“আচ্ছা! … তা পানুবাবু কি আপনার এখনকার খোঁজখবর রাখেন?” তারাপদ বলল।
“রাখেন খানিকটা। দু-চার মাস অন্তর পুরনো ক্লাবেও যাই গল্পগুজব করতে।”
“তারপর?”
“ঝামেলার ব্যাপারটা বললেন উনি।”
“কী?”
“হরিচন্দনবাবুর একটা বাড়ি আছে কদমপুরে। কলকাতার কাছেই। বাড়িটা শখ করে করা। কান্ট্রি হাউস। ছোট বাড়ি, দেদার গাছপালা, মায় একটা কুকুর। একসময় শখ করে করলেও এখন আর যাওয়া-আসা নেই। বাড়িটাকে তিনি একরকম ওল্ড হোম করে ফেলেছিলেন। মানে, খানিকটা বয়স্ক লোকের–যাদের বড়সড় কোনও রোগব্যাধি নেই, অথচ সংসারে ঠিকমতন যত্ন পায় না, অবহেলা করে ছেলে, ভাইপো-তেমন কয়েকজনকে সেখানে তিনি ঠাঁই দিয়েছিলেন।”
তারাপদ অবাক হয়ে শুনছিল। বলল, “ক’জন মানে?”
“ছ’জন ছিল।”
“বেশ। তা …”
“তার মধ্যে দুজন আর নেই। একজন আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছে, আর-একজন গত মাসে অদ্ভুতভাবে আত্মহত্যা করেছে।”
তারাপদ কৌতূহল বোধ করল। বলল, “আগুনে পোড়া আর আত্মহত্যা করায় অবাক হওয়ার কী আছে! এমন তো হয়ই। হরিচন্দনবাবু এই দুটো ব্যাপারকে অস্বাভাবিক মনে করছেন নাকি?”
“হ্যাঁ,” কিকিরা মাথা হেলিয়ে বললেন, “তিন-চার মাসের মধ্যে পর পর ঘটনা দুটো ঘটায় তিনি অস্থির হয়ে পড়েছেন; বিমূঢ় বলতে যা বোঝায়–তারও বেশি, ভীষণ উদ্বিগ্ন। ভয় পেয়ে গিয়েছেন।”
“কেন?”
“সেটাই তো কথা হে? কেন?”
“রহস্য আছে নাকি?”
“আছে বলেই তিনি মনে করেন।”
তারাপদ সামান্য সময় চুপ করে থাকল। উঠে গিয়ে বাতিটা জ্বেলে দিল ঘরের। ফিরে এসে বসল আবার। তারপর বলল, “চাকরির ব্যাপারটা ঠিক হল কেমন করে? তখন তখনই?”
“না। পানুবাবু বিকেলে হরিচন্দনবাবুর বাড়ি গিয়ে কথা বললেন। পরের দিন সকালে তাঁর লোক এল আমার কাছে চিঠি নিয়ে। পানুবাবু লিখেছেন, ব্রাদার কিঙ্কর–আমার সঙ্গে হরিচন্দনদার কথাবার্তা হয়ে গিয়েছে। অলমোস্ট ফাইন্যাল। তুমি পরশু দিন–দোলের পরের দিন বিকেলে তাঁর বাড়ি গিয়ে নিজে দেখা করবে। কথা বলবে। আমি আলাদা একটা চিঠি তোমায় লিখে দিলাম। হরিচন্দনদাকে দেখাবে। ভাই, আমাকে উদ্ধার করো। অন্তত একবার চেষ্টা করে দেখলে তোমার তো কোনও ক্ষতি হবে না। কাজটা হাতে নিলে তোমার কিছু প্রাপ্য হবে। কথা বলে রেখেছি।”
তারাপদ জিভে একটা শব্দ করল। বলল, “কাজটা আপনি হাতে নিচ্ছেন তা হলে?”
“ইচ্ছে আছে। এখন পরশু দিন হরিচন্দনবাবুর সঙ্গে দেখা করি। কী বলেন তিনি শুনি। তারপর …! তা তুমিও আমার সঙ্গে যাচ্ছ?”
“আমি?”
