“মেঘ হচ্ছে…”
“এখন কালবৈশাখীর সময়। চৈত্র মাস। “
“হলে ভালই। বড় গুমোট।”
“ঝড় হবে। আমার তাই মনে হচ্ছে। আকাশ কিন্তু কালো হয়ে আসছে ওদিকটায়।”
সলিলবাবু হাঁটতে লাগলেন। পাশে কিকিরা।
দু’-পাঁচটা এলোমেলো সাধারণ কথা। কিকিরা কলকাতা থেকে ফিরেছেন বেলা এগারোটা নাগাদ। রোদের তাতে সব যেন পুড়ে যাচ্ছে তখন। কলকাতায় আজ কী ভয়ংকর এক অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে বাসে বাসে ধাক্কা লেগে শ্যামবাজারের মোড়ে, তার কথা বলতে বলতে দশ-বিশ পা এগিয়ে এলেন কিকিরা, সলিলবাবুকে নিয়ে।
“না। ঝড় হবেই,” কিকিরা বললেন শেষে। ঝড়ের প্রথম ধুলো উড়ে এল।
আকাশ সত্যিই কালো হয়ে আসছে দেখতে দেখতে।
সলিলবাবুও মাথা হেলালেন।
“চলুন ভেতরে যাই। হঠাৎ ঝড় উঠলে ধুলোর ঝাঁপটা খেতে হবে।”
“ভেতরে আরও গুমোট।“
“আমার ঘরে বসবেন। পাখা আছে।”
সলিলবাবু আকাশের দিকে তাকালেন আবার। সামান্য আগেও মেঘগুলো এত কালো মনে হয়নি। সত্যিই ঝড় আসছে। মেঘের দল ছুটে আসছিল হু-হুঁ করে। রজনীবাবুও পা চালিয়ে ফিরে আসছেন।
পা বাড়ালেন সলিলবাবু, “চলুন।”
বারান্দায় উঠে এসে সলিলবাবু বললেন, “ঘরের দরজা জানলা খোলা আছে। বন্ধ করে দিয়ে আসি।”
“আসুন। রজনীবাবুও ফিরে আসছেন। তিনিই বন্ধ করে দিতে পারেন।”
“তা হোক। আমি যাই।”
কিকিরা বললেন, “আসুন তবে। আসবেন কিন্তু। আপনার সঙ্গে আমার ক’টা জরুরি কথা আছে।”
সলিলবাবু দেখলেন কিকিরাকে কয়েক পলক, তারপর চলে গেলেন।
দেখতে দেখতে ঝড় এসে গেল। কালবৈশাখীর ঝড়। মাঠঘাট থেকে ধুলো শুকনো পাতা খড়কুটো উড়িয়ে এনে চারপাশ অন্ধকার করে ফেলল। মেঘও ডাকছিল। সোঁদা গন্ধ ভেসে আসার পর পরই বৃষ্টি।
.
সলিলবাবু এলেন। কিকিরার ঘরে আলো জ্বলছে। পাখাও চলছিল। একটিমাত্র জানলা খোলা। ঝড় নেই; বৃষ্টি রয়েছে তখনও।
“বসুন,” কিকিরা বললেন।
বসলেন সলিলবাবু। কিকিরা নিজের খাটের ওপর বসে।
“আজকের রাতটা তা হলে স্বস্তি, কী বলুন,” বললেন কিকিরা। “রাতে ভালই ঘুম হবে।”
সলিলবাবু জবাব দিলেন না। ক’দিনের ভ্যাপসা গরমের পর আজকের ঝড়বৃষ্টি যে স্বস্তিদায়ক, তা তো জানা কথা।
কিকিরা অনর্থক বেশি ভূমিকায় গেলেন না। সরাসরি বললেন, “আপনাকে ক’টা কথা জিজ্ঞেস করি। আমি এখানে আসা পর্যন্ত নানান কথা শুনি। ভয়ও হয় একটু আধটু। রোগাপটকা মানুষ, বুঝতেই তো পারছেন। সাহস কম। …আচ্ছা সলিলবাবু, ওই ব্যাপারটায় আপনার কী ধারণা? প্রথম দুর্ঘটনাটার কথা বলছি। শ্রীকান্তবাবু যে আগুনে পুড়ে মারা গেলেন, এটা কি ওঁরই দোষে! মানে অসাবধানতার জন্যে?” বাকি কথাটা শেষ করলেন না কিকিরা।
সলিলবাবু তাকিয়ে থাকলেন। “কেন?”
