“একতলা থেকে ঝাঁপ দেওয়া যায় না, সার।”
“ঠিক। কিন্তু আত্মহত্যা করার পাগলামি মাথায় এলে, উনি গলায় দড়ি দিতে পারতেন। না হয় বিষ খেতেন। বা অন্যভাবে….। না, আমি কনফিউজড। কেন উনি দোতলায় এলেন? আর কেনই বা এমন জায়গা থেকে ঝাঁপ দিলেন যেখানের রেলিং আলগা নড়বড়ে, নীচে পাহাড়প্রমাণ রাবিশ!”
তারাপদ অবাক আর আতঙ্কের গলায় বলল, “কেউ কি ওঁকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল?”
কিকিরা চুপ। একটা চুরুট ধরালেন। “চলো, বাইরে যাই। “
চা শেষ করে তারাপদ উঠে দাঁড়াল।
বাইরে এসে কিকিরা বললেন, “শোনো, আমি একবার হরিচন্দনবাবুর সঙ্গে দেখা করতে যাব।”
“কবে?”
“ক-বে! পরশু দিন। বিকেলে। তুমি চাঁদুকে বলবে ওখানে হাজির থাকতে। তুমিও চলে আসবে। হরিবাবুর সঙ্গে আমার কথা আছে।”
“যেমন বলবেন। “
“তুমি এবার এগোও। বাসে যেতে হবে। পরশুদিন বাকি কথা…।”
তারাপদকে সঙ্গে করে ফটক পর্যন্ত গেলেন কিকিরা। এগিয়ে দিয়ে বললেন, “সাবধানে যাবে।”
.
১০.
হরিচন্দনবাবুর মুখোমুখি বসে ছিলেন কিকিরা। পাশে তারাপদ আর চন্দন।
কিকিরা প্রথমে মৃণালকুঞ্জের বৃত্তান্ত শোনালেন। তিনি যাওয়ার পর যা যা দেখেছেন, শুনেছেন। কার সঙ্গে কথাবার্তা কী হয়েছে–তাও বললেন।
হরিচন্দনবাবু মন দিয়ে শুনছিলেন। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছিলেন। তিনি যে ক্রমশই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ছিলেন বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু উত্তেজিত হচ্ছিলেন না। তাঁর কথাবার্তা শুনে ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, ভাল কিছু করতে গিয়ে মন্দ হলে মানুষ যেমন হতাশ বিরক্ত হয়, অনেকটা সেইভাবে হতাশ হয়ে পড়েছেন।
কিকিরা বললেন, “সলিলবাবু মিথ্যে কথা বলছেন- আগেই আপনাকে বললাম। বলাইবাবুও ততটা সত্যবাদী নন। তিনিও হয়তো মিথ্যে বলছেন। চন্দনের কাছে শুনুন।”
হরিচন্দন চন্দনের দিকে তাকালেন।
চন্দন মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “আমি খোঁজখবর করে যা জেনেছি–তাতে বুঝলাম, বলাইবাবু যাত্রা দেখতে গিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু পালা শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি ছিলেন কিনা কেউ বলতে পারছে না।”
“বলাইবাবুকে কি গাঁয়ের লোক চেনে?” হরিচন্দনবাবু বললেন।
“কেউ কেউ মুখে চেনে। উনি সকাল বিকেল হাঁটাহাঁটি করেন। ভদ্রলোককে ঘোরাফেরা করতে দেখেছে আশেপাশে। তা ছাড়া বলাইবাবু তো গাঁয়ের মানুষ নন। সেজেগুজেই গিয়েছিলেন। কার্তিকের শেষ বলে ঠাণ্ডার ভয়ে গায়ে গরম কোট লম্বা, মাথায় টুপি, হাতে ছড়ি আর টর্চ। সহজেই তাঁকে নজরে পড়ছিল। “
“ও”
“আরও একটা ব্যাপারে গোলমাল হচ্ছে। সেদিন সময়মতন যাত্রার দল পৌঁছতে পারেনি বলে পালা শুরু হতে দেরি হয়েছিল। ওদের এক ইম্পর্টেন্ট অভিনেতা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল হঠাৎ। তাকে আনতে পারেনি। কাজেই বায়না-দেওয়া তাদের সঙ্গে যাত্রাপার্টির বচসা হয়। পরে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পালা নামাতে হয়েছিল।”
কিকিরা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “বলাইবাবু আমায় এসব কথা বলেননি।”
হরিচন্দন যেন বিভ্রান্ত। বললেন, “বলাইবাবু তা হলে কি যাত্রাও পুরো দেখেননি।”
“আমায় তা অন্য কথা বলেছেন।” কিকিরা বললেন, “যাত্রার আসরে বসে বাকি রাত কাটিয়েছেন।”
তারাপদ বলল, “মিথ্যে কথা! ফাঁকা আসরে বসে থাকলে কারও নজরে আসত। “
হরিচন্দন অসহায়ের মতন কিকিরার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললেন, “আমি কী করব, রায়! মৃণালকুঞ্জ থেকে সব কটাকে তাড়িয়ে দেব! বন্ধ করে দেব বাড়িটা?”
