হরিচন্দন হালকাভাবে হাসলেন। “ঠিক আছে। আমি পানুর সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি, আপনাকে দিয়ে হতে পারে। ডিটেকটিভের দরকার আমারও ছিল না। দরকার ছিল এমন লোক যে আমার মৃণালকুঞ্জে নজর রাখতে পারবে। কাজটা আপনি নিয়ে নিন।”
কিকিরা বললেন, “কাজটা কী?”
“বলছি।” বলে হরিচন্দন তারাপদর দিকে তাকালেন, “এই ছেলেটি?”
“তারাপদ। আমার চেলা। আরও একজন আছে, চন্দন। তাকে পরে একদিন দেখবেন। আমরা তিনজনে মিলে কাজ করি। কেন, পানুবাবু আপনাকে বলেননি?”
মাথা হেলালেন হরিচন্দন। “বলেছিল। নামটাম বলেনি; বলেছিল–আপনার শাগরেদ আছে।” বলতে বলতে বার কয়েক শুকনো কাশি তোলার মতন শব্দ করলেন গলায়। বোধ হয় গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। এই সময়টা বড় খারাপ। গরম পড়ছে, অথচ সকাল সন্ধেতে সামান্য ঠাণ্ডা ভাব এসে যায়। তা ছাড়া ধুলো উড়ছে ক’দিনই। বাতাসে বুঝি আবিরের গুঁড়ো ওড়ে এখনও। দোল গিয়েছে কাল। আজও তার জের রয়েছে কোথাও কোথাও।
কিকিরা বললেন, “আপনার কাজটা যে কী, আমি ঠিক জানি না। ভাসা ভাসা শুনেছি পানুবাবুর মুখে। আপনি ‘মৃণালকুঞ্জ’-র কথা বললেন, সেটা কী?”
“বাড়ির নাম। কদমপুরে যে বাড়িটা আছে আমার, তার নাম। আমার মায়ের নাম ছিল মৃণালিনী। মায়ের নামে বাড়ি।”
“বাড়ি আপনি করেছিলেন?”
“না,” মাথা নাড়লেন হরিচন্দন। “বাবা করেছিলেন। একতলা একটা ছোট বাড়ি। আমাদের কিছু জমিজায়গা বাগান ছিল ওখানে। সেগুলোর বেশিরভাগটাই বাবা বেচে দেন। সামান্য রেখেছিলেন। আমার মায়ের এক অসুখ করল। অদ্ভুত অসুখ। বছরের অর্ধেক দিন গায়ে জ্বর, সঙ্গে কাশি আর শ্বাসকষ্ট। কলকাতা শহরের কত বড় বড় ডাক্তার দেখল, কেউ ধরতে পারল না। কেউ বলে যক্ষ্মা, কেউ বলে হাঁপানি, আবার কারও ধারণা, হার্টের গোলমাল। ডাক্তাররা বললে, মাকে নিয়ে গিয়ে ফাঁকায় আলো-বাতাসে রাখলে মা খানিকটা ভাল থাকবে। তখন বাবা ওই বাড়িটা করেন। বর্ষা আর শীত বাদে বেশিরভাগ সময় মা ওখানে থাকত। শেষে একদিন মা চলে গেল।” হরিচন্দন থামলেন, নিশ্বাস ফেললেন বড় করে।
কিকিরার দুঃখই হল। ভালও লাগল হরিচন্দনকে। কোনওরকম লুকোচুরি নেই। যা ঘটে গিয়েছে–সাদাসিধেভাবে বলছেন।
.
“বাড়িটা একতলা?” তারাপদ বলল হঠাৎ। এতক্ষণ সে একটাও কথা বলেনি। মুখ বুজে বসে ছিল। দেখছিল হরিচন্দনবাবুকে।
হরিচন্দন বললেন, “একতলাই ছিল প্রথমে। পরে, বারো চোদ্দো বছর পরে– বাবাও তখন নেই, আমি ওটাকে দোতলা করি। অবশ্য দোতলার মাথায় টাইলস বসিয়েছিলাম।”
“দোতলা করতে গেলেন কেন?”
