“পেয়েছেন ভূতদের?”
“দু’বার পেয়েছি। একবার এক ফরাসি ভূত এল চন্দননগর থেকে, আর-একবার আগ্রা থেকে এক পালোয়ান ভূত। দুজনেই যে কী বলতে চাইল বুঝলাম না! ব্যাপারটা নিয়ে রগড় মন্দ হয়নি। তা রায়ভায়া, মৃণালকুঞ্জে ভূত আসার কোনও কারণ দেখছি না। আমার পিতামশাই মাতাঠাকরুন সজ্ঞানে গঙ্গালাভ করেছেন। আমি এখনও মরিনি। গিন্নিও বেঁচে। ছেলে খাসা ব্যবসা করছে। বউমা ঘরসংসার করে আর ফাঁকেফোকরে পুতুলের ডিজাইন করে। নাতি বাচ্চা। পড়াশোনা করে স্কুলে। তা হলে ভূতটা আসবে কোথা থেকে?”
বনমালী আচমকা ব্রেক করল। একটা গোরু এসে পড়েছিল রাস্তার মাঝখানে, অন্য একটা মোষের তাড়া খেয়ে।
হরিচন্দন দেখলেন। বললেন, “বনমালী, সামলে চলো।”
নাগেরবাজারের কাছে হালকা ভিড়। তারপর রাস্তা বেশ ফাঁকা। বিকেল পড়ে এলেও আলোয় ঘোলাটে ভাব ধরেনি।
.
মৃণালকুঞ্জ বড় রাস্তার গায়ে নয়। বাসরাস্তা থেকে একটা আধাআধি পাকা রাস্তা, পাথরের টুকরো আর খোওয়া ছড়ানো, খানিকটা এবড়োখেবড়ো, চলে গিয়েছে ডাইনে। পশ্চিম দিকে। ছোট গ্রাম, মাঠঘাট, খেত, গাছপালা চোখের সামনে শান্ত একটা ছবি ভেসে ওঠে। রোদ মরে আসছে, আলো রয়েছে। বাতাস রয়েছে ফাল্গুন-চৈত্র মাসের। ফাল্গুন শেষ হয়েছে সবে গতকাল।
ইলেকট্রিক তারের খুঁটি দেখতে পেল চন্দন। কী যেন বলল।
বড়জোর সিকি মাইল, হয়তো তারও কম। মাঝপথে একপাশে একটা টিনের শেড, খানিকটা জায়গা পাঁচিল ঘেরা। ছোট কারখানার মতন দেখায়। হয়তো তাই। তবে বন্ধ।
“কারখানা! এখানে?” চন্দন বলল পেছন দিকে ঘাড় হেলিয়ে।
হরিচন্দন একটা কানে কম শোনেন। কিন্তু চন্দনের কথা মোটামুটি কানে গিয়েছিল। বললেন, “বন্ধ হয়ে গিয়েছে। জেলি, সস, পপকর্ন, চিপস–এইসব ফুড প্রোডাক্টসের কারখানা করেছিল একটা কোম্পানি। দুই বন্ধু। বছরখানেকের মধ্যে গণেশ উলটে গেল। ওসব কি এখানে চলে? তবে আমার খানিকটা সুবিধে হল। ওরা জারুল মোড় থেকে ইলেকট্রিকের তার টেনে এনেছিল––পয়সা খরচ করে। আমার মৃণালকুঞ্জ পর্যন্ত–বাকিটা আমি ব্যবস্থা করে নিলাম। কম খরচে হল।”
আবার মাঠ! সবজি খেত। চমৎকার শশা, কুমড়ো ফলিয়েছে খেতের মালিক। বাঁশঝাড়। নিমগাছ।
মৃণালকুঞ্জ এসে গেল। কিকিরারা গাড়ি থেকে নামলেন। বাইরে থেকে দেখলেও তারিফ করতে হয়! হাত কয়েক উঁচু পাঁচিল, তার ওপর কোনো লোহার পোস্ট, কাঁটাতার। ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই প্রথমে নজরে পড়ে কাঁটাঝোঁপের বেড়া, রাংচিতে। সামনের মাঠে বাগান। সাধারণ ফুলের গাছ। যত্ন বিশেষ নেওয়া না হলেও একেবারে অযত্নে জঙ্গল হয়ে যায়নি। বড় গাছের মধ্যে আম, পেয়ারা, এমনকী একটা বেলগাছও চোখে পড়ে।
মৃণালকুঞ্জর বাড়িটার ধরন বা ছাঁদ অনেকটা ইংরেজি ‘এল (L) অক্ষরের মতন। নীচের তলায় পাকা গাঁথুনি ছাদ, দোতলার মাথায় টালির ছাদ। বাড়িটার গায়ে গায়ে করবী, টগর, কাঠচাঁপা আর লতাপাতা চোখে পড়ে।
মালী এসে দাঁড়াল সামনে।
হরিচন্দন কিকিরাকে বললেন, “এখানকার মালী, চৈতন্য। ও-ই আবার দরোয়ান।” বলে চৈতন্যর দিকে তাকালেন, “বাবুরা কোথায়?”
