খানিকটা ধাঁধায় থাকলেন সলিলবাবু। কী মনে করে পরে বললেন, “আপনাকে যদি সত্যি কথাটাই বলি–তাতে কী লাভ হবে আমার!”
“বেশ তো, আমায় না বলেন, হরিবাবুকেই বলবেন। “ কিকিরার গলা শুনে মনে হল তিনি জোরজবরদস্তি করছেন না। “হরিবাবু শীঘ্রি একদিন আসছেন এখানে। তাঁকেই বলবেন। তবে কথা কী জানেন সলিলবাবু, আমায় বললে আপনার কোনও ক্ষতি নেই। হরিবাবুকে আমি বোঝাতে পারব। আর আপনি আমায় না বললেও হরিবাবুর কাছ থেকে আমি জানতে পারব।”
সলিলবাবু ভাবছিলেন। নস্যি নেওয়ার অভ্যেস আছে তাঁর। পকেট থেকে নস্যির ডিবে আর ময়লা রুমাল বার করে নস্যি নিলেন। “আপনাকেই বলি। বিশ্বাস করবেন আমার কথা?”
“কেন করব না। আমাকে দিয়ে আপনার ক্ষতি হবে ভাবছেন কেন! সত্যি কথা বললে লাভও হতে পারে।”
সলিলবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তা হলে বলি, সেদিন মেয়ের বাড়িতে আমি ঘণ্টা দুয়েকও ছিলাম না। মেয়ে-জামাইয়ের ওপর আমার টান কম। নাতিটার টানেই যাই। মেয়ের কাছে যাব কী বলুন! গেলেই শুধু টাকার কথা। আজ পাঁচ হাজার চায়, কাল সাত হাজার, পরশু দশ হাজার। টাকা চায় জামাইয়ের ব্যবসার নাম করে। এটার জন্যে দরকার, ওটার জন্যে দরকার। জামাইয়ের উসকানি আছে, জানি। জামাইয়ের দোকান তো খারাপ চলে না। তবু কেন যে এত চাই চাই! জামাইটি আমার ভাল নয়। বিয়ের সময় থেকেই কম দিইনি। আমার সারা জীবনের যা উপার্জন সঞ্চয়, তার অর্ধেকটাই ওদের জন্যে খরচ হয়ে গিয়েছে। …আর ভাল লাগে না। সেদিন মেয়ে হাজার দশেক টাকা চেয়ে বসল জামাইয়ের নাম করে। আমার মাথা গরম হয়ে গেল। ঘেন্নাও হল। মেয়েকে বললাম, ‘পারব না।’ বলেই ও বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।”
চুপ করলেন সলিলবাবু, যেন দম নিচ্ছিলেন। কিকিরা শুনছেন মন দিয়ে। বৃষ্টি বুঝি থেমে এল। শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না।
সলিলবাবু বললেন আবার। “আপনাকে একটা কথা বলি। মেয়েটি আমার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর। সে চলে যাবার পর আবার বিবাহ করতে হয়। আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর হাতেই মেয়ে আমার মানুষ। স্নেহ ভালবাসা কম পায়নি। তা আমার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীরও একটি সন্তান হয়। ছেলে। বিকলাঙ্গ বলতে পারেন। হাবাগোবা। বছর চোদ্দো-পনেরো বয়েস থেকেই তার মাথার গোলমালও দেখা দেয়। এখন সে পাগল। বাঁশদ্রোণীর দিকে একটা সাধারণ উন্মাদ আশ্রমে সে থাকে। আমি তাকে দেখতেও যাই। খরচাপাতিও দিতে হয়। সেদিন মেয়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছেলেকে দেখতে গেলাম। তার অবস্থা দেখলাম গুরুতর। ওখানেই সন্ধে হয়ে গেল। মনও খারাপ। আমি আর এখানে ফিরে আসার চেষ্টা করিনি। চেতলায় আমার এক বন্ধু আছে। সেখানেই রাত কাটিয়ে পরের দিন এখানে ফিরলাম। ফিরে দেখি ভয়ংকর অবস্থা। মুরলীবাবুকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে হেথ সেন্টারে। তাঁর বাঁচার আশা নেই।”
কিকিরা প্রতিটি কথা মন দিয়ে শুনেছেন। নিশ্বাস ফেললেন। দুঃখও হচ্ছিল সলিলবাবুর জন্যে।
“আপনি যদি খোঁজ নিতে চান–আমি সেই উন্মাদ আশ্রম আর বন্ধুর বাড়ির ঠিকানা দিচ্ছি, নিজে গিয়েও খবর করতে পারেন।”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। “আপনার কথা আমি এখন অন্তত অবিশ্বাস করছি। না।”
“আমি একবর্ণও মিথ্যে বলিনি। হরিবাবুকে আপনি আমার কথা জানাতে পারেন।”
“জানাব। …আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো?”
