আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কিকিরা তুলসীমঞ্চটা দেখলেন। “তারা, তুলসীগাছের এত যত্ন কারা করে? হিন্দুবাড়িতে বিধবারা করে, বুড়িরা করে। মেয়ে বউরাও সন্ধেবেলায় প্রদীপ দে,। এখানে তেমন কেউ নেই। তবে হ্যাঁ, জলধরবাবু আছেন। বোধ হয় উনি পরম বৈষ্ণব। … নাও, চলো।”
কিকিরার পাশে পাশে হাঁটতে লাগল তারাপদ।
বাড়ির সামনের দিকে এসে তারাপদ বলল, “আপনি সামান্য একটা তুলসীমঞ্চ দেখে এত গম্ভীর হয়ে গেলেন কেন?”
“গম্ভীর হলাম কোথায়! ভাবি। আগেও নজরে এসেছে মঞ্চটা, কিন্তু মাথা ঘামাইনি।”
“কী ভাবছেন?”
“জলধরবাবুর কথা ভাবছি। … আচ্ছা, ওই মঞ্চটার গায়ে যে চুনকাম করা দেখলে, তা নতুন নতুন মনে হল না! মানে, আগেও চুনকাম ছিল, আবার কলি ফেরানো হয়েছে। তাই না!”
“বোধ হয়। আমি কি অত খেয়াল করেছি?”
“যাক গে, তুমি যাবে কখন?”
“এবার যাব। বাস ধরতে হবে।”
“চলো, একটু চা খেয়ে যাও। এখনও আলো আছে। তুমি ঠিক সময়ে গিয়ে বাস ধরতে পারবে।”
ঘরে আসার আগেই কিকিরা রাধুঠাকুরকে ডেকে এক কাপ চা করে দিতে বললেন।
চা খেয়ে তারাপদ যখন চলে যাচ্ছিল, কিকিরা তাকে এগিয়ে দিতে গিয়ে হঠাৎ বললেন, “আগামী শনিবার তোমরা এখানে থাকবে রাত্রে। আমার গেস্ট। চাঁদুকে বোলো। রবিবার তার ছুটির দিন।”
.
১৩.
পরের দিন খানিকটা বেলায় বলাইবাবু সকালের ঘোরাফেরা শেষ করে ফিরে আসতেই দেখলেন, কিকিরা বাইরের বারান্দায় বসে আছেন।
কিকিরা দেখছিলেন বলাইবাবুকে। ভদ্রলোক রোদের তাতে ভ্যাপসা গরমে যেন ভিজে জল হয়ে গিয়েছেন। মুখে গলায় ঘাম, গায়ের জামাও ভিজে রয়েছে অনেক জায়গায়।
“কী মশাই, চান করে এলেন যে!” কিকিরা বললেন।
রুমালে মুখ মুছতে মুছতে বলাইবাবু বললেন, “বেলা হয়ে গেল! যা চড়া রোদ।”
“কোথায় গিয়েছিলেন?”
“ওই দুগা ভাণ্ডারে। বকুলপুরের তেমাথায়।”
“মর্নিং ওয়াক করতে?”
“আরে না মশাই, দু-একটা জিনিস কেনার ছিল। দাড়ি কামানোর সাবান ফুরিয়েছে, ব্লেডও নেই। আমার আবার বড় ঘামাচি হয় গরমে। বরিক পাউডারের সঙ্গে মামুলি কিছু মিশিয়ে নিই। তাও এত বেলা হত না। তেমাথায় গেলাম যখন তখন একবার পোস্ট অফিসটাও ঘুরে এলাম। ছোট পোস্ট অফিস। চিঠিপত্তর ..”
“ও! আপনাদের এখানে চিঠিপত্র বিলি করার লোক আসে না?”
“না। কে আসবে এতদূর! তবু যখন কারখানাটা ছিল একটা পিওন আসত সাইকেলে চেপে। আসত কারখানার জন্যে। মাসোহারা ছিল। তখন তবু তার টিকি দেখতাম এখানে। কারখানা পর্যন্ত আসত বলে আরও একটু এগিয়ে আমাদের কৃপা করে যেত। হালফিল আর আসে না। পুজোর সময় এক-আধদিন হয়তো আসে। বকশিশ তো নিতে হবে।”
“বসুন না! দাঁড়িয়ে কেন?”
