জলধর বললেন, “আমি কোনও শব্দ শুনিনি। দীনুবাবু অবশ্য বলতেন।” বলতে বলতে থেমে গেলেন তিনি।
.
০৯.
সপ্তাহ কেটে গেল।
কিকিরা মোটামুটি আলাপ জমিয়ে নিয়েছেন চার প্রৌঢ়ের সঙ্গেই। মালী চৈতন্য, বামুনঠাকুর রাধু আর কাজের লোক নকুলের সঙ্গেও তিনি সরলভাবে হাসি তামাশা করে কথা বলেন। এদের অবজ্ঞা অগ্রাহ্য করা উচিত নয়। বরং ওদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করলে লাভ আছে। রাধুদের পেটেও কথা আছে। সুযোগ বুঝে ধরতে পারলে অনেক কথাই হয়তো বেরিয়ে আসতে পারে।
এখন পর্যন্ত অবশ্য কিকিরা মৃণালকুঞ্জের রহস্যের ব্যাপারে সুবিধে করতে পারেননি তেমন। শুধু অনুমান, ধারণা, সন্দেহ কোনও প্রমাণ নয়। চার প্রৌঢ়ের মধ্যে রজনীকান্তই যেন অন্য রকম মানুষ। কথা কম বলেন। কোনও অভিযোগ জানান না। দুঃখী বিষণ্ণ মনে হয় তাঁকে সবসময়। ভদ্রলোকের একমাত্র কাজ হল সকাল বিকেল বাগানে ঘুরে ঘুরে গাছপালা দেখা, খুরপি বা একটা লোহার শিক হাতে গাছের গোড়া খুঁচনো, অবশ্য ফুলগাছের; নিজের হাতে জলও দেন। বেলফুলের ক’টি মাত্র গাছ, তারও কী যত্ন। হেনা ঝোঁপের শুকনো পাতা পরিষ্কার করেন নিজের হাতে। টগরের মরা শুকনো ডাল ছেটে দেন।
কিকিরা লক্ষ করেন সব। কিছু বলেন না। রাত্রে ভদ্রলোক বেশিরভাগ সময় শুয়ে থাকেন, বড়জোর পুরনো কাগজ পড়েন।
মাঝে একদিন ঝড়ও হয়ে গেল সন্ধেবেলায়। বৃষ্টি হল নামমাত্র।
কিকিরা অধৈর্য হলেন না। অপেক্ষা করে থাকলেন তারাপদদের জন্যে।
.
তারাপদ এল পরের সপ্তাহে। হাতে একটা নাইলনের ব্যাগ। বাসেই এসেছে।
এল বিকেলে। ব্যাগ থেকে চা-পাতার বড় প্যাকেট, গুঁড়ো দুধের কৌটো, খুচরা আরও কিছু নামিয়ে রাখল। হেসে বলল, “সাপ্লায়ার কি শুধু হাতে আসতে পারে?”
কিকিরা হাসলেন। “তোমার মস্তিষ্ক আছে।”
“আপনার দয়ায়।”
“তা হলে একটু চা খাও। এখানকার চা। তুলসীপাতার ফ্লেভার পাবে।”
“হয়ে যাক। তবে আমার চা ভাল দোকান থেকে আনা।”
“ওটা থাক এখন।” বলে রাধুকে ডাকলেন।
রাধু এল। চা দিতে বললেন কিকিরা। তারপর ইশারায় তারাপদর আনা জিনিসগুলো নিয়ে যেতে বললেন।
রাধু চলে গেলে কিকিরা দরজার দিকে তাকালেন। কেউ নেই। নিচুগলায় বললেন “কোনও খবর?”
“হ্যাঁ। অনেক ঝামেলা করে জোগাড় করেছি। অচেনা মানুষ কারুর বাড়িতে গিয়ে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলা যায় না। সলিলবাবুর জামাইয়ের দোকানেই গিয়েছিলাম। কাস্টমার সেজে। ক্যাসেট কিনব। আলাপ কি জমতে চায়! ধানাই-পানাই। যাকে হিন্দি সিনেমায় বলে, আগারা বাগারা। সেরেফ গল্প বানালুম। এক বন্ধুর সঙ্গে একটা জায়গায় গিয়েছিলাম সেদিন। সেখানে বুড়োদের এক ধর্মশালা টাইপ আস্তানা দেখলাম। আলাপও হল দু-একজনের সঙ্গে। সলিলবাবু বলে একজন ছিলেন। বললেন তাঁর জামাইয়ের টিভির দোকান আছে ঢাকুরিয়ায়। এই সেই দোকান। আশ্চর্য। অ্যায়সা মিথ্যে চালালাম, সার। দুটো সিগারেট গেল। শেষে কথায় কথায় আবার সলিলবাবুর নাম…”
“বললে?”
