“আপনার বিড়ি চলবে? আপনি তো চুরুট খান।”
“দিন একটা।“
বিড়ি ধরানো হল। ধোঁয়া ছেড়ে কিকিরা বললেন, “আপনি এখানে কতদিন আছেন বলাইবাবু?”
“ওয়ান অ্যান্ড হাফ ইয়ার্স। পাকা হিসেবে এক বছর সাত মাস। “
“বাড়ি কোথায় আপনার? আপনি এখানে এসে জুটলেন কেমন করে?”
বলাইবাবু সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন না। গোল গোল চোখ অন্যমনস্ক হয়ে গেল হঠাৎ। ছাদের দিকে তাকালেন। পাখাটা দেখলেন যেন। হাতের বিড়িটা মুখে তুলতে গিয়েও তুললেন না। ঘাড় নামালেন। ইতস্তত করে বললেন, “বাড়িঘর আমার নেই, মশাই। আদি বাড়ি ছিল যশোরে। আমি দেখিনি, আমার বাপজেঠাও দেখেননি। ওঁরা–ওঁদের আমলেই আমরা দেশছাড়া। বাবা মার্চেন্ট শিপ-জাহাজে কাজ করতেন। জেঠা সাত ঘাটের জল খেয়ে গিরিডিতে বসেছিলেন পাকাপাকি ভাবে। তখন মাইকার ব্যবসার বাজার ছিল। ব্যবসা চালাতে চালাতে ঝট করে মারা গেলেন। বাবা গিয়েছেন তারও আগে জাহাজেই। স্পেসিস। মা আগেই গত। জেঠাই আমাকে মানুষ করেন। জেঠাইমা তাঁর দ্বিতীয় পক্ষ। জেঠতুতো ভাই ছিল একরকম। জেঠাইমাও। জেঠা চলে যাওয়ার পরদিনদিন আমি পর হয়ে পড়লাম।”
কিকিরা বিড়ির টুকরোটা ফেলে দিলেন। মন দিয়ে কথা শুনছিলেন বলাইবাবুর।
“আমি ছোকরা বয়েসে রেলের পরীক্ষা দিয়ে গার্ডের চাকরিতে ঢুকেছিলাম। মালগাড়ির গার্ড। আমার শেষ ডেরা ছিল ধানবাদ। তারপর…”
“ঘরসংসার করেননি?”
“না। জেঠতুতো ভাই যে ব্যবহারই করুক তার ছেলেটাকেই একরকম মানুষ করেছিলাম ছেলের মতন। তার বিয়ে-থাও দিলাম। ওরা আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করল। কত না অপমান, অসম্মান করেছে। আমি বুঝতে পারলাম, পর কখনও আপন হয় না। সংসারটা বড় স্বার্থপর। শেষমেশ একদিন রাগ করে ওদের কাঁচকলা দেখিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এখান ওখান ঘুরে এই ঘাঁটিতে আশ্রয় নিয়েছি। আমার কোনও পরোয়া নেই। টাকা যেটুকু থাকার আছে। আমি এখানে সাতশো টাকা দিই মাসে মাসে। কিন্তু যা দিই তার বদলে যা পাই–সেটা কিস্যু না। তবু আছি। আই লাইক দিস প্লেস।”
কিকিরা মাথা দোলাচ্ছিলেন কথাগুলো শুনতে শুনতে। শেষে বললেন, “মন্দ কী দেন! আজকের দিনে সাতশো অবশ্য বেশি নয়, তবু আপনি মোটামুটি ভালই দেন।”।
“আমি হায়েস্ট,” বলাইবাবু বললেন, “অন্যরা কী দেয় খোঁজ করুন। রজনীদা চার-পাঁচশো, সলিলবাবুও শ’পাঁচ-ছয়। জলধর আমার সমান সমান। তা ছাড়া ওই দীনু-বেটা আমাদের কাছ থেকে এটা-সেটার নাম করে তিরিশ-পঞ্চাশ আদায় করত।”
কিকিরা হিসেবের মধ্যে গেলেন না। মাত্র চারজনের হিসেব ধরলে যে টাকা হয়–হাজার দুই-আড়াই–তাতে আজকের দিনে কোথাও মাথাগোঁজা, দুবেলা ডালভাত জোটানো মুশকিল। বাড়িটা আছে, হরিচন্দনবাবুর ভাতা আছে, সবজি বাগানের লাউ কুমড়ো শাক রয়েছে তাই এদের চলে যায়।
কথা ঘুরিয়ে নিলেন কিকিরা। “আচ্ছা বলাইবাবু, শ্রীকান্তবাবুর ওই আগুনে পোড়ার ঘটনাটা কী? আমায় বলতে পারেন!”