“বড় ঘামছি।”
“আমার ঘরে যাবেন! পাখার তলায় বসবেন খানিক।”
“চলুন।” বলে পা বাড়িয়ে নকুলকে ডাকলেন। বার কয়েক।
নকুল কাজে ব্যস্ত ছিল। সময় লাগল আসতে।
দুটো পোস্টকার্ড আর একটা ইনল্যান্ড এগিয়ে দিলেন বলাইবাবু। বলে দিলেন কাকে কাকে দিতে হবে।
কিকিরা বললেন, “মাত্র তিনটে চিঠির জন্যে আপনি”।
“ভাল কথা বললেন আপনি! চিঠি–! আমাদের কে চিঠি দেবে! মাসান্তে কারও যদি একটা আসে! আসেও না। ন’মাসে ছ’মাসে বড়জোর একটা পোস্টকার্ড। আমরা আছি এই পর্যন্ত। দু-একটা চিঠি যা আসে, পড়ে থাকে পোস্ট অফিসে। কেউ যখন যায় ওদিকে, নিয়ে আসে হাতে হাতে।”
কিকিরারা ঘরে এলেন। পাখা চালিয়ে দিলেন তিনি। নিজের হাতে জল গড়িয়ে দিলেন বলাইবাবুকে।
বলাইবাবু জল খেলেন। তেষ্টা পেয়েছিল খুব। জল খেয়ে আরামের শব্দ করলেন।
“একটা বিড়ি দিন, খাই। আছে নাকি পকেটে?”
“আছে। নিন। … এই তো তিন বাণ্ডিল কিনে আনলাম।”
বিড়ি ধরানো হয়ে গেল দু’জনেরই।
কিকিরা দু-পাঁচটা সাধারণ কথার পর বললেন, “বলাইবাবু, আজ সন্ধেবেলায় দাবায় বসবেন নাকি? না হলে একবার আসতেন এখানে!”
“কেন? রোজ তো দাবায় বসি না। সময় কাটাবার জন্যে বসি মাঝে মাঝে। সলিলবাবু কাঁচা খেলোয়াড়। আমিও পাকা নই। রজনীবাবু দাবা বোঝেন না। এ ব্যাপারে মাস্টার ছিলেন মুরলীবাবু। তা তিনি তো আর নেই। … আপনি জানেন নাকি দাবা?”
মাথা নাড়লেন কিকিরা। “আমি একেবারেই অচল। গজ নৌকো কাকে বলে তাও জানি না।”
বলাইবাবু বিড়ির ধোঁয়া টানলেন। “সন্ধেবেলায় আসতে বলছেন কেন?”
“আমার একটু দরকার আছে। “
“দরকার! আমার সঙ্গে!”
“কথা আছে।”
“এখনই বলুন না!”
“এখন হবে না। সন্ধেবেলায়–! কেন, আপনি …”
“না না, আমার আর কী কাজ! আসব!”
কিকিরা বিড়ি টানতে টানতে বললেন, “কড়া নাকি?”
“মিঠেকড়া।”
হাসলেন কিকিরা।
.
সন্ধেবেলায় বলাইবাবু হাজির। কিকিরা বসতে বললেন। মৃণালকুঞ্জর ব্যবস্থা নিয়ে দু’-দশটা মামুলি কথা।
শেষে কিকিরা বললেন, “আপনার কাছে কয়েকটা কথা আমি জানতে চাই। হরিবাবুও আপনার কথা বলেছেন।” শেষের কথাটা বানানো।
বলাইবাবুর চোখে যেন চাপা হাসি। বললেন, “আপনি কী জানতে চান আমি জানি।”
কিকিরা অবাক! “জানেন?”
মাথা হেলিয়ে বলাইবাবু বললেন, “যাত্রা দেখার কথা! সেদিন আমি কেন পুরো পালা না দেখেই চলে এসেছিলাম?”
কিকিরা অবাক হলেন। বললেন, “আপনি আমায় আগে অন্য কথা বলেছেন। বলেছিলেন পালা শেষ হওয়ার পর আসরে বসে বাকি রাতটুকু কাটিয়ে আপনি এখানে ফিরেছেন।”
“তাই বলেছিলাম। … ওটা ঠিক কথা নয়। যাত্রা শুরু হতে দেরি হয়েছিল। আমি ঘণ্টা দুয়েক ছিলাম। তারপর ফিরে আসি। একলা