“না, এমনি জিজ্ঞেস করছি। আপনাদের পুরনো ম্যানেজার দীনুবাবু হরিবাবুকে বলেছেন, এই বাড়িতে নাকি একটা অশুভ আত্মা প্রেতাত্মা ভর করেছে।”
সলিলবাবু বললেন, “দীনুবাবুর সেরকম ধারণা হয়েছিল আমরাও শুনতাম। কার কী ধারণা হয়, কেন হয়–কেমন করে বলব!”
“দ্বিতীয় ঘটনাটাও..”
“মুরলীবাবুর আত্মহত্যা সম্পর্কেও আমি কিছু জানি না। সেদিন আমি ছিলাম না। আগেই বলেছি আপনাকে।”
“মেয়ের বাড়ি গিয়েছিলেন কলকাতায়। ঢাকুরিয়ায়। ফিরতে পারেননি।”
“না।”
কিকিরা এবার চোখে চোখে তাকালেন সলিলবাবুর। তারপর হঠাৎ বললেন, “আপনি কি মেয়ের বাড়িতে ছিলেন সেদিন?”
সলিলবাবু যেন থতমত খেয়ে গেলেন। মুখটা কেমন কুঁচকে গেল। “ও কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?”
কিকিরা এবার সরাসরি বললেন, সামান্য শক্ত গলায়। “শুনলাম মেয়ের বাড়িতে আপনি দেখা করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু ছিলেন না।”
“কে বলল?” সলিলবাবু চমকে উঠলেন। গলা উঠল না।
“আপনার জামাই।”
সলিলবাবুর মুখচোখের চেহারা পালটে গেল। ভয় পেয়েছেন। বিভ্রান্ত। মুখ নামিয়ে নিলেন।
কিকিরা বললেন, “কথাটা ঠিক?”
সলিলবাবু চুপ। মুখ তুলছিলেন না।
অল্প সময় চুপ করে থেকে কিকিরা চমৎকার এক গল্প বানালেন। বললেন, “কাল আমি যখন হরিবাবুর বাড়িতে কয়েকটা কাজের কথা বলতে যাই, তখন দেখি সেখানে হরিবাবুর এক দূর সম্পর্কের ভাইপো বসে ছিলেন। ভদ্রলোক পুলিশ অফিসার। বড় অফিসারই। তাঁর সঙ্গে উনি কথাবার্তা বলছিলেন। এই বাড়ির কথাই। উনি দু-দুটো দুর্ঘটনার কথা শোনাচ্ছিলেন। অফিসার ভদ্রলোক প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়তে লাগলেন। আমার মনে হল, উনি বিশ্বাস করলেন না। “
সলিলবাবু কেমন যেন সন্ত্রস্ত হয়ে বললেন, “আমার কথা উঠেছিল?”
“আপনাদের দু’জনের কথাই উঠল। বলাইবাবু, আপনি”
“আমি সত্যিই সেদিন এখানে ছিলাম না। …কিন্তু আমার জামাইয়ের কথা কে বলল!”
“যেই বলুক আপনি নিজে কী বলেন! হরিবাবুই হয়তো তলায় তলায় খোঁজখবর করছেন।”
সলিলবাবু জবাব দিচ্ছিলেন না কথার। বৃষ্টি কমে আসছিল। ঠাণ্ডা বাতাস আসছে, ভিজে মাটি গাছপালার গন্ধ।
কিকিরা সলিলবাবুকে আরও ঘাবড়ে দিতে চাইছিলেন। বিশ্বাস করাতে চান পুলিশের ব্যাপারটা ফেলনা নয়। বললেন, “আপনি জানলেও জানতে পারেন, হরিবাবু এই দুটো দুর্ঘটনাকে মেনে নিতে পারছেন না। তাঁর সন্দেহ রয়েছে। তলায় তলায় তিনি খোঁজখবর নিচ্ছেন।”
সলিলবাবু হঠাৎ বললেন, “আপনি কে? পুলিশের কেউ?”
কিকিরা হেসে ফেললেন, “মশাই, আমার এই হ্যাংলা চেহারা। রোগাপটকা মানুষ আমি। বয়েসটাও বিবেচনা করুন। আমি কি পুলিশের লোক! আপনার কি মাথাখারাপ হয়েছে।”
