কিকিরার পাশাপাশি পা বাড়িয়ে ভেতরে এল তারাপদ। সামনে মাঠ। একসময় বাগান ছিল, এখন বারো আনাই নেড়া। বাকি চার আনায় দু-চারটে সাধারণ গাছ আর আগাছার ঝোঁপ। ওরই মধ্যে চোখে পড়ে একটা কাঠচাঁপার গাছ, শিউলি ঝোঁপ, মামুলি কয়েকটা রঙ্গন গাছ।
সামনের বাড়িটা দোতলা। একেবারে পুরনো ছাঁদের। মোটা মোটা থাম, চওড়া বারান্দা, দোতলার বারান্দায় লোহার নকশাকরা রেলিং। নীচের তলার একপাশে এক ছোট কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্ক, অন্যপাশে কোনও ওষুধ কোম্পানির গুদাম।
তারাপদ বলল, হালকা ভাবেই, “সার, এ যে একেবারে চিচিংফাঁক হয়ে গেল। কী দেখছি বুঝতে পারছি না, চোখে ঠিক দেখছি তো!”
কিকিরা বললেন, “কলকাতার পুরনো পাড়ায় এমন বাড়ি অনেক আছে এখনও।”
“এটা কোন পাড়া যেন?”
“পাথুরেঘাটা।”
নীচে লোকজন চোখে পড়ল না তেমন। ওষুধ কোম্পানির দরোয়ান, জনা দুয়েক কম বয়েসি ছোকরা, ছোট ডেলিভারি ভ্যান, বোধ হয় খারাপ হয়ে গিয়েছে, কথাবার্তা বলছিল তিনজনে।
কিকিরা দোতলার সিঁড়ি খুঁজে নিলেন। “এসো।”
সিঁড়ির ধাপগুলো মাঝারি উঁচু, কিন্তু চওড়া যথেষ্ট, আর লম্বাও।
তারাপদ বলল, “কতকালের বাড়ি হবে, কিকিরা? শ’খানেক বছরের পুরনো তো হবেই।”
“শ’ তো সেদিনের কথা, আরও পুরনো।”
সিঁড়ির একটা বাঁক শেষ হল, পরের বাঁক ডান-হাতি। কিকিরা ইশারা করলেন। বাঁকের মুখে দেওয়ালে একটা হরিণের শিং আটকানো। মাথা নেই হরিণের, শুধু একটা কালো কাঠের ওপর আশ্চর্য কায়দায় শিং দুটো লাগানো। জায়গাটায় আলো নেই, ছায়া। তবু আন্দাজে মনে হয়, ধুলো আর ময়লা জড়িয়ে আছে শিংয়ের চারপাশে। কাঠে।
দোতলায় এসে দাঁড়ালেন কিকিরারা।
চওড়া বারান্দা। লম্বাও কম নয়। এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক পায়চারি করছিলেন বারান্দায়। দেখতে পেয়ে গেলেন কিকিরাদের।
কিকিরা হাত তুলে নমস্কার করলেন। “পানুবাবু আমায় পাঠিয়েছেন। আপনি হরিচন্দনবাবু!”
