চা আর খাবার রাখল সাধন। যাওয়ার সময় বাতি জ্বেলে দিয়ে গেল বারান্দার।
“নাও, একটু চা খাও,” বলে কিকিরার দিকে তাকালেন। পরের মুহূর্তে কী খেয়াল হল, লজ্জার মুখ করে হাসলেন, বললেন, “ভুল হয়ে গেল, আজকাল মুখের ঠিক থাকে না, পানুর বন্ধু আপনি, তুমি করে বলে ফেললাম। নিন, চা খান।”
কিকিরা বললেন হাসিমুখেই। “তুমি’ বলে ঠিকই বলেছেন। পানুবাবুকে আমি দাদা বলি, মুখোমুখি কথার সময় পানুদা। আপনি পানুদার দাদার বন্ধু। আমাকে তুমি বলার হক আপনার আছে। বয়েসে আপনি বড়।”
“আমার সিক্সটি সেভেন। তোমার?”
“পঞ্চাশ ধরেছি এবার।”
“অনেকটাই ছোট বয়েসে।”
কিকিরারা চা নিলেন।
চুরুট ধরানো হয়ে গিয়েছিল হরিচন্দনের। ধোঁয়া টানলেন। “তা হলে তুমি রাজি হচ্ছ? চোখে একবার বাড়িটা দেখলে–
“দেখব,” কিকিরা বললেন, “আমি নিজেই দেখার কথাটা তুলতাম। কী ভাবে দেখতে যাব বলুন?”
“আমি তোমাদের নিয়ে যাব। কবে যাবে?”
“যেদিন আপনি বলবেন।”
“কালকেই চলো। আমি গাড়ি নিয়ে যাব। তোমরা এখানে এলে, এখান থেকেই যাওয়া যাবে। না হয় তোমাদের তুলে নিতে পারি। কোথা থেকে তুলব বলো! তবে বিকেলের দিকেই যাওয়া ভাল। ধরো, চারটে নাগাদ। এখন বেলা বড় হয়েছে। হাতে সময় থাকবে বাড়িটা দেখার। “
কিকিরা তারাপদর দিকে তাকালেন।
তারাপদ বলল, “আমার অসুবিধে হবে না। খানিকটা আগে আগে ছুটি নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ব। তবে চাঁদু-”
“কে চাঁদু?”
“আমার আরেক শাগরেদ। আগেই বলেছি আপনাকে। চাঁদু– মানে চন্দন ডাক্তার।“
“ও! … তা তোমরাই আগে চলো। দেখে নেবে জায়গাটা, আমার বাড়ি মৃণালকুঞ্জ; তারপর ওই ডাক্তারকে নিয়ে যেয়ো।”
কিকিরা চা খেতে খেতে বললেন, “আপনার কাছ থেকে জানার কথা অনেক আছে। তবে তার আগে বাড়ি আর জায়গাটা একবার দেখে নিতে চাই। কলকাতা থেকে কতটা দূর হতে পারে?”
“মাইলের হিসেবে বারো চোদ্দো। যশোর রোড দিয়ে যেতে হয়।”
“এখন ওখানে ক’জন আছেন?”
“চারজন। ছিল ছয়। দু’জন চলে গেল। ওই চারজন বাদ দিলে রাঁধুনি, কাজের লোক আর মালী একজন। মালীই আমার বাড়ির দরোয়ান।”
“যাঁরা আছেন তাঁরা নিজেরা খরচাপাতি করেই…”
“না না,” মাথা নাড়লেন হরিচন্দন, “খরচাপাতি বলতে বাঁধাধরা কিছু নেই। যার যেটুকু সামর্থ্য দেন; কেউ দু-চারশো, কেউ বা পাঁচ-ছয় বাকিটা আমার। দু’বেলা খাওয়া আর সাদামাঠা জলখাবার টাকাপয়সা আমাকেই দিতে হয়।”
কিকিরা কয়েক মুহূর্ত দেখলেন হরিচন্দনকে। “আপনার তা হলে দায় অনেক। টাকাও যায় মাসে মাসে কম নয়।”
“যায়, তবে রাজার হালে তো ওরা থাকে না। সাদাসিধে খাওয়া-দাওয়া। কাজের লোকদের সব খরচটাই আমার। তবে কি জানো ভায়া, আমার গায়ে লাগে না। একটা ভাল কাজ করব বলেই তো হাত দিয়েছিলাম। টাকার কথাও মাথায় ছিল। দেখলাম, আমার যা আছে তার থেকে খানিকটা গেলেও আমরা মরে যাব না। অন্য কোনও দায় আমার নেই। ছেলে বাইরে। তার ব্যবসাও ভাল চলে। এবাড়িতে আমরা মাত্র দুটি প্রাণী আর কাজের লোক। নীচে ভাড়া বসিয়েছি। ভাড়ার টাকায় যা হাতে আসে তার সঙ্গে আরও দু-পাঁচ হাজার যায় আমার মাসে-মাসে। ভাবি, যা করছি আমার মায়ের নামেই করছি। টাকা জমিয়ে যক্ষ সেজে বসে থেকে আমি কী করব!”