“আপনি শোনেননি?”
“শুনেছি। হরিবাবু বলেছেন। তবে তিনি তো এখানে থাকেন না, শোনা কথা বলেছেন। দীনুবাবুর মুখে শোনা; আপনাদের মুখেও শুনেছেন। ব্যাপারটা ঠিক কী ঘটেছিল জানেন আপনি!”
বলাইবাবু তাঁর মাথার টাকে হাত বুলিয়ে নিলেন; মুখের ভাবে আফসোস। শব্দ করলেন জিভে। “আর বলবেন না! সেই দৃশ্য ভাবলে সারা গা এখনও শিউরে ওঠে। আমি যখন তাঁকে দেখলাম–তখন ওঁর চেহারাটা কী বলব–বেগুন পোড়ার মতন হয়ে গিয়েছে। হরি। চোখে দেখা যায় না। বেচারি শ্রীকান্তবাবু! ইস..”।
“আপনারা কিছু করতে পারলেন না? আপনি কি…”
“আরে, আমি তো ছিলামই না!”
কিকিরা সতর্ক হলেন। “ছিলেন না?”
“না, মশাই। আমি আর থাকলাম কোথায়! থাকলে চেষ্টা করতাম। যে চাকরি করেছি তাতে কতরকম আপদ বিপদ যে গিয়েছে, গাড়ি বেলাইন হওয়া, ওয়াগন ভেঙে লুটের চেষ্টা, বনেজঙ্গলে আটকে পড়া, আগুন লেগে যাওয়া… কত ঝাট ঝামেলা মাথায় করে দিন কাটিয়েছি। এমনকী দু-একবার ডাকাতদের গুলিও ছুটে এসেছে গার্ডের দিকে।”
“কোথায় ছিলেন সেদিন?” কিকিরা মামুলিভাবে বললেন, বেশি কৌতূহল প্রকাশ করলেন না।
“যাত্রা শুনতে গিয়েছিলাম।”
“যাত্রা! এখানে?”
“আমি বরাবরই যাত্ৰা ভালবাসি। থিয়েটারও ভাল লাগে। তবে যাত্রার মতন আমায় টানে না। আমি যাত্রাপাগলা!”
“এখানে?”
“এখানে মানে! এখানে গাঁ-গ্রাম নেই নাকি! এই তো গায়েই রয়েছে বেলেমাটি, তারপর শীতলপুর। শীতলপুরটা বড় গ্রাম। জগদ্ধাত্রী পুজো হয় গ্রামে। বড় রাস্তার সঙ্গে লিঙ্ক আছে। সেখানে যাত্রা হচ্ছিল। কার্তিক মাস। যাত্রার মরশুম। কলকাতার একটা ছোট দল পালা গাইছিল। বন্দিনী পদ্মাবতী’।“
“তাই নাকি! এখানকার গ্রামে।
“আপনি নতুন এসেছেন, জানেন না। এদিককার প্রায় সব গাঁয়ে পুজোপার্বণ হয়, যাত্রার আসর বসে। লোকাল যাত্রাপার্টিও আছে। একটু ঘুরেফিরে দেখলেই দেখতে পাবেন, কত কী আছে গাঁয়ে : মুদিখানা থেকে চায়ের দোকান, দরমার বেড়া-দেওয়া সেলুন, মুড়ি তেলেভাজা, মেঠাই…।”
কিকিরা কথার মাঝখানে বললেন, “অত রাত্রে যাত্রা দেখে ফিরছিলেন! একলা!”
“রাত্রে ফিরব কেন! পালা ভাঙতেই দুটো-আড়াইটে বেজে গেল। বাকি রাতটুকু আসরে কাটিয়ে ভোর ভোর ফিরছিলাম। এখানে পৌঁছতেই দেখি ছুটোছুটি, হইচই লেগে গিয়েছে। প্রথমে বুঝিনি। ভেতরে পা দিতেই দেখি! উঃ! সে কী দৃশ্য দেখলাম রে বাবা! হায় ভগবান!”
