“আমি অন্য কোনও উপায় খুঁজছি। অসুবিধে কী জানেন, যাঁরা মারা গিয়েছেন তাঁদের তো আর ফিরে পাব না যে, দু’-এক কথা শুনে কাউকে সন্দেহ করব! মরা মানুষ সাক্ষী হয় না, দাদা!… তা সে অন্য কথা। আপাতত আমরা বলাইবাবু আর সলিলবাবুকে বাজিয়ে দেখি। তাঁরা দু জনেই কী লুকোতে চাইছেন!”
হরিচন্দন বললেন, “দেখো।…আমাকে না শেষ পর্যন্ত মৃণালকুঞ্জ তুলেই দিতে হয়! দু’জন তো গিয়েছেন, আবার কোন দিন কেউ চলে যান যদি…”
“না না, অত ভাববেন না। আজ উঠি।” কিকিরা উঠে পড়ার উদ্যোগ করলেন।
“তুমি ফিরবে কেমন করে? বনমালীকে বলি পৌঁছে দিয়ে আসুক।”
“না। আজ আমি ফিরব না। বলে এসেছি, কলকাতায় আমার কাজ আছে আপনার সঙ্গে, অন্য দরকারও আছে। কাল বেলার দিকে আমি ফিরব। বাসে। আপনি ব্যস্ত হবেন না। আসি দাদা। চলো তারাপদ।”
.
রাস্তায় এসে চন্দন বলল, “আপনি বাড়ি যাবেন?”
“হ্যাঁ। রাতটা কাটিয়ে কাল ফিরব।”
“চলুন তবে।”
“তোমরাও যাবে! দরকার নেই। আমি একটু ঘুরেফিরে যাব। আমার কয়েকটা জিনিস জোগাড় করতে হবে। আমার চেলাদের কাছে পেয়ে যাব।”
“আপনার শিষ্য? লাইনের লোক?”
কিকিরা হাসলেন। “কারেক্ট।”
“ম্যাজিকঅলা…”
“একটা বাঁশি চাই, সাপুড়েরা যে বাঁশি বাজায়।”
“সাপুড়ের বাঁশি?” তারাপদ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“আকাশ থেকে পড়ছ নাকি? ফলিং ফ্রম স্কাই! ম্যাজিশিয়ানদের খেলা দেখাবার ছলাকলা সাজপোশাক বাদ দাও। রাস্তায় মাদারির খেলা দ্যাখোনি কখনও! তারাও কেমন সাপুড়ের বাঁশি বাজায়, আর বড় একটা ঝুড়ির মধ্যে একটা বাচ্চাকে ঢুকিয়ে দিয়ে ঝুড়ির মাথা বন্ধ করে দেয়। তারপর বাঁশি বাজাতে বাজাতে ঝুড়ির মধ্যে এক হাত লম্বা ছোরা চালায় চার-পাঁচটা। পরে যখন ছেলেটা বেরিয়ে আসে, একেবারে যেমন কে তেমন!… তোমরা কলকাতার ছেলে–এসব রাস্তাঘাটের মামুলি খেলা দেখবে কেমন করে?”
“সাপুড়ের বাঁশি আপনি কী করবেন?”
“জলধর বলেছেন তিনি আগে একটু বাঁশিতে ফুঁ দিতে পারতেন। আমি অবশ্য পারি না। কলজেতে সে-দম নেই। তবে পিপলুকে পাব। পিপলু সাপুড়ে সেজে বাঁশি বাজিয়ে ঝুড়ির মধ্যে থেকে প্যাঁচানো দড়ি বার করে। রোপ ট্রিক। ওকে ধরে নিয়ে গিয়ে কোথাও থেকে একটা টেপ রেকর্ড করিয়ে নিতে পারব।”
চন্দন আর তারাপদ মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
শেষে চন্দনই বলল, “আপনিও তা হলে বুজরুকি বিশ্বাস করলেন! সাপুড়ের বাঁশি ছাড়াও ধুনুচি, হলুদ চাল, সিঁদুরমাখা আমপাতা, জবাফুল, সাপের খোলস…”।
“কী যে বলো তুমি! প্লাস্টিকের সাপ, গিরগিটি কোনটা না পাওয়া যায় বাজারে! ছেলেমানুষের খেলনা, যাত্রা থিয়েটারের নকল সাপ। আর এ তো শুধু একটু খোলস! বাকি যা তা..”