কিকিরা কেমন মুগ্ধ হয়ে শুনলেন কথাগুলো।
.
০৩.
পুরনো দিনের মানুষ, কাজেকর্মে এলানো নয়, ঘড়ির কাঁটা ধরেই যেন চলেন হরিচন্দন। কিকিরাদের মিনিট দশেক দেরি হয়েছিল আসতে। কারণ চন্দন। সেও হাসপাতালের বাকি কাজ অন্য একজনকে দেখতে দিয়ে কিকিরাদের সঙ্গী হয়েছিল।
হরিচন্দনবাবু তৈরি। তাঁর গাড়ি নীচে দাঁড়িয়ে। ড্রাইভার পেছনের ডালা উঠিয়ে কী যেন দেখে নিচ্ছিল।
চন্দন নিচু গলায় তারাপদকে বলল, “অস্টিন অফ ইংল্যান্ড। ম্যাচ করে গিয়েছে বৃদ্ধের সঙ্গে। এসব জাঁদরেল গাড়ি কলকাতায় এখন রেয়ার দেখা যায়।”
তারাপদ গাড়ির কিছু বোঝে না; বলল, “কেন, রাস্তায় বিগড়ে যাবে নাকি?”
“মনে হয় না; দেখে মনে হচ্ছে যত্ন করে রাখা, ওয়েল মেনটেইন্ড।“
কিকিরা চন্দনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন হরিচন্দনের, তারপর সামান্য কুণ্ঠার সঙ্গে বললেন, “আমাদের একটু দেরি হয়ে গেল বোধ হয়।”
“ও কিছু নয়। আসুন।”
হরিচন্দনবাবু পেছনের সিটেই বসলেন। পাশে কিকিরা। জানলার অন্য ধারে তারাপদ। চন্দন সামনে বসল।
ড্রাইভারের নাম বনমালী। মাঝবয়েসি। হরিচন্দনবাবু বললেন, “বনমালী, এক কাজ করো, বাগবাজার ধরে টালা হয়ে দত্তবাগান। যশোর রোড় ধরে নেবে। “
গাড়িতে স্টার্ট দিল বনমালী।
কিছুক্ষণ কোনও কথা নেই। হরিচন্দনের পাশে কিকিরা, কিকিরার পাশে তারাপদ। কথাবার্তা বলার জন্যেই বোধ হয় কিকিরাকে পাশে বসিয়েছিলেন হরিচন্দনবাবু।
খানিকটা এগিয়ে এসে হরিচন্দন বললেন, “রায়মশাই আপনাকে আগেই একটা কথা বলে নিই।”
কিকিরা আলগাভাবে হেসে বললেন, “আবার আপনি কেন, দাদা। তুমিই ঠিক হয়েছিল কাল।”
“ও, হ্যাঁ। একেবারে নতুন তো! মনে থাকে না। …যাক গে, আমি যা বলছিলাম। তোমাকে আমি নিয়ে যাচ্ছি যেখানে, সেখানের লোকজন যারা আছে–তারা হয়তো জানতে চাইবে, তুমি কে? মুখে না বললেও মনে মনে ভাববে নিশ্চয়, এই লোকটা আবার কে?”
“তা ভাবতেই পারে।”
“আমি কিন্তু বলব, তুমিই এখন থেকে মৃণালকুঞ্জর নতুন ম্যানেজার কাম-কেয়ারটেকার। কী, আপত্তি নেই তো?”
