“এঁকে তো আগের দিনও দেখেছি; আপনাদের সঙ্গে এসেছিলেন,” জলধর বললেন।
“দেখেছেন। দাদার হুকুমে হালচাল দেখতে এসেছিল।” বলেই কিকিরা হাত দিয়ে আশপাশ দেখালেন। “ব্রাদারের এখন মত পালটে গিয়েছে। বলছে, জায়গাটা তো বেশ। এখানে জমিজায়গার দর কেমন? একটা কিছু করলে হয়। আসলে ব্যবসাদার লোক তো। বয়েস কম হলে কী হবে, বিজনেস ব্রেইন!”
জলধর কিছু বললেন না। দেখতে লাগলেন চন্দনকে।
“যাই, একটু ঘুরে আসি। বেলা রয়েছে এখনও। এসো চাঁদু।”
কিকিরা চন্দনকে নিয়ে এগিয়ে চললেন।
মৃণালকুঞ্জর বাইরে এসে চন্দন হাসতে লাগল। “ভালই দিয়েছেন। আপনি সার দিনকে রাত করতে পারেন।”
কিকিরা হাসলেন। “না হে, অতটা পারি না। তবে দরকারে দু’-দশটা মিথ্যে বোলচাল দিতেই হয়। ম্যাজিক দেখাবার সময় রুমালে লাগানো এক ফোঁটা আতরকে অ্যারেবিয়ান পারফিউম বলে চালাতাম।”
“বুঝতেই পারি। আপনার সঙ্গে কম দিন তো হল না।”
“তা হল। …এদিককার খবর শুনেছ কিছু?”
“না। তারার সঙ্গে কাল দেখা হবে। আপনিই বলুন।”
“আমি তোমায় একটা সামারি দিচ্ছি। তারার কাছে বিস্তারিত শুনবে।”
“বিস্তারিত।” চন্দন হাসছিল।
কিকিরা কথাটা কানে তুললেন না। হাঁটতে হাঁটতে মৃণালকুঞ্জের কথাগুলো বলতে লাগলেন অল্প কথায়। দুটো দুর্ঘটনার কথা, এখানে যাঁরা আছেন–তাঁদের কথা।
কথা বলতে বলতে প্রায় বন্ধ কারখানার কাছাকাছি চলে এসেছিলেন কিকিরা। তারপর দাঁড়িয়ে পড়লেন।
চন্দন মন দিয়ে শুনছিল সব। বলল, “প্লে জমে গিয়েছে বলুন!”
“না, জমেনি এখনও। জমব জমব করছে। …ভাল কথা, কারখানাটা দেখেছ?”
“কারখানা বন্ধ হলেও ফটকের পাশে দরোয়ানের গুমটি। তার গায়ে টিনের চালা লাগিয়ে দরোয়ানজি বোধ হয় চা বিড়ি খইনি পাতার দোকান চালায়। একটা ভাঙা বেঞ্চি আর দু-একটা পাথরের চাঁই পড়ে আছে বসার জন্যে।”
“আমি দেখেছি। দরোয়ানকে দেখলে?”
“না। এখন তার দোকান বন্ধ। আমার মনে হল, দরোয়ানের কাছে লোকজন আসে যায়। তা ছাড়া এই রাস্তা ধরে যারা তাদের গাঁয়ে যায়–হয়তো দু দণ্ড বসে চা লেড়ো বিস্কুট খায়। বিড়ি কেনে। খইনি নেয়; “
“কারখানাটা কাদের ছিল জানো?”
“কেমন করে জানব!”
“দুই পার্টনারের। একজন বাঙালি, পাল; আর অন্যজন অ-বাঙালি, খাটোয়া। টাইটেল খাটোয়া। খোঁজখবর নিয়েছি আমি। ব্যবসার শুরু থেকেই মার খাচ্ছিল। তবু বছর খানেকের বেশি চালাবার চেষ্টা হয় কারখানা। শেষে বন্ধ। এখন থাকার মধ্যে ওই পাহারাদার দরোয়ান। শুনলাম পাল কদাচিৎ আসে অবস্থাটা দেখে যেতে। বেচে দেওয়ার মতলব রয়েছে ওদের। জমিজায়গা এটা-সেটার দাম পেলে ছেড়ে দেবে। কিন্তু কেনার লোক জুটছে না।”
“এসব খবর কে দিল আপনাকে?”
