“বিপদ! আমার! হবে না হে! আমি নিজেকে বাঁচিয়ে নিতে জানি। গোলমাল বুঝলে তোমরা আছ, ডেকে নেব।”
“যা ভাল বোঝেন করুন সার,” চন্দন বলল, যেন হতাশ হয়েই।
কিকিরা পকেট হাতড়ে সরু চুরুট বার করলেন। দেশলাই চাইলেন চন্দনের কাছে। বললেন, “ঘাবড়াও মাত। চাণক্য পণ্ডিত বলেছেন, বুদ্ধি থাকলে বিপদ বুঝলেই একশো পা পিছিয়ে আসবে।”
“রাখুন আপনার চাণক্য পণ্ডিত। আপনি যাদের সঙ্গে থাকতে যাচ্ছেন তাঁদের আপনি চেনেন না জানেন না। এদের মধ্যে কে শত্রু কে মিত্র হতে পারে–তাও জানার কথা নয় আপনার। তা ছাড়া মৃণালকুঞ্জে যা ঘটেছে তার সঙ্গে ওখানকার বাসিন্দাদের সম্পর্ক নাও থাকতে পারে। হয়তো নেই। দুটো ঘটনাই নিতান্তই দুর্ঘটনা হতে পারে। আপনি তখন
“তুমি যা বলছ তা কারেক্ট হতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, হরিচন্দনবাবুর সন্দেহ বৃথা নয়। …তা সে পরে দেখা যাবে। আপাতত আমি কাজটা নিয়ে ফেলেছি। মাসখানেক অন্তত দেখি। যদি বুঝি ঘটনা দুটোর পেছনে কোনও রহস্য নেই, ফিরে আসব। আমায় কেউ জোর করে আটকে রাখছে না।“
তারাপদ হঠাৎ বলল, “ওখানে যাঁরা আছেন, যাঁরা ছিলেন তাঁদের সম্পর্কে কম-বেশি ইনফরমেশান?”
“একটা খাতা আছে মৃণালকুঞ্জে। হরিচন্দনদা বলেছেন, রেজিস্টার। তাতে মোটামুটি খবরাখবর লেখা আছে। বাকিটা আমি আদায় করে নেব।”
তারাপদ আর কিছু বলল না, চন্দনের দিকে তাকাল। রাত হয়ে এসেছে। এবার তারা উঠবে।
.
০৫.
দিন তিনেক পরের কথা। কিকিরা মৃণালকুঞ্জে আস্তানা গেড়েছেন সবে।
সেদিন বেশ গরম পড়েছে। সারাটা দিন কেমন রুক্ষ হয়েই কাটল। কালে ঝাঁঝালো রোদ, দুপুরে হাওয়া নেই তেমন। মাঠঘাট গাছপালার জন্যে খানিকটা সয়ে যাচ্ছিল গরম। বিকেলের আলো মরতে প্রায় সন্ধে। তারপর বোঝা গেল, শুক্লপক্ষ চলছে। জ্যোৎস্না ফুটে উঠতে লাগল চারপাশে। আরও পরে এলোমেলো হাওয়া উঠল চৈত্রমাসের।
কিকিরা নিজের ঘরটিতে বসে পাখা চালিয়ে একটা খাতার পাতা ওলটাচ্ছিলেন। এই খাতাটাকে সঠিকভাবে মৃণালকুঞ্জর রেজিস্টার বলা যাবে না, তবে অনেকটা ওই ধরনের।
মৃণালকুঞ্জে যাঁরা এসেছেন, থেকেছেন, চলেও গিয়েছেন–তাঁদের নামধাম, সামান্য পরিচয়, চলে গিয়ে থাকলে কবে গিয়েছেন–তার একটা বৃত্তান্ত লেখা আছে। কিকিরা পাতা ওলটাতে ওলটাতে কল্পনায় মানুষগুলির মুখ দেখছিলেন। কারও কারও কথা পড়ে দুঃখও হচ্ছিল। কিন্তু কী আর করা যাবে!
