আসিনি। অত রাতে মাঠঘাট ভেঙে ঠাণ্ডায় কুয়াশায় একা আসা যায়! আমার সঙ্গে শিবপ্রসাদ ছিল। কারখানার দরোয়ান। তাকে আমি নিয়ে গিয়েছিলাম। ওকে সঙ্গে নিয়েই ফিরেছি।”
“ফিরেছেন মানে কারখানায় ফিরেছেন। দরোয়ানের ঘরের পাশের কুঠরিতে শুয়ে রাত কাটিয়েছেন।”
“হ্যাঁ। … দেখুন ম্যানেজারমশাই, আমি গর্দভ নই। দরোয়ান শিবপ্রসাদ আমার চেনাজানা। ওর গুমটি ঘরের পাশে চারপাইয়ায় বসে আমি কতদিন চা বিড়ি খেয়েছি, সুখদুঃখের গল্প করেছি। আপনাদের লোক যে শিবপ্রসাদের কাছে গিয়েছিল, খোঁজখবর করেছিল আমার, আমি জানি। শিবু আমায় বলেছে।”
কিকিরা রীতিমতন অপদস্থ বোধ করলেন। চাঁদুর কথা তা হলে সবই শুনেছেন বলাইবাবু। হেরে গিয়ে ঘাবড়ে যাওয়ার মানুষ অবশ্য নন তিনি। বললেন, “কথাটা আপনি শুনলেও ব্যাপারটা অন্যরকম দাঁড়াচ্ছে বলাইবাবু। এই মৃণালকুঞ্জর সকলেই জানে, আপনি নিজেও বলেছেন যে, যাত্রা দেখে ফিরে এসে দেখলেন, শ্রীকান্তবাবু আগুনে পুড়ে ঝলসে গিয়েছেন। এখানের কাউকে কি বলেছেন আপনি, আসলে আপনি কোথায় ছিলেন মাঝরাতের পর থেকে? দরোয়ান শিবপ্রসাদ আপনার হয়ে সাক্ষী দিলেও এখানকার বাকিরা তো অন্য কথা বলবেন! তাই না?”
বলাইবাবু চুপ। টাক মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন।
কিকিরা বললেন, “আপনার কি মনে হয় না, ওয়ান ভার্সেস ফাইভ হলে ব্যাপারটা কোন দিকে ঝুঁকে পড়বে? কেন আপনি সেদিন ছিলেন না তার না হয় কারণ দেখালেন! কিন্তু মিথ্যে কথাটা বলতে গেলেন কেন? আইন কী বলবে আপনি বুঝতে পারছেন!”
বলাইবাবু এবার যেন বিচলিত হলেন। বিড়িও ধরিয়ে নিলেন অভ্যাশবশে।
“আপনি কথা লুকোচ্ছেন! কেন?”
বলাইবাবু কী বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। বিড়ির টুকরোটা ফেলে দিলেন জানলা দিয়ে। শেষে বললেন, গলার স্বর একেবারে পালটে গিয়েছে। বললেন, “ম্যানেজারবাবু, মানুষ ভাবে এক, হয় আর-এক। আমি শ্রীকান্তবাবুকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম, পারলাম না।”
কিকিরা তাকিয়ে থাকলেন। অপলক।
“সেদিন আমি যদি ঘুমিয়ে না পড়তাম শিবপ্রসাদের ওখানে, তা হলে হয়তো ওই ঘটনা ঘটত না। ঘুমই আমার কাল হল! বুড়ো মানুষ, অতটা হাঁটাহাঁটি, ঠাণ্ডা–শরীরে অত ধকল সয়নি। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”
“আপনি তা হলে জানতেন শ্রীকান্তবাবু..”
“আন্দাজ করেছিলাম। তবে ওঁর বিপদ হতে পারে জানতাম। আগুন ধরে যাবে জানতাম না।“
“কেমন করে জানলেন?”
“তবে আগের কথাটা বলি। শ্রীকান্তবাবু মানুষ খারাপ ছিলেন না। শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে খুঁতখুঁতুনি ছিল। তা সেটা থাকতে পারে। ওঁর যেটা বদ অভ্যেস ছিল–উনি ভীষণ সন্দিগ্ধ স্বভাবের ছিলেন। লুকিয়ে অন্যের কথা শুনতেন, অন্যের চিঠিপত্র এলে লুকিয়ে পড়তেন। মুখ বন্ধ খাম হলে দেখতেন সেটা খোলা যায় কিনা। না গেলে অবশ্য খুলতেন না। … তা একদিন একটা ব্যাপার হল। চৈতন্য গিয়েছিল বাজারে, সকালের দিকে তেমাথার মোড়ে। ফেরার সময় দুটো চিঠি নিয়ে এল। একটা মুরলীদার। অন্যটা জলধরবাবুর। জলধরের চিঠিটা ছিল খামে। তবে ভাল করে আঁটা ছিল না। আজকালকার খামের মুখে আঠার যা হাল! শ্রীকান্তবাবুর যা অভ্যেস, চিঠি খুলে পড়া। উনি সেই কাজটিই করলেন।”
কিকিরা বললেন, “কী ছিল চিঠিতে?”
