“শ্রীকান্তবাবু মারা যাওয়ার দিন, মুরলীবাবুর চলে যাওয়ার দিনও
“মুরলীবাবু চলে যাওয়ার দিন আমি এখানে ছিলাম না। বাঁশি শুনব কেমন করে? পরের দিন যখন ফিরে এলাম এখানে তখন কী অবস্থা যাচ্ছে বুঝতেই পারছেন! ফটকের কাছে কী আছে না আছে কে আর নজর করবে?”
“প্রথমবার, মানে শ্রীকান্তবাবুর ওই ঘটনার দিন–?”
“মনে করতে পারছি না।”
“এখানে আর কোনও দিন সাপুড়ের বাঁশি শুনেছেন?”
“তা শুনেছি। ..ম্যানেজারবাবু, এটা একরকম গ্রাম। মাঠঘাট খেত ঝোঁপঝাড় চার পাশেই। সাপ এখানে থাকবেই। এই বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে গরম বর্ষায় সাপ দেখা যায়। আমরা সাবধানে থাকি। …তা ছাড়া, এই আপনার শীত আসার সময় থেকে দেখেছি– মাঝে মাঝে বেদেরা মাঠেঘাটে সাপ ধরতে আসে। বাঁশিও বাজায়। তবে কীভাবে সাপ ধরে জানি না। শুনেছি ওটা ওদের জন্মগত শিক্ষা। গর্ত দেখলেই বুঝতে পারে। সাপ ধরে বিক্রিও করে বলে শুনি। বিষ থেকে নাকি ওষুধ হয়।”
কিকিরা আর কথা বাড়ালেন না। সলিলবাবুও উঠে পড়লেন।
.
১২.
তারাপদ এসেছিল ঠিক দিনে। হাতে একটা মাঝারি কিট ব্যাগ।
কিকিরা ব্যাগ খুলে দেখে নিলেন যা যা চেয়েছিলেন সব আছে কি না!
“এভরিথিং ও-কে, সার?”
মাথা হেলিয়ে সায় দিলেন কিকিরা।
“কতটা এগুলেন?”
“খানিকটা। সলিলবাবু বাদ গেলেন।”
“মানে, সাসপেক্ট নন।”
“না। অন্তত পনেরো আনা নয়।”
“বলাইবাবু?”
“এখনও চেপে ধরিনি। আজ ধরব।”
“চাঁদু কাল এসে কারখানার দরোয়ানজিকে ম্যানেজ করে গিয়েছে, জানেন?”
“না। এখানে আসেনি। ভালই করেছে। … সরাসরি নজরের বাইরে থাকতেই বলেছিলাম। রেজাল্ট কী? কারখানার ভেতরে ঢুকেছিল?”
“এক নজর দেখেছে। তবে কারখানার ফটকের ও-পাশে দরোয়ানজির ঘর। ফটকের গা ঘেঁষে। সেই ঘরের গায়ে গায়ে আরও একটা ছোট ঘর আছে। চাঁদু বলল, কারখানা থেকে জিনিস বেরুবার সময় ওই ঘরে বসে, কেউ চেকিং করে নিত। মোদ্দা কথা, ডেলিভারি জিনিসের হিসেব রাখত।”
“ঘরে কিছু পেয়েছে?”
“তেমন কিছু নয়। ঘরে একটা দড়ির খাঁটিয়া, একটা ধুলোভরা ভুটকম্বল, আর এক পাটি জুতোর ছেঁড়া ফিতের টুকরো।”
কিকিরা কৌতূহল বোধ করলেন। “ফিতের রং।”
“খাকি। তাই তো বলল।”
কিকিরা কী যেন ভাবছিলেন। পরে বললেন, “চলো, একটু বাইরে যাই।”
বাইরে বিকেল নেমেছে আগেই। চৈত্রমাস বলে আলো রয়েছে যথেষ্ট। রোদও ফুরোয়নি। গাছের মাথার দিকে উঠে যাচ্ছে রোদ। গরম যেন সামান্য কম। গত পরশুর কালবৈশাখী আর বৃষ্টির পর তাপ কমেছে অল্প।
তারাপদকে নিয়ে বাইরে এসে ঘুরতে ঘুরতে সবজি বাগান আর পুকুরের কাছে এলেন কিকিরা।
“বসবে? থাক, মাটি এখনও তলার দিকে ভিজে। কাদা লাগতে পারে। একটা সিগারেট দাও।”
তারাপদ সিগারেট দিল।
সিগারেট ধরিয়ে চারপাশে তাকাতে তাকাতে কিকিরা হঠাৎ বললেন, “ওদিকটায় দেখো,” বলে হাত তুলে আঙুল দিয়ে কী যেন দেখালেন।
তারাপদ বলল, “কী দেখব?”
