“আপনাকে বিশ্বাস করেন না ভদ্রলোকরা।”
“বাইরে থেকে ওঁদের বোঝা যায় না। ভেতরে কে কী করেন বলতে পারব না।”
“আপাতত তা হলে আপনার সাসপেক্ট নম্বর এক হল বলাইবাবু! আর দুই হল সলিলবাবু?
“হ্যাঁ, এই দুই ভদ্রলোকের মধ্যে একজন প্রথম দুর্ঘটনার দিন হাজির ছিলেন না মৃণালকুঞ্জে। দ্বিতীয়জন ছিলেন না পরের ঘটনার দিন।”
“এটা তো হতেই পারে। ব্যাপারটা অ্যাকসিডেন্টাল। বা ধরুন কাকতালীয়।”
“হলে ভাল। না হলে সন্দেহের কারণ থাকে! দুই বুড়ো কেন অকারণ মিথ্যে কথা বলবে! …আর সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার কী জানো? দুটো ঘটনাই ঘটেছে ভোররাতে বা শেষরাতে। প্রথমটা তো ভোররাতেই। দ্বিতীয়টা, শেষরাতে হতে পারে। কেউ ঠিক করে বলতে পারছে না। বলছে, তখন তো ঘুমিয়ে ছিলাম।”
“একটা লোক পড়ে গেল, কেউ কোনও শব্দও পেল না।”
“না। শীতকাল। মাঘ মাস। জানলা-দরজা বন্ধ করে, লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে সবাই। কেমন করে জানবে! ওঁদের মুখে এই কথাটাই শুনি। সকালে উঠে যে প্রথম দেখেছে মুরলীবাবুকে সে হল রাধু বামুনঠাকুর। তারই চেঁচামেচিতে অন্যরা উঠে আসে।”
চন্দন নিজের মনে ভাবতে লাগল। যুক্তি হিসেবে কথাটা মেনে নিতে হয়।
সামান্য পরে কিকিরা বললেন, “চলো ফিরি, আমি আর এগুব না।”
কিকিরারা ফিরতে লাগলেন।
চন্দন বলল, “সার, আমি হাসপাতালে কাজ করি। কত তুচ্ছ সাধারণ ঘটনা থেকে আগুন লেগে যায় তার কথা জানি। আর আগুন লাগলে শতকরা নব্বই জন মানুষ দিশেহারা হয়ে যায়। বোধবুদ্ধি কাজ করে না। কাজেই শ্রীকান্তবাবুর আগুন লাগা সম্পর্কে আমি চট করে একটা ধারণা করতে পারি না। ওটা অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে। …মুরলীবাবুর ব্যাপারটা বলতে পারছি না। তবে বেকায়দায় পড়ে গিয়ে ঘাড়ে মাথায় তেমন চোট পেলে-সে না। বাঁচতেও পারে। ঘাড় ভাঙলে মানে ফাস্ট ভারটিব্রা আর সেকেন্ড ভারটিব্রার মধ্যে তেমন জখম হলে ভয়ংকর ব্যাপার। মাথার জখমও ডেঞ্জারাস। “
“সব মানছি। তবু শেষ পর্যন্ত দেখতে চাই। হরিচন্দনবাবুর মনেও সন্দেহ। রয়েছে।
“আমি আপনাকে চলে আসতে বলছি না। দুটো দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়াটা কোয়েনসিডেন্স হতে পারে। এমন হয়। “
“তারাও বলছিল কথাটা। দেখা যাক না কী হয়!”
কথা বলতে বলতে ফটকের কাছাকাছি এসে গেল চন্দনরা। চন্দন হঠাৎ বলল, “ভাল কথা, ফটকের বাইরে সেই ধুনুচির তুক–ঘুঁটে পোড়া, হলুদ চাল, সাপের খোলস, মাটির পুতুলতার কী হল? এখানকার কেউ দেখেছেন?”
“প্রথমবার নজরে পড়েনি। দ্বিতীয়বার পড়েছে। চৈতন্য দেখেছে, কাজের লোক দেখেছে, এখানকার বাবুরাও।”
“সাপুড়ের বাঁশি শুনেছেন?”
“না।”
“এখানকার বাসিন্দারা কি ভয়ে ভয়ে আছেন?”