পুরনো পাতা শেষ করে কিকিরা পরের দিকের পাতাগুলোয় মন দিলেন।
রজনীকান্ত আপাতত এখানের সবচেয়ে পুরনো বাসিন্দে। খাতায় তাঁর পরিচয় লেখা রয়েছে, রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়; পিতা স্বর্গত নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। আদি নিবাস মথুরগঞ্জ, বর্ধমান জেলা। বয়েস পঁয়ষট্টি। পারিবারিক ভাবে তিনি আত্মীয়হীন। স্ত্রী বিগত। সন্তানাদি নেই। একমাত্র একটি বোন ছিল ছোট। বিবাহিতা। দুর্গাপুরে থাকতেন। তিনিও আর নেই। ভাগনে ভাগনি ছিল–কিন্তু তারা কোনও সম্পর্ক রাখেনি মামার সঙ্গে দীর্ঘকাল। কেন রাখেনি–তার কথা কোথাও লেখা নেই।
কিকিরা রজনীকান্তকে যেটুকু দেখেছেন–তাতে ভদ্রলোককে দুঃখী নিঃসঙ্গ মনে হয়। কম কথা বলেন। বোধ হয় হাঁপানি রোগ আছে, অল্পতেই শ্বাসকষ্ট হয়।
রজনীকান্ত একসময় রানিগঞ্জের দিকে কোলিয়ারিতে চাকরি করতেন। দপ্তরের চাকরি।
কিকিরা শব্দ পেলেন পায়ের। মুখ তুলে তাকালেন। বলাইবাবু।
“কী করছেন? আসব নাকি?” বলাইবাবু দরজা থেকেই বললেন।
“আসুন।” কিকিরা খাতা বন্ধ করে পাশে সরিয়ে রাখলেন।
বলাইবাবু ভেতরে এলেন।
“কিছু করছিলেন নাকি?” বলাইবাবু বললেন। পরনে লুঙ্গি। মেটে রঙের। গায়ে হাতকাটা গেঞ্জি।
“খাতাপত্র দেখছিলাম একটু,” কিকিরা আসল কথাটা চাপা দিয়ে বললেন, “হিসেব তোলা নেই অনেকদিনের; পাকা হিসেব। বসুন।”
কিকিরা বিছানায় বসেই খাতা দেখছিলেন। পাশে জানলা। বাইরের বাতাসও আসছিল মাঝে মাঝে, দমকা বাতাস। পাখাও চলছে।
বলাইবাবু চেয়ারটা টেনে বসলেন। একটাই চেয়ার। বসেই বললেন, “কীসের হিসেব দেখবেন মশাই! ওসব কি আর আসল হিসেব, দীনু ম্যানেজারের জাল হিসেব। “
কিকিরা স্বাভাবিক গলায় বললেন, “যা আছে–তাই দেখছি।”
“দেখুন। দেখে লাভ হবে না।”
“তবু দেখি। হরিবাবু জানাতে বলেছেন।” কিকিরা মিথ্যেই বললেন, এরকম কোনও কথা হরিচন্দনবাবু বলেননি। কথাটা শেষ করেই হঠাৎ কিকিরা বললেন, “দীনুবাবু এখানে দেড়-দু’ বছর ছিলেন শুনেছি। মানুষটি কেমন?”
“ও আবার মানুষ নাকি! ধত মশাই। চোর জোচ্চোর ধান্দাবাজ লোকটাকে মানুষ বললে বাড়াবাড়ি হয়! দীনু একটা জন্তু ছিল। শুধু নিজের ধান্দা। ও আমাদের যেভাবে রেখেছিল, মনে হত আমরা গোরু ছাগল। ওর দয়ায় বেঁচে আছি। দুটো নোংরা ভাত, জলের মতন ডাল, একটা ঘাট, পোড়াধোড়া রুটি… ওকে আমরা গালমন্দ করলেও কানে তুলত না। লজ্জা ছিল না। দু’কানকাটা।”
“তা আপনারা হরিবাবুকে বলতেন না?”
“হরিচন্দনবাবু এখানে আসতেন মাসে এক-আধদিন। তাঁর কাছে নালিশ করতে লজ্জা করত। তবু বলেছি।”
“লাভ হয়নি।”
“উনি আড়ালে দীনু ম্যানেজারকে হয়তো বলতেন কিছু। দু-চারদিন ইতরবিশেষ হত–আবার যে-কে-সেই। পুরনো ম্যানেজারের অভ্যেসই খারাপ ছিল। যেখান থেকে পারো দু পয়সা কামাও। চোর। ডিসঅনেস্ট।”
কিকিরা ভাবছিলেন একী বলবেন! নজরে পড়ল, বলাইবাবু লুঙ্গির কোমরের কাছে ভাঁজ থেকে বিড়ির বান্ডিল আর দেশলাই বার করলেন। বান্ডিলটা আলগা, কয়েকটা মাত্র আছে।
