“আজ্ঞে না; কাজটা আমি হাতে নিয়েছি যখন, তখন আপত্তি কীসের!”
“ভাল কথা। …তুমি কবে থেকে আসতে পারবে?”
“যখন থেকে আপনি বলবেন। কাল পরশু–যে কোনও দিন থেকে।”
“তবে পরশুই চলে আসবে। বনমালী তোমায় পৌঁছে দিয়ে যাবে।”
কিকিরা একবার ঘাড় বেঁকিয়ে তারাপদকে দেখলেন। তারাপদ শুনতে পাচ্ছে কথাগুলো। চন্দন সামনে বসে। তার কানে গেল কিনা কে জানে!
“আপনার আগের ম্যানেজারের কী হল?” কিকিরা বললেন। জানেন তিনি, শুনেছেন, তবু বললেন।
“দীননাথ। সে পালিয়েছে। “
“ঠিক কবে পালাল?”
“মুরলীবাবু আত্মহত্যা করার পর। ব্যাপারটা এমন আচমকা ঘটে গেল যে, দীননাথের মাথা বিগড়ে গেল। ভয়ও পেয়ে গিয়েছিল। তার ওপর থানা পুলিশের হাঙ্গামা। পোস্টমর্টেমও হয়েছিল বডির। দীননাথ আমায় এসে বলল, সে আর চাকরি করবে না। একটা দিনও আর থাকবে না মৃণালকুঞ্জে। …তো আমি বললাম, বেশ, না থাকবে থেকো না। দীননাথ চাকরি ছেড়ে দিল। “
তারাপদ ঘাড় বেঁকিয়ে কথা শুনছিল হরিচন্দনের। বলল, “উনি এত ভয়। পেলেন কেন? আগেও তো..”
“হাঁ, মাস দুই-আড়াই আগে বেচারি শ্রীকান্তবাবু আগুনে পুড়ে মারা গেলেন। সেও অদ্ভুত! তখন থেকেই দীননাথ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তবু চলে যেতে চায়নি।”
“ভয়ের কারণটা কী? অবশ্য এটা ঠিক যে, পরপর দুটো বড় দুর্ঘটনা ঘটলে নার্ভ শক্ত রাখা কঠিন,” কিকিরা বললেন। “দীননাথ কি দুর্বল মনের মানুষ ছিলেন? মানে খানিকটা ভিতু ধরনের?”
“কেমন করে বলব! ও প্রায় দু বছর মৃণালকুঞ্জর দেখাশোনা করেছে। আগে কখনও অমন ছটফট, কান্নাকাটি করেনি। এবার একেবারে হাতেপায়ে ধরে ফেলল একরকম। সে কিছুতেই আর চাকরি করবে না। আমিই বা তাকে জোর করে ধরে রাখি কেমন করে! ছেড়ে দিলাম।”
কিকিরা বুড়ো আঙুলের ডগা দিয়ে কপালের ওপর দিকটা চুলকে নিতে নিতে কী ভেবে বললেন, “দীননাথের বয়েস কত হয়েছিল? আপনার চেনা?”
“বয়েস পঞ্চাশের ওপর। আমার মুখচেনা ছিল। আগে ও আমাদের এদিকেই থাকত। কাজ করত একটা হোসিয়ারি কোম্পানিতে। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যখন যা জুটত তাই করত। শেষে ওই যে–আজকাল যেটা খুব চলে– ফিনান্সিয়াল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি–কী যেন নাম–তার এজেন্ট…”
কথা শেষ করতে পারলেন না হরিচন্দন, দমকা কাশি এসে গিয়েছিল। সামলাতে লাগলেন।
কিকিরা বললেন, “একজন বয়স্ক মানুষের হঠাৎ এমন ভয় পাওয়ার আশ্চর্য!”
“আরে কী বলব?” হরিচন্দন বললেন, “ওর মাথায় কোত্থেকে এক উদ্ভট ভাবনা জুটে গেল কে জানে! আমায় বলল, মৃণালকুঞ্জে কোনও অশুভ আত্মা প্রেতাত্মার নজর পড়েছে।”
“কী?” কিকিরা অবাক! তারাপদও ঘাড় ঘুরিয়ে হরিচন্দনকে দেখতে লাগল। চন্দন সামনের সিটে বসে, মাথা-ঘাড় পেছন দিকে হেলিয়ে দিল। কিকিরা বললেন, “অশুভ আত্মা প্রেতাত্মা! তার মানে?”