“তিনে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ!” কিকিরা রগড় করে বললেন। “পানুবাবুকে আমার বলা আছে হে, আমরা হলাম তিন টেক্কা, এক টেক্কা হাতে নিয়ে খেলায় নামি না।”
এমন সময় চন্দনের গলা পাওয়া গেল। এসে পড়েছে সে। বগলাকে কী বলল, তারপর ঘরে এসে হাসিমুখে কিকিরার দিকে এগিয়ে গেল। “আপনার জন্মদিনে আমার প্রণাম ও শুভেচ্ছা, সার। দিন একটু পদধূলি দিন।”
“তোমরা আমার জন্মদিনটাকে একেবারে গুবলে দিলে!” কিকিরা বললেন মজা করে।
“গুবলে দিলে! মানে?”
“গুবলেট! যাক গে, তুমি নাকি কী সব খানা নিয়ে আসছ!”
“বেশি কিছু আনিনি। যা গরম পড়ে যাচ্ছে! এই একটু নান, চিকেন পাকৌড়া, স্যালাড আর সামান্য মিষ্টি।”
“বাঃ, খাসা! … তা তোমরা আজ আসবে জানলে আমি দু-একটা কুকিং করতে পারতাম। পরে হবে।”
চন্দন সরে গিয়ে তারাপদর কাছাকাছি বসবার আগেই তারাপদ বলল, “চাঁদু, কিকিরা একটা চাকরি নিয়েছেন।”
“কী?”
“চাকরি।“
“কীসের চাকরি?” চন্দন বুঝতে পারল না।
“ম্যানেজার-কাম-কেয়ারটেকার …! বলুন না সার আপনার চাকরির ব্যাপারটা। “
“তুমিই বলো।”
বগলা চা নিয়ে এসেছিল। তারাপদদের হাতে হাতে চায়ের কাপ এগিয়ে দিল। কিকিরা এখন লিকার খাবেন। দুধ চিনি দুই-ই বাদ। ক’দিন সন্ধের চায়ে দুটোই বাদ দিয়েছেন, খেয়াল। দুধে নাকি অ্যাসিড হচ্ছে!
চা খেতে খেতে তারাপদ কিকিরার চাকরি নেওয়ার বৃত্তান্ত শোনাল চন্দনকে।
মন দিয়ে শুনছিল চন্দন। মাঝে মাঝে জিগ্যেস করছিল দু-একটা কথা।
তারাপদর কথা শেষ হলে চন্দন কিকিরাকে দেখল সামান্য সময়। পরে বলল, “আপনি দুটো দিন চুপ করে বসে থাকতে পারেন না? দিন দিন কী হয়ে যাচ্ছেন! ছেলেমানুষ।”
“চুপ করেই তো বসে থাকি! বসে থাকতে থাকতে কী দশা হয়েছে জানো? পেটে টান পড়েছে।”
“আপনার কতটুকু পেট!”
“তাই বা ভরে কেমন করে!”
“বুঝতে পারছি। তা হলে হরিচন্দনবাবুর কাজটা আপনি নিচ্ছেন?”
“দেখি, কথাবার্তা বলি। ধরে নাও, যদি কথায় বনে, কাজটা নেব।” চন্দন আর কিছু বলল না।
.
০২.
বাই লেন না লেন–ধোঁকা লেগে যায় গলির মুখে এসে দাঁড়ালে। একটা ট্যাক্সি গলতে পারে মাত্র এইটুকু চওড়া। পঁচিশ ত্রিশ গজ এগিয়ে গেলেই যেন হঠাৎ সব পালটে যায়। গলি খানিকটা চওড়া হয়ে গিয়েছে ঠিকই তবে তার চেয়েও বেশি চমক লাগে পাঁচিলঘেরা বাড়িটাকে দেখলে। এই গলিতে এমন বাড়ি যেন সম্ভব নয়। তারাপদ অবাক হয়ে গিয়েছিল।
উঁচু পাচিল, প্রায় পাঁচ ফুট লম্বা। অবশ্য রংচং আর নেই, ছাই ছাই কালচে দেখায়; কোথাও বা শ্যাওলা ধরার দাগ, চুন সুরকির বদলে ইট বেরিয়ে রয়েছে। মাঝে মাঝে ফাটল, গাছের চারা গজিয়েছে ফাটলের মুখে।
লোহার ফটক ছিল ডানদিকে। ফটকটা আধ-খোলা। ফটকের গায়ে আধমরা লতানো গাছ।