কিকিরা বললেন, “এত তাড়াতাড়ি নয়। আর ক’দিন দেখি। তবে একদিন আপনাকে কদমপুরে যেতে হবে। গিয়ে বলতে হবে, মানে শাসাতে হবে যে, মৃণালকুঞ্জ বন্ধ করে দিচ্ছেন আপনি। সাতদিন সময় দিচ্ছি, যে যার মতন ব্যবস্থা করে নিন। পাততাড়ি গুটোন। এখন অবশ্য আপনাকে যেতে হবে না। আমি জানাব যখন, তখন যাবেন।”
হরিচন্দন চুপ করে থাকলেন। মুখের ভাবে বিরক্তি, দুঃখ।
কিকিরা হঠাৎ বললেন, “একটা ব্যাপার আমি লক্ষ করছি। আপনার মৃণালকুঞ্জে যা ঘটেছে সবই এই ক’ মাসের মধ্যে। মাস চারেক বড়জোর। তার আগে কোনও ঘটনা ঘটেনি?”
“না। নয় নয় করেও এই ক’ বছরে দশ-বারোজন এসেছেন। কেউ কেউ চলেও গিয়েছেন নিজের মরজিতে। কিন্তু আগুনে পোড়া, আত্মহত্যা- এসব ঘটেনি কোনওদিন।”
“আমি ভেবেচিন্তে দেখেছি, জলধরবাবু ছাড়া অন্যরা বেশিদিন আছেন মৃণালকুঞ্জে। জলধরই শুধু বছরখানেক। উনি আসার আগে কোনও খারাপ ঘটনাই ঘটেনি বাড়িটাতে”, কিকিরা বললেন। “যা যা ঘটল সবই জলধরবাবু আসার পর।”
হরিচন্দন কিকিরার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন সামান্য সময়। তারপর মাথা নাড়লেন। “হ্যাঁ। তুমি ঠিকই বলেছ! জলধর এসেছেন বছরখানেক। আর দুটো ঘটনাই ঘটেছে গত কয়েক মাসের মধ্যে। তোমার কি মনে হয় এর মধ্যে জলধরের হাত আছে?”
“এখন বলতে পারছি না। মানুষটি যতই কেননা হাতে তালি বাজিয়ে সন্ধেবেলায় ঠাকুরদেবতার গান করুন, আমার মনে হয় উনি অতটা দেবদ্বিজের ভক্ত নন। ভক্তি আর ভাব এক জিনিস নয়, দাদা। ভদ্রলোক বেশ চতুর। ওঁর মুখের কথা আর মনের মতলব আলাদা হতেই পারে। তা ছাড়া জলধরবাবু যা যা বলেছেন ওঁর সম্পর্কে, তা সত্যি না বানানো কে বলবে!”
“ভেরিফাই করা যায় না?” তারাপদ বলল।
“করা মুশকিল। অন্তত আন্দামানের ব্যাপারটা। অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। অত হাঙ্গামা করতে গেলে সময় নষ্ট হবে।”
“তা হলে?” হরিচন্দন বললেন।