“বুঝেছি।” তারাপদ মাথা হেলিয়ে বলল, “আর গন্ধ!”
“হয়ে যাবে। অখাদ্য ধূপ অনেক পাওয়া যায় বাজারে। না হলে কেমিক্যাল দোকানে খোঁজ করব।”
“জলধর তা হলে আপনার টার্গেট!”
মাথা নাড়তে নাড়তে কিকিরা বললেন, “জলধর একা নয়, ওঁদের দু’জনও আমার নজরে আছেন- বলাইবাবু আর সলিলবাবু!”
অল্পসময় চুপচাপ।
তারাপদ বলল, “আমরা তা হলে কী করব?”
“তুমি পরশুর পরের দিন তরশু যাবে। দু-একটা জিনিসপত্র নিয়ে যেয়ো হাতে করে। চাল আটা লাগবে না। আছে। বরং পিপলুকে বলে যাব তোমার হোটেলে গিয়ে যা যা দেওয়ার দিয়ে আসবে। একটা ব্যাগে করে নিয়ে যাবে। ডেলিভারির তে-চাকা নিয়ে এসো না।… আর চাঁদু, তুমি এবার ওই বন্ধ কারখানার দরোয়ানকে ক্যাচ করো। যেমন করে হোক পটিয়ে কারখানার ভেতরে ঢোকো একবার। দেখো যদি কিছু প্রমাণ পাও।”
চন্দন মাথা নাড়ল। “ও-কে সার! আমি ম্যানেজ করার চেষ্টায় থাকব। মুশকিল কী জানেন, আপনাদের মৃণালকুঞ্জ আর কারখানা এত কাছাকাছি ভয় হয় আপনাদের ওখানে কারও নজরে পড়ে যাই!”
“যাও তো যাবে। তুমি বিজনেসম্যান! বন্ধ কারখানার ব্যাপারটা দেখতে যেতেই পারো।”
“বেশ! যা বলবেন!”
“তা হলে তোমরা এবার এসো। আমি নিজের কাজে যাই। “
“আসুন। সার, আপনি কিন্তু সাবধানে থাকবেন।”
“আমায় নিয়ে ভেবো না। আমি তিনটে চোখ নিয়ে থাকি ওখানে। আমায় কাবু করা সহজ হবে না।”
“না হলেই ভাল।”
“আমি আসি। সন্ধে হয়ে যাচ্ছে। আর দেরি করলে আমার কাজ হবে না।” কিকিরা একটা ট্যাক্সি ধরে নিলেন বড় রাস্তা থেকে।
.
১১.
বাড়ির সামনে বাগানে সলিলবাবু পায়চারি করছিলেন। আজ বিকেল থেকেই গুমোট বাড়ছে। আকাশের চেহারা থমথমে। বাতাস নেই। সলিলবাবু ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন। মাঝে মাঝেই ধুতির কোঁচার একটা প্রান্ত আলগা করে তুলে নিয়ে মুখের, গলার ঘাম মুছছিলেন।
হঠাৎ কিকিরার গলা পেলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। কিকিরাকে তিনি আগেই দেখেছেন বাগানে। ওপাশে ছিলেন। রজনীবাবুও বাগানে, ফটকের কাছে। আজ হাতে খুরপি বা শিক নেই। চৈতন্য মালীর সঙ্গে কী কথা বলছিলেন। বোধ হয় ফটকের গায়ে মাধবীলতার ডালগুলো যেভাবে ঝুলে পড়েছে, শুকনো পাতা জমেছে গোড়ায়–তা নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে।
সলিলবাবু বুঝতে পারেননি কিকিরা কখন ওপাশ থেকে এপাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, একেবারে তাঁর পাশে। গলা শুনে কিকিরার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন।
কিকিরা আবার বললেন, “আকাশ দেখেছেন?”
সলিলবাবু মুখ তুলে আকাশ দেখলেন। আগেও দেখেছেন।
“কী মনে হচ্ছে, ঝড়বৃষ্টি হবে এক পশলা?” কিকিরা বললেন।