বাবুদের মধ্যে একজনকে কাছাকাছি দেখা যাচ্ছিল। বাগানের একপাশে বসে যেন কিছুর পরিচর্যা করছিলেন।
চৈতন্য বলল, “ডাকব বড়বাবু?”
“হ্যাঁ।” মাথা নাড়লেন হরিচন্দন।
কয়েক ধাপ সিঁড়ির গায়েই লম্বা বারান্দা। সিমেন্ট ফেটেফুটে গিয়েছে। মাঝেমাঝেই মেরামতির দাগ। একটা কাঠের চেয়ার, ভাঙা মোড়া, একটা বেঞ্চি আর কাঠের টেবিল পড়ে ছিল।
তারাপদ আর চন্দন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। দেখছিল। নিজেদের মধ্যে কথাও বলছিল নিচু গলায়।
হরিচন্দন বললেন, “ভাগের মা গঙ্গা পায় না বলে একটা কথা আছে, রায়। জানো তো? অনেক বলেকয়েও বাড়িটা আমি সাফসুফ রাখতে পারলাম না। দীননাথ চলে যাওয়ার পর আরও বেহাল হয়ে আছে।”
“এখন কে দেখাশোনা করে?”
“কেউ না। ঠাকুর, বামুনে যা পারে রাঁধে আর নকুল বেটা একবার হয়তো ঝাড় মারে ঘরদোরে। চৈতন্যই এখন মুরুব্বি।”
“যাঁরা আছেন তাঁরাই তো খানিকটা দেখাশোনা করতে পারেন।”
“একটু আধটু করে হয়তো। আগ বাড়িয়ে কেউ দায় নিতে চায় না।”
আরও দু-পাঁচটা কথার মাঝখানে চৈতন্য মৃণালকুঞ্জর বাসিন্দাদের ডেকে আনল।
হরিচন্দনবাবুকে নমস্কার করলেন সকলেই। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন কিকিরাদের।
কোনও ভূমিকা না করেই হরিচন্দনবাবু কিকিরার সঙ্গে প্রৌঢ় ভদ্রলোকদের আলাপ করিয়ে দিতে লাগলেন।
“ইনি বলাইবাবু। বলাইচাঁদ দত্ত।… উনি রজনীবাবু–রজনীকান্ত চাটুজ্যে। আর উনি সলিল দাশগুপ্ত। …কই, জলধরবাবু–সামনে আসুন; জলধর হালদার।… আপনাদের দেখাশোনার জন্যে এঁকে আনলাম, নতুন মানুষ। এঁর নাম কিঙ্করকিশোর রায়। আমার চেনাজানা। এখন থেকে ইনিই মৃণালকুঞ্জর হেড। আপনাদের দেখাশোনা ইনিই করবেন। নতুন কেয়ারটেকার।”
কিকিরার মুখে অমায়িক হাসি। বিনীত ভঙ্গি। স্বাভাবিক সৌজন্য দেখিয়ে নমস্কার করলেন ভদ্রলোকদের।
ভদ্রলোকরা বোধ হয় সামান্য অবাকই হয়েছিলেন। বেখাপ্পাভাবে হাত তুলে প্রতিনমস্কার জানালেন।
হরিচন্দন বললেন, “দীননাথ চলে যাওয়ার পর আপনারা সবাই ভয়ে ভয়ে আছেন। আগেরবার এসে আমি দেখলাম ঘাবড়ে গিয়েছেন আপনারা। না, না, ঘাবড়াবার কিছু নেই। সংসারে এমন ঘটনা ঘটে, দুর্যোগ আসে। ভয়টয় পাবেন না কেউ। এবার যাঁকে বসিয়ে যাচ্ছি–তিনি শক্ত ধাতের মানুষ! ..কী জলধরবাবু? জোর পাচ্ছেন তো মনে! জোর করুন। দীননাথ একটা ভিতু, মুখ। ওর কথাবার্তা ভুলে যান। যা প্রাণে চায় বলেছে। গল্প ফেঁদেছে। নিন, আপনারা এবার আগের মতন থাকুন। আমি তো বলছি, কোনও ভয় নেই। “
