“মেয়ে-জামাইয়ের কাছে থাকতে চাননি।”
“তা হতেই পারে। অনেকেই থাকতে চায় না। কিন্তু উনি মাঝে মাঝে মেয়েকে দেখতে কলকাতায় যান। নাতির ওপর টান ভীষণ। জামাই সম্পর্কে চুপচাপ।”
“কী করতেন ভদ্রলোক?”
“চা-বাগানে কাজ করতেন। ডুয়ার্সে। দু-তিনটে বাগান বদলেছেন। শেষে আসামে চলে যান। আসামে বছরখানেক ছিলেন। বড়বাবু। রিটায়ার করে শিলিগুড়িতে এসে একটা ঘরবাড়িও করেন। তারপর সব বেচেবুচে কলকাতায়। মেয়ের কাছে থাকতেন। তাও পোষাল না। এখন এই মৃণালকুঞ্জে।”
তারাপদ ভাবছিল। “স্ত্রী নেই?”
“না। শিলিগুড়িতেই মারা গিয়েছেন।”
“মানুষ কেমন?”
“বাইরে থেকে ভেতর বোঝা মুশকিল। তোমায় একটা কাজ করতে হবে। “
“বলুন।”
“আমি তোমায় ঠিকানা দিয়ে দেব সলিলবাবুর মেয়ের বাড়ির। জামাইয়ের দোকানেরও জায়গাটা বলে দেব। একটু খোঁজ নেবে।”
“কী কেস?”
“আপাতত কিছু নয়। পরে বোঝা যাবে। উনি কেন মেয়ের কাছে থাকেন? মাঝে মাঝে যান কলকাতায়, বড়জোর রাত কাটিয়ে চলে আসেন। জামাই সম্পর্কে চুপচাপ।”
“সন্দেহ?”
“এই মুহূর্তে নয়। তবে শ্রীকান্তবাবু আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার দিন বলাইবাবু মৃণালকুঞ্জে ছিলেন না রাত্রে। যাত্রা শুনতে পাশের গ্রামে গিয়েছিলেন। আর মুরলীবাবু আত্মহত্যা করার দিন সলিলবাবু এখানে অ্যাবসেন্ট ছিলেন। বলেন মেয়ের বাড়িতে গিয়ে আটকে পড়েছিলেন।”
তারাপদ বলল, “তবে তো এই দুই ভদ্রলোকই বাদ যান।”
কিকিরা মুচকি হাসলেন। বললেন, “দেখা যাক। অ্যালিবাই ইজ নো প্রফ। বুদ্ধিমানরা চারদিক নজর রেখে কাজ করে।” উঠে পড়লেন কিকিরা। “ওঠো, আজ আর বেশি নয়। পরের বার যখন আসবে এখানেই দুটো ডালভাত খেয়ে যাবে।”
উঠে পড়েছিল তারাপদ। আরও রোদ চড়েছে। বেশ গরম। বাগানের পাশ দিয়ে আসতে আসতে তারাপদ বলল, “শ্রীকান্তবাবুর আগুন লেগে পুড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা তো বললেন, শুনলাম। মুরলীবাবুর আত্মহত্যার ব্যাপারটা শুনলাম না।”
কিকিরা বাড়িটার দিকে তাকালেন। জলধরবাবু স্নান করতে এসেছেন কুয়োতলায়। দোতলার সরু বারান্দায় বলাইবাবু খালি গায়ে দাঁড়িয়ে। এদিকেই তাকিয়ে আছেন।
হাঁটতে হাঁটতে কিকিরা ইশারায় বাড়ির দোতলার দিকটা দেখালেন। বললেন, “ওই দোতলার পশ্চিম দিকে একটা থাম আছে। ইটের। বারান্দার রেলিং নিচু, পলকা। এক ইটের গাঁথনি। ওই থামের কাছ থেকে রেলিং ভেঙে নীচে পড়েছিলেন। কিংবা ঝাঁপ দিয়েছিলেন। নীচে একরাশ ভাঙা ইট, রাবিশ জড়ো করা রয়েছে। পড়ার পর মাথায় লেগেছিল। ঘাড়ও ভেঙেছিল। হাত-পা জখম। ভদ্রলোকের আর জ্ঞান ফেরেনি। মৃত অবস্থাতেই তাঁকে হেলথ সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয় বলতে পারো।”
তারাপদ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। “সে কী! অদ্ভুত তো?”
