তারাপদরা সামান্য তফাতে দাঁড়িয়ে দেখছিল মৃণালকুঞ্জর বাসিন্দাদের।
চারজন মানুষই বৃদ্ধ নয়, মানে কাউকেই সত্তরবাহাত্তর বলে মনে হয় না। অথর্ব অক্ষমও নন। এঁদের অবশ্যই প্রৌঢ় বলা যায়, কিংবা আধবুড়ো। বলাইবাবুর চেহারা দেখলে বাষট্টির কম মনে হয় না। মাথায় বেঁটে, গোল ধাঁচের গড়ন, মাথায় টাক, হাত-পা শক্ত হলেও মাপে খাটো। মুখ গোল, চোখও গোল, বড় বড়; নাক মোটা। গায়ের চামড়া যেন কুঁচকে গিয়েছে। মুখেরও। ভদ্রলোক একটা ঢলঢলে প্যান্ট পরে গায়ে সুতির স্পোর্টস গেঞ্জি গলিয়ে হাতে বেতের মোটা মতন লাঠি নিয়ে যেন কোথাও ঘুরতে বেরুচ্ছিলেন। হয়তো বিকেলে হাঁটাচলা করার অভ্যেস রয়েছে। পায়ে ক্যানভাসের বুটজুতো। খাকি রঙের।
চন্দন নিচু গলায় তারাপদকে বলল, “চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ব্লাডসুগারের পেশেন্ট।”
রজনীকান্ত ঢেঙা, রোগা, শীর্ণ। মাথায় সামান্য সাদা চুল। মুখের ধাঁচ লম্বা, সোজা নাক, কপাল কুঁচকোনো, গাল তুবড়ে গিয়েছে। হাতে-কাঁচা ধুতি আর আধ-ময়লা পাঞ্জাবি পরনে। পায়ে চটি। রজনীকান্তই বাগানে বসে গাছের পরিচর্যা করছিলেন সামান্য আগে। ডাক পেয়ে বাগান ছেড়ে উঠে এসেছেন। হাতে একটা লোহার শিক। ভদ্রলোকের বয়েস সাতষট্টি কি আটষট্টি হবে! না, সামান্য কমই! চোখের তলায় চামড়া ঝুলে পড়েছে।
সলিলবাবু আর গৌরবাবু মোটামুটি মাঝারি মাথার মানুষ, না-লম্বা—না বেঁটে। সলিলবাবুর হয়তো বাষট্টি-চৌষট্টির আশেপাশে বয়েস। গায়ের রং ময়লা। চৌকোনো মুখ। মাথার মাঝখানে টেরি। চুল সামান্য। কাঁচাপাকা। দোহারা গড়ন। চোখে চশমা। পরনে গেরুয়া রঙে ছাপানো লুঙ্গি, গায়ে একটা পাতলা বুশ শার্ট, দু-একটি মাত্র বোতাম লাগানো আছে, বাকিগুলো খোলা। চোখের দৃষ্টি সতর্ক।
জলধরবাবুকে দেখলেই মনে হয় ভদ্রলোক যেন সবেই ষাট ছাড়িয়েছেন। মাথার চুল পাকেনি বললেই চলে, মোটা গোঁফ, গোঁফের চুলে সাদা দাগ ধরেছে। গায়ের রং কালো। চোখের দৃষ্টিতে কেমন এক বিরক্তি মেশানেনা। সামান্য লালচে চোখ। হাতের আঙুল মোটা মোটা। ডান হাতে একটি পলার আংটি। ভদ্রলোকের পরনে ছিল ধুতি আর গায়ে ফতুয়া।
হরিচন্দন আর দেরি করলেন না। কিকিরাকে বললেন, “এসো, বাড়িটা তোমায় দেখিয়ে দি।” বলেই কী খেয়াল হল, তারাপদদের ডাকলেন হাত নেড়ে। তারপর মুখ ফিরিয়ে বলাইবাবুদের দিকে তাকালেন। “এরা দুজন রায়ের লোক। ওরা সঙ্গে এসেছে।” বেশি কিছু বললেন না।
কিকিরাদের নিয়ে হরিচন্দন বাড়ি দেখাতে চললেন।
নীচের তলায় ঘুরতে ঘুরতে কিকিরা বললেন, “হরিচন্দনদা, এখানে প্রথম ঘটনা তা হলে ওই আগুনে পোড়া?”
