“ভাল বলেই মনে হয় ওঁকে।”
“আপনার এখানে ক’ বছর হল?”
“ক’ বছর! বছরখানেকের বেশি। আমি এসেছি বলাইবাবুর পর।”
কিকিরা সব জানেন। নামের খাতামানে রেজিস্টারে দেখেছেন। কিন্তু সেটা তিনি বুঝতে দিতে চান না। কাউকেই আঁচ করতে দেননি যে, তিনি প্রত্যেকের নাড়িনক্ষত্রের খবর নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
গল্প করার ঢঙেই কিকিরা বললেন, “আপনিই কি সবচেয়ে কম আছেন এখানে? অন্যরা শুনলাম, দুই আড়াই তিন বছর ধরে আছেন।”
“একরকম তাই।”
“দেশ বাড়ি কোথায় ছিল? মানে আমি বলতে চাইছি, এই বয়েসে লোকে নিজের ভিটেমাটিতে…”।
“আমার দেশের বাড়ি পুববাংলায়। সেখানে যাওয়া হয়নি। আমার মা সেই কোন কালে নবদ্বীপে এসে স্কুলের চাকরি নিয়েছিলেন। বাবাকে আমি দেখিনি।” একটু চুপ করে থেকে আনমনা হয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলেন। নিশ্বাস ফেললেন বড় করে। “ছেলেবেলাটা আমার একরকম কেটে গিয়েছিল। মা আমাকে সদানন্দবাবার আশ্রমের স্কুলে রেখে দিয়েছিল, কালনার কাছে। ছুটিছাটায় মায়ের কাছে। …পুরনো কথা আর কী বলব! মা চলে যাওয়ার সময় আমি ছোকরা। একটা চাকরিও জুটিয়ে নিয়েছিলাম। সরকারি চাকরি। কলকাতাতেই। তারপর চলে গেলাম আন্দামান। তখন ওদিকে যাওয়া সুবিধের ছিল। সরকারি কাজ করতাম। বছর পাঁচেক কাটিয়ে ফিরে এলাম। ভাল লাগত না। একা একা লাগত। অবশ্য ওখানে বাঙালিও ছিল। মেলামেশা করে মন ভরত না। ফিরে ওয়েন অ্যান্ড বিলওয়েটে চাকরি করেছি। শিপমেন্ট কোম্পানি। ঘরসংসারও করেছিলাম। একটু বয়েসেই। কপালে দুঃখ ছিল মশাই, না হলে স্ত্রী ওইভাবে মারা যায়!”
“কীভাবে?”
“মাঝদুপুরে ফ্ল্যাটে ডাকাতি। এমনভাবে জখম করল ওকে যে, তিনটে দিনও বাঁচল না।”
কিকিরা সহানুভূতির শব্দ করলেন। খাতায় অবশ্য এটা লেখা নেই। জলধর বিপত্নীক–এইমাত্র লেখা আছে।
আত্মীয়তার সুর এনে ভারী গলায় বললেন কিকিরা, “জীবন বড় গোলমেলে হালদারমশাই। মাথার ওপর বসে কে যে খুঁটি চালছেন–কেউ কি জানে! তবে আপনি পোড়খাওয়া মানুষ। ভেঙে পড়বেন বলে মনে হয় না। …আমি ভাবছিলাম, আপনার মতন মানুষ এখানে না এসে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে থাকলে হয়তো মনের দিক থেকে শান্তি পেতেন।”
জলধর অদ্ভুত এক মুখভঙ্গি করলেন। “আত্মীয়! খুব কম গাছের ডাল সোজা হয়, বেঁকাই বেশি। আমার আত্মীয় বলতে একটি ছেলে। সে হল সেলফিশ, ইররেসপনসিবল, ইডিয়েট, গাধা। নচ্ছার। তার ফ্যামিলি নিয়ে দিল্লি চলে গিয়েছে। সেখানে জুতোর ব্যবসা করে। ফ্যাক্টরি করেছে জুতোর। জু-তো! ছ্যাঃ!”
কিকিরা কথা পালটালেন। “একালের ব্যাপারই আলাদা। ছেলেছোকরাদের মতিগতি বোঝা যায় না। কী আর করবেন। যার যেমন মন চায়”।
“চাক। আমার কাঁচকলা। আমি পরোয়া করি না। একা এসেছি, একলা যেতে হবে।”
“তা ঠিক। একলা চলো রে!”