“কেন! মৃণালকুঞ্জের বাবুরা। মালী চৈতন্য। রাধু বামুনঠাকুরও।”
“কারখানাটা বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে, থাকতেই পারে। তার সঙ্গে মৃণালকুঞ্জের দুটো ঘটনার সম্পর্ক কী? ওদের কেউ তো আর শ্রীকান্তবাবু মুরলীবাবুর মৃত্যুর জন্যে দায়ী নয়।”
কিকিরা জবাব দিলেন না প্রথমে। চন্দনের কাছে সিগারেট চাইলেন। ধরানো হয়ে গেল সিগারেট। বললেন, “দায়ী নয়। কিন্তু আমার একটা খটকা আছে। “
“কীরকম?”
“শ্রীকান্তবাবু আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার দিন বলাইবাবু মৃণালকুঞ্জে ছিলেন না বলছেন। যাত্রা শুনতে পাশের গ্রামে গিয়েছিলেন। কথাটা পুরোপুরি সত্যি কিনা যাচাই করতে হবে।”
“মানে?”
“এমন তো হতে পারে, উনি যাত্রার পালা শেষ হওয়ার আগেই, কিংবা শেষ হওয়ার পর পরই চলে এসে কারখানায় কোথাও লুকিয়ে ছিলেন। দরোয়ানের ঘরেও হতে পারে। তারপর একেবারে ভোররাতে…”
চন্দন একটু ভাবল। মাথা চুলকোতে লাগল। পরে বলল, “মৃণালকুঞ্জের ফটক খোলা পেল কেমন করে? মালী কি ফটক খুলে রাখে?”
কিকিরা ডান চোখটার পাতা প্রায় আধবোজা করে ধূর্তের মতন বললেন, “না, ফটক খোলা থাকে না। তবে ভেতর থেকে চাবি দেওয়াও থাকত না। আমি খোঁজ নিয়েছি। অবশ্য ভেতর থেকে তালাচাবি দেওয়ারই কথা। মালী চৈতন্য তা দিত না। ভাবত, বেকার চাবি দেওয়া। কে আর আসবে চুরিচামারি করতে! কীই বা চুরি করবে! এদিকে চোর ছ্যাচড়ই বা কোথায়!”
“ফাঁকি মারত!”
“অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। আমি আসার পর কড়া হুকুম করেছি, তালাচাবি লাগাতে।” সিগারেটের টুকরোটা ফেলে দিলেন কিকিরা। বললেন, “তা ছাড়াও কথা আছে। শ্রীকান্তবাবু যখন জামাকাপড়ে আগুন লাগিয়ে বাইরে ছোটাছুটি করছেন, অন্যরা জেগে উঠে তাঁর আশেপাশে জড়ো হয়ে চেঁচাচ্ছে-তখন কে আর নজর করতে যাবে–ফটক খোলা না বন্ধ! কে বা এল তখন বাইরে থেকে!”
চন্দন মেনে নিল যুক্তিটা। বলল, “আপনি বলাইবাবু সম্পর্কে পরিষ্কার নন?”
“এখনও নয়। তুমি পাশের গাঁয়ে, শীতলপুরে খোঁজ নিয়ে দেখবে, সেদিন যাত্রা কখন শুরু হয়েছিল, শেষ হয়েছিল কখন! ওই দিনই জগদ্ধাত্রী পুজো ছিল গাঁয়ে। বলাইবাবুর মতন কোনও ভদ্রলোককে কেউ আগাগোড়া দেখেছে কিনা আসরে? যাত্রায় কোন পালা চলছিল? নামই বা কী?”
“সময় লাগবে।”
“লাগুক। ..যদি দেখি বলাইবাবু মিথ্যে কথা বলছেন, বুঝতেই পারব-কোনও কারণ আছে মিথ্যে বলার। কী কারণ?”
“আপনি নিজে বাইরে গিয়ে খোঁজখবর করেন না?”
“না। আমি ফটকের বাইরে দশ হাতও যাই না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এঁদের চোখে চোখে রাখি। আমার মনে হয়–এঁরাও আমাকে নজরে রাখেন!”