“হ। শ্রীকান্তবাবু আগুনে পুড়ে মারা গেলেন।”
“তার আগে কিছু হয়নি?”
“না। মৃণালকুঞ্জে কিছু হয়নি। তবে মৃণালকুঞ্জ ছেড়ে দু-চারজন চলেও তো গিয়েছে। তাদের মধ্যে সতীনাথবাবু মারা গিয়েছেন শুনেছি।”
“ছেড়ে চলে গিয়েছেন যাঁরা তাঁরা কি এমনিই গিয়েছেন, না?”
“কারও হয়তো পোষায়নি। কেউ বা শেষপর্যন্ত কিছু ভেবে আত্মীয়দের কাছেই ফিরে গিয়েছেন। কিংবা ওরাই ফেরত নিয়ে গিয়েছে। একজন তো বরাবরের মতন হরিদ্বারে চলে গেলেন। ধর্মটর্ম করে বাকি জীবনটা কাটাবেন।”
“এখানে তা হলে বরাবর কেউ থাকে না?”
“আছে। রজনীবাবু আছেন। বলাইবাবুর বছর দুই হতে চলল। …শোনো রায়, আমার এখানে ছ’জনের বেশি লোকের থাকার ব্যবস্থা নেই। কেউ যদি চলে যায়, অসুবিধে হচ্ছে ভেবে আমি তাকে আটকাবার কে? যাবে যাক। তার জায়গায় আবার কেউ এসে পড়ে।”
“প্রথম ঘটনাটা কবে যেন ঘটেছিল, দাদা?”
“পাকাপাকি হিসেবে–এই তোমার কার্তিক মাসের শেষে।”
“দ্বিতীয়টা–মানে আত্মহত্যার ঘটনাটা?”
“গত মাসে, মাঘ মাসে।”
হরিচন্দন এবার সিঁড়ি ধরে দোতলায় উঠতে লাগলেন।
.
০৪.
পরের দিন কিকিরার ঘরে মিটিং বসেছিল : চন্দন, তারাপদ আর কিকিরা।
চন্দন বলল, “কাল তা হলে আপনি মৃণালকুঞ্জে চললেন? বাক্স বিছানা বাঁধা হয়ে গিয়েছে?” ঠাট্টার গলাতেই বলল সে।
কিকিরা বললেন, “ওয়ান সুটকেস অলি। বিছানার দরকার নেই। ম্যানেজারের ঘরে খাট বিছানা আছে। একটা চাদর নিয়েছি। আর টুকটাক।”
কথাটা ঠিকই। মৃণালকুঞ্জের ম্যানেজার কাম-কেয়ারটেকারের ঘরটি ছোট হলেও ব্যবস্থা আছে শোওয়াবসার। খোলামেলা ঘরই বলা যায়। তিনটে মাঝারি মাপের জানলা। দুটি জানলা পুব ঘেঁষেবাকিটা দক্ষিণে। ঘরে পাখাও আছে। অন্য কোনও ঘরে পাখা নেই। খাওয়ার সরু লম্বাটে ঘরে অবশ্য আরও একটা ছোট পাখা লাগানো আছে মাছি তাড়াবার জন্যে।
কিকিরা সবই খুঁটিয়ে দেখে নিয়েছেন কাল। জলের ব্যবস্থা বলতে বাঁধানো কুয়ো। তার ওপর হাত-টিউবওয়েল, ঝাঁকি মেরে জল তুলতে হয়; ওরই পাশে একটা ছোট মাপের পাম্পসেট। নল ডোবানো আছে কুয়োর ভেতর। দরকারে দোতলাতেও জল তোলা যায়। ওটা জরুরি নয় হয়তো।
চন্দন বলল, “আপনি তো ম্যানেজার হয়ে মৃণালকুঞ্জে চললেন। এখানকার কী হবে?”
“কেন, বগলা রয়েছে। আমি কলকাতায় না থাকলে বগলাই বাড়ি দেখাশোনা করে। তা ছাড়া কদমপুর গায়ের পাশেই; মাত্র মাইল দশবারো। ওখান থেকে বাসে আসতে ঘণ্টা-সোয়া ঘণ্টা। আমিও ভিজিট দেব হে।”
চন্দন সিগারেট ধরাল। তারাপদর গলা খুসখুস করছে, সিগারেট খাবে না। ধোঁয়া গিলে নিল চন্দন। বলল, “আপনি ম্যানেজারি করবেন। করুন। আমরা কী করব?”