“খাঁটি কথা। …কে কাকে দেখে? কে কাকে বাঁচায়! যার কপালে যেমন আছে তাই হবে।”
কিকিরা সঙ্গে সঙ্গে কথাটা ধরে নিলেন। বললেন, “কপাল। যা বলেছেন সত্যিই তাই। শ্রীকান্তবাবু মুরলীবাবুর কথাই ভাবুন।”
“স্যাড। আহা রে, দুই বুড়োমানুষ কীভাবে চলে গেলেন। “
“বিচ্ছিরি ভাবে। আচ্ছা হালদারমশাই, এই যে দুজন মানুষ মাস কয়েকের মধ্যে এইভাবে চলে গেলেন, আপনার ভয়টয় করে না?”
“ভয়! …না ভয় নয়, তবে অস্বস্তি হয়।”
“মৃণালকুঞ্জে কি কোনও অশুভ শক্তির নজর”
“অশুভ! বলতে পারেন অশুভ। তবে এমনটা হয়। খারাপ যখন হয়–তখন পর পর হয়ে যায়। কেন হয় কে জানে!”
কিকিরা যেন কৌতূহলবশেই বললেন, “আমি যা শুনেছি শুনেই বলছি– মুরলীবাবু নাকি ঝাঁপ দিয়েছিলেন। কথাটা কি ঠিক?”
“আমিও তাই শুনি।”
“উনি ঝাঁপ দেবেন কেন? থাকতেন একতলায়; দোতলায় এসে ঝাঁপ দিলেন!”
“তাই তো দিলেন।”
“কেন? ওঁর কি মাথাখারাপ হয়ে গিয়েছিল!”
“না, তা কেমন করে বলব! তবে শ্রীকান্তবাবুর ওইভাবে আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার পর উনি যেন কেমন হয়ে গিয়েছিলেন। মনমরা, বিচলিত। একই ঘরে থাকতেন দু জনে, হুট করে একজন চলে গেল! কিছুই করতে পারলেন না।”
“অনুতাপ। “
“হবে হয়তো।”
“আপনারা কিছুই জানতে পারলেন না।”
“না। কেমন করে জানব! শীতের দিন। দরজা জানলা বন্ধ। মাঝরাত বা শেষরাতে কেউ যদি ওপরে উঠে এসে থাকে–জানা সম্ভব নয়।
“যে জায়গায় গিয়ে উনি ঝাঁপ দিয়েছিলেন সেখানকার মানে বারান্দার রেলিং কি আগেই ভাঙা ছিল?”
“ও আবার রেলিং কোথায়, এক ইটের এক গাঁথনি, তাও ফোকর করা। হ্যাঁ, নড়বড়ে ছিল। ফাটল ধরেছিল। সারাবার কথাও শুনতাম। দীনুবাবু মুখে বলতেন– এবার সারাব মিস্ত্রিমজুর ডেকে, কিন্তু কই গা করতেন কোথায়!”
“ভদ্রলোক ওইভাবে ওখানে গিয়ে
জলধর কথা শেষ করতে দিলেন না কিকিরাকে, মাঝখানে বললেন, “তবে একটা কথা। এখানে ওই সময়টায় ভীষণ কুয়াশা নামত। পাঁচ হাত দূরের জিনিসও নজর করা যেত না। মুরলীবাবু ভুল করে”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। “না সার, কুয়াশা নামুক আর নাই নামুক ভদ্রলোক একতলা ছেড়ে দোতলায় আসবেন কেন অমন সময়! বাথরুম নীচেও আছে। দোতলায় রাত্রে কাজ চালাবার মতন একটা বাথরুমও আছে। জানি। তবু ওই জন্যে দোতলায় নিশ্চয় আসেননি। তাই না, বলুন?”
জলধর আর কী বলবেন! মাথা নাড়লেন।
উঠে পড়লেন কিকিরা। “চলি, অনেকক্ষণ গল্পগুজব হল।” ..পা বাড়িয়ে হঠাৎ আবার বললেন, “আচ্ছা, এখানে কোনও ভৌতিক ব্যাপার ঘটছে? শোনা যায় কিছু?”