“কী ছিল! যা ছিল তা তো বিশ্বাস করা যায় না। জলধরকে একজন শাসানো চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে লিখেছে, অনেক ঘুরে আট-আটটি বছর অপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত সে খুঁজে পেয়েছে প্রতারক জোচ্চোর জলধরকে। “
“প্রতারক!”
“ওই চিঠিতেই ছিল–আগামী আটই নভেম্বর–সে আসবে। পুজোর কথা অবশ্য ছিল না। তবে জগদ্ধাত্রী পুজোর পরের দিনই আট তারিখ। ভোররাত্রেই সে আসবে। হিসেবনিকেশ শেষ করবে সেদিনই। তার আসার সংকেত হবে বাঁশি। সাপুড়ের বাঁশি।”
কিকিরা আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন। মনে মনে যেন ভাবছিলেন কিছু।
বলাইবাবু বললেন, “অদ্ভুত একটা ব্যাপার হল, চিঠির একপাশে আঁকা একটা সাপের ছবি।”
“সাপের ছবি। ছাপা?”
“না; হাতে আঁকা। কালো কালিতে। কলমে।”
“চিঠি যে লিখেছে তার নাম?”
“নাম দেয়নি পুরো। শুধু ইংরিজিতে ছোট করে লেখা বি.এস।”
“চিঠিটায় সেন্ডারের ঠিকানা ছিল না?”
“না।”
“পোস্ট অফিসের ছাপ, সিল…”
“পড়া যায় না।”
কিকিরা কী যেন ভেবে বললেন, “তা এই চিঠির কথা আপনি জানলেন কেমন করে?”
“শ্রীকান্তবাবু আমাকে দেখিয়েছিলেন। তা ছাড়া চিঠিটা আমিই জলধরবাবুকে দিই।”
“খামের মুখ খোলা অবস্থায়?”
“একেবারে খোলা অবস্থায় নয়। একটু মুখ এঁটে।”
“চিঠির কথা আর কেউ জানেন না?”
“মুরলীবাবু আর শ্রীকান্তবাবু একই ঘরে থাকতেন। মুরলীবাবু জানলেও জানতে পারেন। শ্রীকান্তদা অন্য কাউকে বলেছিলেন কিনা বলতে পারব না।”
কিকিরা এবার নিজের সরু চুরুট ধরালেন। মাথার চুল ঘাঁটলেন। ভাবছিলেন।
বলাইবাবু বললেন, “একটা উড়ো চিঠি পেয়ে চট করে সব বিশ্বাস করা যায় না, ম্যানেজারবাবু! তা ছাড়া ওই চিঠিটা তো হেঁয়ালির মতন। স্পষ্ট করে লেখা নেই কিছু। প্রতারক বললেই কি প্রতারক হয়! কীসের প্রতারণা? কবে কখন করা হয়েছে? কাজেই আমরা চুপচাপ ছিলাম। তবে হ্যাঁ, শ্রীকান্তবাবুকে দেখতাম জলধরকে দেখলেই কেমন একটা মুখ করতেন।”
“আর আপনি?”
“আমি কিছু বুঝতে দিইনি জলধরবাবুকে। তবে সাবধানে থাকতাম। … আসলে কী জানেন, সেদিন–মানে জগদ্ধাত্রী পুজোর দিন জলধর যখন বললেন, নিজেই, আমার সঙ্গে যাত্রা দেখতে যাবেন, তারপর যাওয়ার সময় হঠাৎ মত পালটে নিলেন, তখনই আমার মনে মনে কেমন যেন লাগল। ভেতরে একটা কু গাইল। মানুষের মন তো! … আমি পালার মাঝখানে উঠে এলাম। ভেবেছিলাম, শেষরাতে এখানে ফিরে আসব। যদি কিছু হয়! কিন্তু ঘুমই আমার সর্বনাশ করল। সময় মতন আসতে পারলে হয়তো অগ্নিকাণ্ড আটকাতে পারতাম। পারিনি। বড় কষ্ট হয় নিজের বোকামির জন্যে।”
