কিকিরা বললেন, “আমায় কি নিরেট কাঁঠাল পেয়েছ! যা ভাববার আমি ভেবে রেখেছি।”
“যেমন?”
“যেমন ধরো, তারাপদকে আমি মৃণালকুঞ্জর সাপ্লায়ার করব!”
“সাপ্লায়ার!” তারাপদ অবাক! “কী বলছেন, সার? কীসের সাপ্লায়ার?”
“চাল, ডাল, তেল, নুন…”।
“বাঃ বাঃ! মুদিখানার জিনিস!”
“তাতে কী! কলকাতা থেকে তুমি হপ্তার মুদিখানার জিনিস পৌঁছে দেবে। হরিচন্দনবাবুর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। উনি বলেছেন, তোমার যেভাবে ইচ্ছে তোমার শাগরেদদের কাজে লাগাও, আমার কোনও আপত্তি নেই।”
তারাপদ বিরস মুখ করে বলল, “তা বলে গ্রসারি সাপ্লায়ার?”
“কাজই বড় কথা, কী করছ বড় কথা নয়!” কিকিরা জ্ঞান দেওয়ার মুখ করে বললেন, “গীতায় বলেছে…”
“প্লিজ, আপনার গীতা থাক।… কিন্তু আগে কি এইভাবে জিনিস সাপ্লাই হত মৃণালকুঞ্জে? না, লোকাল মার্কেট থেকে নেওয়া হত!”
“আগে কী হত বাদ দাও। মাঝেসাঝে হত। এখন থেকে রেগুলার হবে। আমার ম্যানেজমেন্টে যা ভাল বুঝবকরব। নতুন ম্যানেজার-কেয়ারটেকারের মরজি।”
“মরজি!”
“শোনো হে তারাবাবু, চাঁদু-তুমিও শোনো,” কিকিরা মেজাজি গলায় বললেন, “আমি সিস্টেম পালটে দেব মৃণালকুঞ্জর। সাদামাঠাই খাওয়াব মেম্বারদেরবা বলতে পারো যাঁরা আছেন তাঁদের–তবে যত্ন করে; যা জুটল হাতের কাছে, চালিয়ে দেব না। ওঁদের দিকে নজর দেব। মেলামেশা করব, গল্পগুজব চালাব, আড্ডা জমাব। মানে বলাইবাবু, রজনীবাবুদের ফ্রেন্ড হয়ে যাব। ওঁদের মন পেতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে বোঝাতে হবে, আরও একটু ডিসেন্টভাবে তাঁরা থাকতে পারেন। একটুকরো সাবান, সামান্য মাথার তেল–এসব তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে তাঁদের মাথা ঘামাবার দরকার নেই। আমি আছি।”
“তারপর?”
“তারপর একে একে ওঁদের পেট থেকে কথা বার করতে হবে। সাবধানে। আমায় পছন্দ না হলে, বিশ্বাস না করলে মনের কথা বলবেন কেন?”
“আপনিও তবে মনে করেন, মৃণালকুঞ্জে কোনও মিস্ত্রি আছে?”
“হরিচন্দনবাবুর সন্দেহ বিশ্বাস করলে তোমায় তো মানতেই হবে–দুটি মৃত্যুর পেছনে রহস্য আছে।”
চন্দন মাথা নাড়ল। মানতে বাধ্য হল যেন কথাটা। বলল, “তারা না হয় চালডালের সাপ্লায়ার হল”।
কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে কিকিরা হেসে বললেন, “ঘাবড়াবার কিছু নেই হে তারাবাবু! তোমায় মোট মাথায় করে যেতে হবে না। ওই যে স্কুটার ভ্যান জিনিস ডেলিভারি দেয়, তাতে করেই জিনিস নিয়ে যাবে। হরিচন্দনা ব্যবস্থা করে দেবেন। তোমার শুরুটা এইভাবে হবে!”
