“ঘটনাটা সকালে ঘটেছিল?” কিকিরা বললেন। তিনি অবশ্য আগেই জেনে নিয়েছেন হরিচন্দনের কাছে।
“সকাল! তা সকাল বলতে পারেন। ভোর হয়ে আলো ফুটেছে।”
“আগুনটা লাগল কেমন করে?”
“কেমন করে লাগল জানি না। শ্রীকান্তবাবুর অভ্যেস ছিল সাত ভোরে ত্রিফলার জল খাওয়া। রাত্রে ভিজিয়ে রাখতেন। ওই বদ জিনিসটা খেয়ে নিজেই কেরোসিন স্টোভ জ্বালিয়ে গরম জল করতেন। চায়ের লিকার খেতেন পায়চারি করতে করতে। আগুন লেগেছিল স্টোভ থেকে।”
“কেউ কিছু করতে পারল না?”
“ওই তো কথা ম্যানেজারবাবু! আগুন বড় ভয়ংকর জিনিস! লাগতে এক পলক, সর্বনাশ করতে পাঁচ-দশ মিনিটও লাগে না। যার লাগে সে এমন ঘাবড়ে যায় যে, তখন সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কী করবে ঠাওর করতে পারে না। ছোটাছুটি শুরু করে, চেঁচায়। শ্রীকান্তবাবু একেবারে ঘরের বাইরে বেরিয়ে বাগানে ছোটাছুটি করছিলেন। তারপর পাগলের মতন পেছনে ওই পুকুরের দিকে ছুটে যান। জলে ঝাঁপ মারতে যাচ্ছিলেন। ততক্ষণে পাঁচজনে জেগে উঠে তাঁর পিছু পিছু দৌড়চ্ছে। যার যা মনে আসছে বলছে চেঁচিয়ে… কিন্তু সবাই তো বুড়োকে আর এগিয়ে তাঁকে ধরবে! শেষে উনি ঝলসে গিয়ে ডোবাই বলুন আর পুকুর বলুন–তার সামনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। “
“ইস!”
“ওঁকে একটা দড়ির খাঁটিয়ায় চাপিয়ে তিন মাইল দূরে হেল্থ সেন্টারে নিয়ে যেতে যেতে বেলা ন’টা-দশটা। ডাক্তাররা বলল, আশা নেই। বিকেলের পর মারা গেলেন শ্রীকান্তবাবু। বেচারি!”
“উনি নীচের তলায় থাকতেন না?”
“হ্যাঁ। ওঁর ঘরে মুরলীদা থাকতেন। তিনি ভাল করে ব্যাপারটা বোঝার আগেই শ্রীকান্তবাবু মাঠে। …তা কাণ্ড দেখে মুরলীদাও চলে গেলেন সেদিন।”
কিকিরা মাথা হেলালেন অন্যমনস্ক ভাবে।
.
০৬.
তারাপদ এল রবিবার, একটু বেলা করেই। যেমন ভাবে আসার কথা তেমন ভাবেই। আধ-পুরনো এক স্কুটার ডেলিভারি ভ্যান, পেছন দিক ঢাকা। সামনে বসেই এসেছে তারাপদ, ড্রাইভারের পাশে বসে।
কিকিরা বাইরেই দাঁড়িয়ে দিলেন। ভ্যানটা এসে একেবারে বাড়ির বারান্দা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল। হাঁকডাক করলেন কিকিরা ঠাকুরকে, কাজের লোকজন ডেকে জিনিসপত্র নামিয়ে নিতে বললেন। চাল ডাল আটার বস্তা তেল মশলাপাতি নামানো হতে লাগল।
তারাপদ জল খেল। ড্রাইভার ডোকরাও।
চায়ের পাট চুকল কিকিরার ঘরে বসেই। তারপর উনি বললেন, “চলো, একটু ফাঁকায় যাই।”
বাড়ির পেছন দিকে কুয়োতলা, টিউবওয়েল। কাছাকাছি সবজিবাগান। কাঠা তিন-চার জমিতে সবজি ফলানো হয়। একপাশে দু-তিনটি পেঁপেগাছ। শীর্ণ। ওদিকে কলাঝোঁপ। তারপর পুকুর। ছোট পুকুর, ডোবাও বলা যায়। পুকুরের গায়ে গায়ে একটা ছোট নিমগাছ, বাবলা! অল্প ঝোঁপ।
ছায়া ছিল এদিকটায়। চৈত্রের রোদ রীতিমতন প্রখর হয়ে উঠেছে। বাতাসও ছিল।
তারাপদকে নিয়ে কিকিরা ছায়ায় বসলেন।
মুখ গলা ঘাড় মুছতে মুছতে তারাপদ বলল, “কেমন কাটছে, সার?”