“বললাম। সে যে কত কায়দা করে, সার! শ্বশুরমশাইয়ের নাম শোনামাত্র জামাই যেন বুলডগের মতন গর্জে উঠল।…. জামাইয়ের চেহারাটাও বুলডগের মতন। মুখটা যা ফেরোশাস দেখতে।”
“গর্জে উঠল কেন?”
“ঈশ্বর জানেন। বুঝলাম সম্পর্ক ভাল নয়।”
“আচ্ছা! সেদিনের কথা তোলোনি?”
“তুলেছি। কায়দা করেই। জামাই বললে, দোকান বন্ধ করে ফিরে গিয়ে বাড়িতে শ্বশুরমশাইকে দেখেনি। তিনি এসেছিলেন শুনেছে। আবার চলেও গিয়েছেন।”
কিকিরা কৌতূহল চাপতে পারলেন না। “গিয়েছিলেন আবার চলেও এসেছেন। মানে মেয়ের বাড়িতে রাত্রে ছিলেন না?”
“না”, মাথা নাড়ল তারাপদ।
“তা হলে রাত্রে তিনি ছিলেন কোথায়? এখানে ফিরে আসেননি। নিজের মুখেই বলেছেন, সেদিন কলকাতায় মেয়ের বাড়ি গিয়ে আর ফেরা হয়নি।”
“মিথ্যে কথা।”
“অফকোর্স! সলিলবাবু মিথ্যে কথা বললেন কেন? হোয়াই! মুরলীবাবুর দোতলা থেকে ঝাঁপ মারার কথা পরের দিন সকালে এখানে এসে শুনেছেন তিনি। তখন মুরলীবাবু অজ্ঞান অচেতন। হয়তো মারাই যাচ্ছেন। গিয়েছেনও বলা যায়।”
তারাপদ বলল, “সাসপেক্ট!”
“হ্যাঁ। সন্দেহ করতেই হবে।”
“কিন্তু সলিলবাবুর উদ্দেশ্য কী? মোটিভ? মানে আমি বলছি মুরলীবাবুর ঝাঁপ দেওয়ার পেছনে সলিলবাবুর হাত আছে বললে– একটা কারণ তো বার করতেই হবে। কী মোটিভ থাকতে পারে সলিলবাবুর!”
কিকিরা নিজের মাথার লম্বা লম্বা চুলে আঙুল জড়িয়ে টানতে লাগলেন। ভাবছিলেন। অন্যমনস্ক। চিন্তিত। শেষে বললেন, “বলতে পারছি না। খোঁজ করতে হবে। কেন উনি মিথ্যে কথা বলবেন? কী এমন আছে যা লুকোতে চান? আশ্চর্য!”
রাধু চা নিয়ে এল। চায়ের আগে জল। রাধুই ঘরে রাখা কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে দিল।
চলে গিয়েছিল রাধু। তারাপদ চা খেতে খেতে বলল, “আপনি কেন হাবুডুবু খাচ্ছেন?”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। “না, ঠিক তা নয়; তবে ধাঁধায় রয়েছি।”
“সলিলবাবুকে চেপে ধরুন!”
“ধরব বইকী! তবে এখন নয়। দেখি বলাইচাঁদের ব্যাপারটা কী হয়! চাঁদু কি লেগে পড়েছে, জানো?”
“হ্যাঁ। পরশু ওর সঙ্গে দেখা হয়েছে।”
“তারা, আমার মন বলছে, মাত্র তিন-চার মাসের মধ্যে দুটো দুর্ঘটনা একই বাড়িতে বিনা কারণে হয়নি। আমি স্বীকার করছি, কখনও কখনও যুক্তিতর্কের বাইরে এমন অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে। একই পরিবারের দু’জন চলে যায়। নিয়তির টান। কিন্তু এখানে তা নয়। একই ঘরের পাশাপাশি তক্তপোশে শুয়ে থাকা দুই বুড়ো চলে গেল পর পর, একজন আগুনে পুড়ে, অন্যজন ছাদ থেকে লাফ মেরে। শ্রীকান্তবাবুর না হয় কাপড়েচোপড়ে আগুন ধরে গিয়েছিল আচমকা- অল রাইট, কিন্তু মুরলীবাবু কেন একতলা থেকে দোতলায় এসে ঝাঁপ মারবেন?”