“আরও অদ্ভুত হল, শ্রীকান্তবাবু আর মুরলীবাবু নীচের তলায় একই ঘরে থাকতেন। একই ঘরের দুজনে চলে গেলেন। ঘরটা এখন বন্ধই পড়ে আছে।”
“স্ট্রেঞ্জ!… দোতলায় কারা থাকে।”
“বাকি চারজন। দুটো ঘরে। কোনার ছোট ঘরটা তালাবন্ধ পড়ে আছে। হরিবাবুর জিনিসপত্র পড়ে থাকে। গুদোম ঘর। … যাক, পরে কথা হবে। চাঁদু কবে আসবে?”
“আজ বিকেলেই আসতে পারে।”
.
০৭.
বিকেলেই এল চন্দন। হালকা মেজাজেই। মৃণালকুঞ্জর ভদ্রলোকরা তখন আশেপাশে পায়চারি করছেন। বলাইবাবু নিত্যদিনের মতন হাঁটাচলা করতে বাইরে গিয়েছেন।
কিকিরাও বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বললেন, “এসো।”
“ঠাণ্ডা জল খাওয়ান আগে। যা গরম, সার।”
কিকিরা জল আনতে বললেন কাজের লোকটিকে। নাম তার গঙ্গাধর। “আমার ঘর থেকে আনবে। “
“আছেন কেমন?” চন্দন জিগ্যেস করল।
“ভাল। তারা এসেছিল ওবেলা।”
“জানি। আসবে বলেছিল। …আপনার কাজকর্ম এগুচ্ছে?”
“সবেই শুরু। গাছে না উঠতেই এক কাঁদি হয় নাকি?”
হাসল চন্দন। “গাছে কতটা ক্লাইমবিং করলেন?”
“মাত্র হাত পাঁচেক,” কিকিরাও ঠাট্টা করে বললেন, “হনুমান বাঁদররা তড়াক তড়াক লাফ মারে হে! আমি মনুষ্য। শনৈঃ শনৈঃ আরোহণ করছি।”
চন্দন হাসতে লাগল। “শনৈঃ শনৈঃ আরোহণ! আপনি দারুণ!”
অন্য দু-একটা হালকা কথার মধ্যে জল এল।
জল খেল চন্দন। “বাঃ, বেশ ঠাণ্ডা তো!”
“আমার ঘরের কুঁজোর জল। “
“ফ্রিজ হার মানে।”
“চা খাবে?”
“এখন নয়।”
“চলো তবে–এক পাক ঘুরে আসি।” বলে হাঁটতে শুরু করলেন। চন্দনও এগিয়ে চলল পাশাপাশি। তার স্কুটার পড়ে থাকল সিঁড়ির কাছে, করবী ঝোঁপের পাশে।
কয়েক পা এগিয়ে আসতেই জলধরবাবুর মুখোমুখি হতে হল কিকিরাকে। বিন্দুমাত্র ইতস্তত করলেন না কিকিরা। হাসি হাসি মুখ, আলাপি গলা; বললেন, “হাঁটুর ব্যথা কমল খানিক! রজনীবাবুর আর্নিকা তবে কাজে দিয়েছে। দেখবেন, আবার হোঁচট খাবেন না। এই বয়েসে হাড়গোড় দিলে হয়ে যায়, হালদারমশাই। মেশিন পুরনো হলে নাটবল্ট ঢিলে হবে–এ তো আপনিও বোঝেন।” বলেই চন্দনকে দেখালেন, “আমার এই ব্রাদারের সঙ্গে সামনে থেকে একটু ঘুরে আসি। ব্রাদারের জায়গাটি বেশ পছন্দ হয়ে গিয়েছে। প্রথমে আমায় ভাগিয়ে নিয়ে যাবে ভেবেছিল। এটা নাকি অজ পাড়াগাঁ। আমি থাকতে পারব না। ওর দাদা-আমার বুজুম ফ্রেন্ড-সে একেবারেই আমাকে এখানে ঘাঁটি গাড়তে দিতে রাজি নয়। বলে, ম্যালেরিয়া না হয় সাপের কামড়ে মারা যাব। ব্রাদার আমাকে দেখতে এসেছে। বেঁচে আছি,, মরে গিয়েছি। “