“চমৎকার। কলকাতার বাইরে এখনও খানিকটা নেচার আছে। আলো বাতাস ফাঁকা মাঠঘাট..”
“আপনি নেচার নিয়ে মজে আছেন, না কাজকর্ম এগুচ্ছে?” তারাপদ ঠাট্টা করে বলল। বলে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট দেশলাই বার করল। “নিন, খান একটা।”
দু’জনের সিগারেট ধরানো হয়ে গেলে কিকিরা বললেন, “এখন পর্যন্ত যা খোঁজখবর করলাম তাতে জোর করে কিছু বলতে পারছি না। তবে একটা গোলমাল থাকতে পারে।”
“আঁচ করছেন?”
“করছি। … আমি একে একে এঁদের পরিচয়গুলো দেখছিলাম। খাতায় লেখা আছে যেটুকু থাকার। বাকিটা আলাপ জমিয়ে জানবার চেষ্টা করছি। একটা কথা কী জানো? এঁরা যে যেমন পরিচয় জানিয়েছেন সেটাই মেনে নিতে হচ্ছে। তবে ওটা পুরোপুরি ঠিক কিনা বলতে পারব না। ঘরসংসার ছেড়ে বুড়ো বয়েসে এখানে এসে ঠাঁই নিয়েছেন এঁরা, তা নিন; কিন্তু সবাই তো নিরাশ্রয় ছিলেন না। বা একেবারেই আত্মীয়স্বজনহীন নন।”
“সার, আমি বুড়ো নই। তবে দু-একটা ঘটনা নিজের চোখেই দেখলাম। আমাদের অফিসের প্রভাতদা মাত্র গতবছর রিটায়ার করেছেন। মাঝেসাঝে তিনি অফিসে আসেন পুরনো লোকজনের সঙ্গে দেখা করতে। প্রভাতদাকে চেনা যায় না। এক বছরেই যেন পাঁচ বছর বয়েস বেড়ে গিয়েছে। এসেই নিজের দুঃখকষ্টের পাঁচালি গাইতে শুরু করেন। ছেলেদের ব্যবহার, বউমাদের তাচ্ছিল্য, স্ত্রীর অসুখবিসুখ কত কথাই বলে যান। বুঝতে পারি, উনি ক্ষুব্ধ, বিরক্ত। আসলে বুড়োমানুষের গায়ে হয়তো সহজে ফোঁসকা পড়ে।”
“তা খানিকটা পড়ে। অভিমান…”।
“শিবনাথদা আবার অন্য ধাতের। বলেন, বেটারা আমার টাকার দিকে নজর রেখে বসে আছে। বাপ গেলে খামচাখামচি করবে। আমি একটা পয়সাও কাউকে দিয়ে যাব না। লিখে যাব, আমার অবর্তমানে তোমাদের বউদি সে চলে গেলে সব টাকা যেন আশ্রমে দেওয়া হয়…।”
“মেজাজি মানুষ। .. তা শোনো, এই যে যাঁরা এখানে আছেন তাঁদের মুখের কথা ভেরিফাই করার তো উপায় নেই। তোমায় বিশ্বাস করে নিতে হবে। তবে সবসময় বিশ্বাস হয় না। যেমন ধরো সলিলবাবুর কথা। তাঁর মেয়ে থাকে ঢাকুরিয়ায়। জামাইয়ের ব্যবসা। টিভি রেডিয়ো ক্যাসেট প্লেয়ারের দোকান রয়েছে। ভালই চলে দোকান। গাড়ি নেই, তবে মোটরবাইক আছে। মেয়ে তো বাবাকে নিজের কাছে রাখতে চায়। সলিলবাবু একসময় মেয়ের কাছে ছিলেনও। তারপর তাদের ছেড়ে চলে আসেন।”