মাথা নেড়ে উনি বললেন, “হ্যাঁ। আমি হরিচন্দন। … আসুন, আপনারই অপেক্ষা করছিলাম।“ কথা বলতে বলতে তারাপদর দিকে তাকালেন একবার।
কিকিরা জামার পকেট থেকে পানুবাবুর চিঠিটা বার করে এগিয়ে দিলেন।
চিঠি নিতে নিতে হরিচন্দন বললেন, “পানু আজ সকালেও ফোন করেছিল। নামটা আপনার কী যেন, কিঙ্কর ..”।
“কিঙ্করকিশোর রায়। ছোট করে কিকিরা।”
চিঠি দেখতে দেখতে হরিচন্দন বললেন, “পানুর সঙ্গে আমার আগেও কথা হয়েছে। শুনেছি সবই। … আসুন, বসুন।”
বারান্দার মাঝমধ্যিখানে একটা ভারী সেকেলে আর্মচেয়ার। বেতের বুনুনি আগাগোড়া, তার ওপর হালকা গদি। চেয়ারের পাশে গোলমতন শ্বেতপাথরের টেবিল। বড় নয় তেমন। টেবিলের ওপর চায়ের কাপ, পট, চশমার খাপ, একটা গোলমতন প্লাস্টিকের জার। তার মধ্যে দু’-তিনটে চুরুট। লাইটারও পড়ে আছে পাশে।
হরিচন্দনবাবু আবার বসতে বললেন। কাছেই বারান্দার গায়ে গায়ে সাজিয়ে রাখা গোটা তিনেক কাঠের চেয়ার। হাতলঅলা। একই রকম দেখতে চেয়ার তিনটে। মজবুত, ভারী চেয়ার।
নিজের চেয়ারে বসলেন হরিচন্দনবাবু। হাত তুলে ইশারায় বললেন, “এগিয়ে নিন চেয়ারগুলো। আমি আবার কানে খানিকটা কালা। দূরে বসলে কথাবার্তা শুনতে পাব না ঠিকমতন।”
তারাপদ চেয়ার টেনে এনে কাছাকাছি রাখল।
কিকিরা হরিচন্দনবাবুকে দেখছিলেন। বয়েস হয়েছে ভদ্রলোকের। পঁয়ষট্টির কম বলে মনে হয় না। মাথায় লম্বা, গড়ন দোহারা। অভিজাত মুখশ্রী। শক্ত থুতনি, লম্বা নাক। মাথার পাতলা চুল সবই পেকে গিয়েছে। ওঁর পরনে ধুতি, গায়ে ফতুয়া পাঞ্জাবি, আদ্দির। পায়ে রবারের চটি। সাদা।
হরিচন্দনবাবু ডাকলেন কাউকে।
কিকিরা আর তারাপদ এতক্ষণে বসে পড়েছেন।
ভেতরের ঘর থেকে একজন বেরিয়ে এল। এ বাড়ির কাজের লোক। মাঝবয়েসি।
হরিচন্দনবাবু বললেন, “কে রে, সাধন! চা-টা দে এখানে। একটু পরে বাতি জ্বেলে দিয়ে যাবি।”
দিনের আলো মরে আসছে। বারান্দায় ছায়া নেমে কালচে ঝাপসা হয়ে এল। এটা বোধ হয় দক্ষিণ-পশ্চিম দিক।
হরিচন্দন বললেন, “রায়মশাই, পানুর মুখে আমি আপনার কথা শুনেছি। পানুকে আমি খুব বিশ্বাস করি। ওর বড়দা আমার বন্ধু ছিল। নামকরা ডাক্তার ছিল সে। রোগী দেখার সময় হাসিঠাট্টা করত, বুঝতে দিত না সে একজন রাশভারী ডাক্তার। তা সে নিজেই একদিন চলে গেল হঠাৎ।”
“আমি জানি পানুবাবুর দাদা বড় ডাক্তার ছিলেন।” কিকিরা বললেন।
“জানেন তবে! … যাক, কাজের কথা তোক। পানুর মুখে আমি শুনেছি। ঠিকই তবে সেটা পরের মুখে ঝাল খাওয়া। আপনার মুখ থেকে শোনাই ভাল। কী করেন আপনি?”
“এমনিতে কিছু করি না। বেকার!” কিকিরা হাসলেন মুচকি।
“পানু বলেছিল, আপনি প্রাইভেটলি ইনভেস্টিগেশান করেন। ডিটেকটিভ!”
“আজ্ঞে না। আমি ডিটেকটিভ নই। কোনও কালেই ছিলাম না। আসলে আমি ম্যাজিশিয়ান ছিলাম এককালে। খেলা দেখাতাম। কপাল দোষে আমার সেই পেশাটি চলে গেল। এখন ..”
“আপনি ম্যাজিশিয়ান! পানু একবার বলেছিল বটে। তা সেই খেলা দেখানো ছেড়ে নতুন করে এখন–”
“আজ্ঞে, আমি একটু শখ করে চোর ছ্যাঁচড় পাজি নচ্ছার ধরার চেষ্টা করি। পানুদার হল ওকালতি, ক্রিমিন্যাল কেস, আমাকে ক্রিমিন্যাল ক্যাচার বলতে পারেন।” কিকিরা হাসি হাসি মুখে বললেন, “আমাদের দেশে ঘটি বাটি চালা, চালপোড়া খাওয়ানো, এসব কতরকমই হয়। আমাকেও তার মধ্যে ফেলতে পারেন। হাতুড়ে বিদ্যে, মাঝে মাঝে লেগে যায়, আবার”