“আর আমার?” চন্দন বলল।
“তুমি! তোমাকে আমি আমার বন্ধুর ভাই-টাই বানিয়ে ফেলব। মানে, বন্ধুর ভাই; আর পুরনো প্রতিবেশীও।” বলতে বলতে কিকিরা নিজের মাথার চুল ঘাঁটলেন। হাসলেন আলগাভাবে। “ধরো, ব্যাপারটা এইরকম দাঁড়াবে যে-”আমি যেন নিজের খেয়ালে বাড়ি ছেড়ে মৃণালকুঞ্জে চলে এসেছি, তোমাদের আপত্তি সত্ত্বেও, ফলে দাদার হুকুমে তুমি আমার খোঁজখবর নিতে আসো। …কী, পছন্দ হয়?”
“না।”
“না কেন?”
“আপনি কি নাবালক যে, আপনার খোঁজ নিতে আসব রোজ?”
“রোজ কেন আসবে। দু-চারদিন অন্তর আসবে। তুমি স্কুটার চালাতে জানো। স্কুটার হাঁকিয়ে চলে আসবে। যেন বেড়াতেই এসেছ! মাঠঘাট, বিশুদ্ধ বায়ু–নো পলিউশান..”
চন্দন মাথা নাড়ল। “গোঁজামিল হয়ে যাচ্ছে, সার। মৃণালকুঞ্জের বাসিন্দাদের কনভিন্স করাতে পারবেন না। …আপনি যা বলছেন–আপনার খোঁজ নিতে আসা–সেটা এক-দুবার হতে পারে, বারবার হয় না।”
“হয় না?” কিকিরা মাথা দোলাতে লাগলেন। ভাবছিলেন, না কি ভাববার ভান করছিলেন! শেষে বললেন, “হয়। …ধরো তুমি না হয় নিছক হাওয়া খেতে এলে না, তোমার মাথায় একটা মতলবও এসেছে হঠাৎ।”
“মতলব! কীসের মতলব?”
“ওই বন্ধ কারখানাটা কেনার মতলব। “
“ওটা তো বন্ধ। আমি বিজনেসম্যানও নই। কারখানা কিনে কী করব!”
“ওই তো মজা। কিনবে কেন? কেনা-কেনা ভাব করবে। হরিসংকীর্তন পার্টিতে সবাই তো দু হাত তুলে নাচে না, অনেকে বসে বসে মাথা দোলায়। সেই রকম। একটা চাল মারবে, যেন তুমি কারখানাটা সম্পর্কে ইন্টারেস্টেড। আরে, আজকাল কত লোক ফাঁকা জায়গায় ঘরবাড়ি বানাবার বিজনেসে নেমে গিয়েছে। প্রমোটার হয়ে যাচ্ছে রাতারাতি। জলের দরে জমি কিনে দোতলা, তেতলা ফ্ল্যাটবাড়ি করছে দু নম্বরি, তিন নম্বরি ইট সিমেন্ট দিয়ে। জুতসই একটা নাম দিয়ে দিচ্ছে বাড়িগুলোর, গ্রিন পার্ক, সানি গার্ডেন…। তুমি না হয় প্রমোটার নাই বা হলে–তা বলে একটা বন্ধ কারখানার দিকে তোমার নজর পড়তে পারে না?”
“ওটা সার একেবারেই বন্ধ। ক্লোজড। ফটকও খোলে না।”
“ভুল বললে। মিস্টেক। তোমাদের চোখ নেই। কারখানার ফটক বন্ধ হলেও একজন চৌকিদার আছে। ফটকের গায়েই তার আস্তানা। আমি দেখেছি। হরিচন্দনবাবুও বলেছেন কথায় কথায়।”
তারাপদ এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার বলল, “কিকিরা, আপনার মোদ্দা কথাটা কী? আপনি নিজে থাকবেন ওই মৃণালকুঞ্জে, আর আমরা থাকব বাইরে? এই তো?”
হাসলেন কিকিরা। “ধরেছ ঠিক। তোমরা বাইরে থেকে আমাকে মদত দেবে। তোমাদের খেলা বাইরে থেকে। আমার ভেতর থেকে। একজন পাক্কা ম্যাজিশিয়ানের অ্যাসিস্টেন্ট হ্যান্ডরা খেলাটাকে পারফেক্ট করে। তারা ডুবোলে ম্যাজিকমাস্টারও ডুবে যায়।”
চন্দন বিশেষ খুশি হল না। বলল, “এভাবে আপনি একলা ও বাড়িতে থাকলে যদি একটা বিপদ হয়?”