“কী বলব?”
“আপনি যে সেদিন ফিরতে পারবেন না এ-কথা কি এখানকার কাউকে বলেছিলেন?”
“দেখুন, আমরা সবাই বুড়ো মানুষ। এ তো বাচ্চাদের হোস্টেল বোর্ডিং নয় যে, কোথাও যেতে হলে আগে বলতে হবে, পারমিশন নিতে হবে! আর ফিরতে পারব না সেটা জানিয়ে যেতে হবে! দীনুবাবু জানতেন আমি কলকাতায় যাচ্ছি।”
“ফিরতে পারবেন না–তাও জানতেন।”
“না; কেমন করে জানবেন। আমার তো ফেরারই কথা।”
“ও! তা হলে এখানকার কেউই জানতেন না যে আপনি ফিরবেন না?”
“হ্যাঁ। …তবে আমি হয়তো রজনীবাবুকে বলেছিলাম, শীতের দিন, রাত হয়ে গেলে ঠাণ্ডা লাগিয়ে ফিরব না।”
“বলেছিলেন কিনা মনে করতে পারছেন না ঠিক?”
“না। রজনীবাবু আর আমি একই ঘরে আছি কতদিন ধরে। বললে ওঁকেই বলতে পারি; আর কাউকে নয়। তবে আমি ফিরতে পারব না, নিজেও কি জানতাম!”
কিকিরা বসার ভঙ্গি পালটে নিলেন। “রজনীবাবু মানুষটি বড় চুপচাপ। নিরীহ। নিজের মনে থাকেন। কেমন লাগে আপনার রুমমেটকে?”
“ভালই লাগে। উনি বরাবরই ওইরকম। শান্ত, সাতপাঁচে থাকেন না। ওঁরও অনেক দুঃখ আছে। ভাগ্যও বড় মন্দ। একবার মা, স্ত্রী আর একটিমাত্র ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলেন হরিদ্বার টরিদ্বার বেড়াতে। ঘোরাঘুরি করার সময় বাস উলটে অনেকেই মারা যায়। ওঁর মা, স্ত্রী, ছেলেকাউকেই আর তিনি ফিরিয়ে আনতে পারেননি। এই শোক কি সামলে ওঠা সম্ভব! উনিও পারেননি। চাকরি করতেন সাধারণ। সেখানেও মন বসাতে পারলেন না। রিটায়ার করলেন আগে আগে। হাতে টাকাপয়সাও জমল না। তারপর থেকে কোনও রকমে দুটো খেয়েপরে দিন কাটাচ্ছেন। ওঁর অভাবও রয়েছে। বুঝতে দেন না।”
কিকিরা এতটা জানতেন না। কষ্টই হল।
দু’জনেই নীরব। শেষে কিকিরা বললেন, “আর একটা কথা আপনাকে জিগ্যেস করি। দীনুবাবু যেসব কথা হরিবাবুকে বলতেন–তার মধ্যে সাপুড়ের বাঁশি, বিচ্ছিরি গন্ধ, ফটকের কাছে তুকতাক করার কথাও বলেছেন। আপনি..”
“আমিও শুনেছি।”