“ওই যে দেখছ জায়গাটা, যত রাজ্যের ভাঙা ইট, পাথর, রাবিশ জড়ো হয়ে ঢিবি হয়ে আছে ঠিক ওইখানে পড়ে গিয়েছিলেন মুরলীবাবু। ঝাঁপ দিয়েছিলেন বলেন এঁরা।”
“ওটা পরিষ্কার করাননি?”
“না। এখনও করাইনি। লাভও বা কী হবে! … একটা জিনিস লক্ষ করছ? মৃণালকুঞ্জর বাড়ির ওটা পেছন দিক। দোতলার বারান্দা দেখা যাচ্ছে। বারান্দার গায়ে রজনীবাবু, বলাইবাবুদের ঘর। পাশাপাশি।”
তারাপদ দেখল। “ওটা কী সাদা মতন?”
“কোনটা?”
“ওই যে ঢিবির প্রায় পাশেই। “
“ওটা তুলসীমঞ্চ।” বলেই একেবারে আচমকা কিকিরার কী মনে হল, বললেন, “জলধরবাবু রোজ সকালে মঞ্চের কাছে এসে হাত জোড় করে প্রণামট্রনাম করেন। কয়েকটা তুলসীপাতা ছিঁড়ে মুখে দেন। বলেন, তুলসীপাতা হল ভীষণ উপকারী, সব বয়েসের মানুষের পক্ষে। তুলসীপাতার রস দিয়ে ওষুধও হয়।”
তারাপদ হেসে বলল, “মধু আর তুলসীপাতা … সর্দিকাশিতে বাচ্চা বেলায় খেয়েছি।”
“চলো।”
“কোথায়?”
“ওই তুলসীমঞ্চটা একবার দেখি। অত সাদা দেখাচ্ছে। হালে চুনকাম করেছে নাকি কেউ?”
তারাপদ এগিয়ে চলল কিকিরার সঙ্গে।
মঞ্চের কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন কিকিরা। ইট দিয়ে বাঁধানো তুলসীমঞ্চ। ফুট তিনেক উঁচু। তুলসীগাছের পাতাগুলি সব সবুজ নয়, রোদের তেজে কিছু পাতা শুকিয়ে এসেছে।
কিকিরা মন দিয়ে মঞ্চ আর গাছটি দেখছিলেন। চোখে পড়ল, রজনীবাবু দশ-পনেরো হাত তফাতে নিজের মনে কী যেন দেখছেন।
কিকিরা ডাকলেন রজনীবাবুকে।
রজনীবাবু এগিয়ে এলেন ধীরে ধীরে। হাতে খুরপি।
“রজনীবাবু? আপনাদের এখানে আর তুলসীঝোপ নেই?”
“কেন থাকবে না; আছে।”
“এটি মঞ্চ। বাঁধিয়ে করা।”
“জলধরবাবু করেছেন। উনি বলেন, এটি বৃন্দাবনী তুলসী। নিজেই তুলসীচারা আনিয়ে মঞ্চ করেছেন। বৃন্দাবনের মাটি … পুণ্যস্থান …”
“ও! নিজের হাতেই করেছেন নাকি?”
“না। বাইরে থেকে রাজমিস্ত্রি ধরে এনেছিলেন। যা করেছেন নিজেই দাঁড়িয়ে থেকে। “
“ধর্মেকর্মে ভদ্রলোকের খুব মতি। সকালে মুখে তুলসীপাতা না দিলে ওঁর মুখ শুদ্ধ হয় না। সন্ধেবেলায় দু হাতে তালি বাজিয়ে নমঃ গোবিন্দ জয় গোবিন্দ করেন।” কিকিরা যেন মুচকি হাসলেন। “এই মঞ্চটি কবে তৈরি হয়েছে?”
“কবে! গত গরমে। বর্ষার আগে আগেই। বর্ষার জলে গাছটা বেড়ে উঠল। এখন একটু শুকোবে। আবার বাড়বে বর্ষায়।”
কিকিরা আর কিছু বললেন না।
রজনীবাবুও সরে গেলেন অন্য পাশে।
