকুল একটা ছাতা এনে দিল হরিবাবুকে। ততক্ষণে বনমালী ড্রাইভারও এসে দাঁড়িয়েছে। মালী চৈতন্য কোদাল আর শাবলও নিয়ে এল।