হরিচন্দন বললেন, “মানে আমি জানি না, ভায়া। আমিও বুঝিনি। দীননাথ যা বলেছিল তার মর্ম হল : কোনও অশুভ আত্মা মৃণালকুঞ্জের ওপর নজর দিয়েছে।”
“কেমন করে বুঝল দীননাথ!”
“ও বলল, যে দু’দিন দুটো দুর্ঘটনা ঘটল, সেই দু’দিনই একটা জিনিস লক্ষ করেছে ও। সন্ধে থেকে মৃণালকুঞ্জে কেমন একটা বিচ্ছিরি বাজে ধূপের গন্ধ পাওয়া যায়, রাত্রে মনে হয় আশেপাশে কোথাও একটা সাপুড়িয়া তার বাঁশি বাজাচ্ছে, শব্দটা অস্পষ্ট কিন্তু বাজতেই থাকে, আর মাঝরাতে এমনভাবে কুকুর কাঁদে যে, ভীষণ অস্বস্তি হয়। তার ওপর গাছপালার আওয়াজ তো আছেই।”
তারাপদ বলল, “ভৌতিক ব্যাপার! অশরীরী। …তা উনি–দীননাথবাবু কখন থেকে এটা বুঝলেন? প্রথমবারের পর?”
“প্রথমবার ও অতটা ঠাওর করতে পারেনি। গোড়ায়। পরে সন্দেহ হচ্ছিল। দ্বিতীয়বারের পর দীননাথ মন থেকে আর ধারণাটা তাড়াতে পারল না। ঘাবড়ে গিয়েছিল। ভয় পেয়েছিল ভীষণ। “
বনমালী ভাল গাড়ি চালায়। না জোরে না ধীরে, একই ভাবে চালিয়ে যায়। অকারণ হর্ন দেওয়া নেই, হুটহাট ব্রেক মারা নেই। ততক্ষণে যশোর রোড ধরে ফেলেছে বনমালী।
রাস্তাঘাট ফাঁকা নয়, আবার শেষ বিকেল থেকে যেমন ভিড় বাড়ে তেমন ভিড়ও নেই। পাতিপুকুরের ব্রিজের কাছে অল্প জ্যাম ছিল, গাড়ি দাঁড়াল সামান্যক্ষণ; আবার চলতে লাগল।
চন্দন একই ভাবে বসে। মাঝেসাঝে বনমালীকে দু’-একটা কথা বলছিল।
হরিচন্দনবাবুর কী যেন মনে পড়ে গেল হঠাৎ, কিকিরাকে বললেন, “ও, হাঁ; একটা কথা খেয়াল হল। দীননাথ বলছিল, দু দিনই–ঘটনা দুটো ঘটে যাওয়ার পর সে আমাদের মৃণালকুঞ্জর সামনের দিকের ফটকের বাইরে পিলারের পাশে একটা জিনিস দেখেছে। মাটির বড় ধুনুচি, ছুঁটে পোড়া, এক মুঠো হলুদ রং মেশানো চাল, মাটির ছোট্ট ধেবড়া পুতুল–এক-দেড় আঙুল লম্বা বড় জোর। সাপের খোলস আর সিঁদুর মাখানো আমপাতা, একটা জবাফুল…।”
তারাপদ বলল অবাক গলায়, “তুক?”
“হতে পারে,” হরিচন্দন বললেন, “দীননাথের কথায়, তুক।”
কিকিরা বললেন, “ভৌতিক কাণ্ডকারখানা, তার সঙ্গে তুকতাক। এ তো বেশ জমে গিয়েছে, দাদা।” বলে হাসলেন মুচকি।
“তোমারও কি ভূতে বিশ্বাস আছে, রায়?”
“খাঁটি ভূতে ভয় পেতে পারি, কিকিরা বললেন, “নকল ভূতে ভয় পাই না।”
“আমি” হরিচন্দন ঠাট্টার গলায় বললেন, “একসময় ভূতচচা করেছি। আমার দুই জেঠতুতো খুড়তুতো ভাইয়ের সঙ্গে বাড়ির চিলেকোঠায় বসে প্ল্যানচেট করতাম; সার্কেলেও বসেছি।”