“এমনি; শখ করে। ভাবলাম একটা গ্রামের বাড়ি থাকুক না, মাঝে মাঝে এসে থাকা যাবে। কলকাতায় আমরা যেখানে থাকি– তার অবস্থাটা দেখছ তো?” তারাপদকেও বললেন কথাগুলো। একটু থামলেন। আবার বললেন, সামান্য হেসে, “তখন আমার নিজের ফার্মও ভাল চলছে। হাতে টাকা। পৈতৃক বিষয় তো আছেই। শখ করেই করেছিলাম। কখনও ফ্যামিলি নিয়ে আট-দশদিন কাটিয়ে আসতাম। শনি-রবিবার একবার করে তদারকিও করে আসতে হত। বাগানের টাটকা শাকসবজিও নিয়ে আসতাম।”
“শেষমেশ আর যেতেন না?” কিকিরা বললেন।
“ঠিকই ধরেছেন,” হরিচন্দন বললেন, “বয়েস বাড়ল। কোমরের দিকে কী হল যে– শয্যাশায়ী হয়ে থাকলাম মাস তিনেক। নিজের ব্যবসা মানে ফার্মটা অন্যকে গছিয়ে দিলাম। আর ভাল লাগত না। ছেলেটাও বোম্বাই চলে গেল।… তা মৃণালকুঞ্জ পড়েই থাকল ফাঁকা। … তারপর একদিন আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথায় কথায় বাড়িটার একটা গতি করার ব্যবস্থা করলাম। বিক্রি করব না। টাকায় আমার দরকার নেই। ভাল যদি কিছু করা যায়…”
“স্বাস্থ্য নিবাস?”
“আরে না, স্বাস্থ্য নিবাস নয়। আমার এক বন্ধু রামকমলের অবস্থা দেখে মনে হল, বুড়ো বয়েসে যার দেখার কেউ থাকে না তার বড় কষ্ট। দেখার লোক যদিবা থাকে, কেউ আর তেমন করে দেখে না। নিজের ছেলে ভাইপোও অবহেলা করে, মনে মনে ভাবে, বুড়োটা আপদ। … এই রকম পাঁচ কথা ভাবতে ভাবতে বাড়িটাকে আমি কী বলব-বৃদ্ধ নিবাস বানিয়ে ফেললাম।”
“এটা কবে করলেন?”
“বছর পাঁচেক আগে।” বলে হরিচন্দন টেবিলের দিকে হাত বাড়ালেন। গোল কৌটোটা টেনে নিলেন। কাঁচের মতন স্বচ্ছ প্লাস্টিকের জার। তার মধ্যে কয়েকটা মাত্র চুরুট। ঢাকনা খুলে একটা চুরুট উঠিয়ে নিলেন। বললেন, “দিনে দুটো। একটা ও-বেলায়, একটা এ-বেলায়।” বলে হাসলেন একটু। “যা বলছিলাম। আমার মৃণালকুঞ্জে সেইসব আধ-বুড়ো, বুড়োদের থাকতে দেওয়া হয় যাদের কোনও বড় আধিব্যাধি নেই। কারণ বড় অসুখবিসুখ করলে দেখবে কে? কেই বা সেবা করবে?”
তারাপদ বলল, “কাছে কোনও ডাক্তার নেই?”
“না। মাইলটাক দূরে এক হাতুড়ে আছে; আর কলোনিতে এক হোমিও বদ্যি। আমাদের রজনীবাবুও শুনেছি দু’-চার শিশি নাক্স, পালসেটিলা, অ্যাকোনাইট রাখে। গৃহ চিকিৎসা। বেয়াড়া রোগী পুষে ঝামেলা বাড়াতে চাইনি আমি।”
“কিন্তু মানুষের শরীর যখন, অসুখ তো করতেই পারে।”
“হ্যাঁ, সাধারণ জ্বরজ্বালা, পেটের গোলমাল কার না হয়! হলে সেই রজনীবাবু, না হয় হাতুড়ে। বড় জোর হোমিওপ্যাথ ডাক্তারকে ধরতে হয়। বাড়াবাড়ি দেখলে হেলথ সেন্টার। তিন মাইল…।”
সাধন চা নিয়ে এল। বাহারি ট্রে। মনে হল, বেতের তৈরি। চা আর মিষ্টি, একটা প্লেটে নোন বিস্কিট।