“ভয় পেয়েছেন কিনা বলতে পারব না, তবে সকলের মনেই খুঁতখুঁতুনি আছে। “
“দেখুন কী হয়! …আমি পরে আসব আবার। আপনি যে কাজগুলো করতে বললেন, সেগুলো সারতে সময় লাগবে। অন্তত হপ্তাখানেক।”
.
০৮.
জলধরবাবুর অভ্যেস হল, সন্ধেবেলায় দোতলার বারান্দায় পায়চারি করতে করতে দু হাতে তালি বাজিয়ে দেবদেবীর গান গাওয়া। পরনে ছালিবস্ত্র, গায়ে ফতুয়া, কখনও বা খালি গায়েই, ‘হে গোবিন্দ রাখো শরণ’, কখনও ‘শিবশঙ্কর নমো হে নারায়ণ’, কখনও বা সাদামাঠা ভক্তিসংগীত, ভজ গোবিন্দ কহ গোবিন্দ।
সেদিন জলধর রামপ্রসাদি ঢঙে একটি গান গাইছিলেন, এমন সময় কিকিরা দোতলায় উঠে এলেন।
জলধর গান থামিয়ে তাকালেন। “কী খবর ম্যানেজারবাবু?”
“কিছু না। এমনি এলাম। আপনার গলা শুনে। গানবাজনার চর্চা হচ্ছিল নাকি?”
“একটু আধটু। বাঁশিতে ফুঁ দিতে পারতাম। …তা হঠাৎ গানবাজনার কথা কেন?”
“গান শুনে মনে হল। রোজই তো শুনতে পাই। “
“শেষ বয়েসে ভগবানের নাম নিই একটু। জীবনটা তো কেটে গেল..” কিকিরা হাসলেন, “এত তাড়াতাড়ি। কত আর বয়েস আপনার! ষাট হয়তো ছাড়িয়েছেন। এখনও অনেক পড়ে আছে।”
“কেমন করে বুঝলেন?”
“বুঝব না কেন! স্বাস্থ্য ভাল আপনার। বড় আধিব্যাধি নেই। চরক বলেছেন, পিত্ত ও কফ যাদের নাশ হয়–তারা দীর্ঘজীবী হয়।” বলে কিকিরা হাসলেন।
“আপনি চরক বোঝেন?”
“বুঝি না। তবে আমার মাতামহ বদ্যি ছিলেন তো…! আর আপনিও তো দেখেছি, রোজ সকালে তুলসীপাতা খান।”
“ও।”
“আপনার রুমমেট কোথায়?”
“পাশের ঘরে দাবা খেলছেন।”
“চলুন আপনার ঘরে গিয়ে বসে দুটো গল্প করি।”
“গপ্প! আসুন!”
কাছেই জলধরের ঘর। জলধরবাবু আর বলাই দত্ত একই ঘরে থাকেন দোতলায়। পাশের ঘরে সলিলবাবু আর রজনীকান্ত।
জলধর ঘরে এসে বসলেন।
কিকিরাও বসলেন বলাইবাবুর বিছানায়। দু হাত জোড় করে মাঝের আঙুলে ঘষতে ঘষতে ছেলেমানুষের মতন বললেন, “পরশু আপনাদের একটা ফিস্ট দেব।”
“ফিস্ট?”
“ওই সামান্য মুখ-বদলের খাওয়া। একটা বড় মাছ পেলে ভাল হয়। দেখি কী করা যায়। তা জলধরবাবু, আমি নতুন, আগে যা পাতে পড়ত আপনাদের, তার চেয়ে ভাল কিছু হয়েছে?”
জলধর ঘাড় কাত করলেন। “হয়েছে। একটা স্বাদ পাচ্ছি আজকাল। দীনুবাবুর আমলে কী যে মুখে তুলতে হত…!”
“শুনেছি। হরিবাবুকে আমি বলেই এই চাকরিতে এসেছি যে, হতচ্ছেদা করে আমি কিছু করতে পারব না। বয়স্ক ভদ্রজনরা আছেন যেখানে, সেখানে দু মুঠো ভাত ছড়িয়ে দিলেই হয় না। আপনি চ্যারিটি করছেন না। ভাল একটা কাজ করতে চান। ভাল কাজ করতে হলে মন থেকে, ওই যে কী বলে, দয়াদাক্ষিণ্য করার মেন্টালিটি পালটাতে হবে। অবশ্য উনি, হরিবাবু মানুষটি ভাল, ওঁর নিজের মধ্যে ইগো নেই। তাচ্ছিল্যও করতে চান না কাউকে।“
