তারাপদ প্রথমটায় বোঝেনি। পরে বুঝল, বুঝেই জোরে হেসে উঠল।
কিকিরাও হাসলেন। তারপর ফুলের তোড়াটা এগিয়ে দিয়ে চোখের ইশারায় ঘরের একপাশে রেখে দিতে বললেন।
তারাপদ ফুলের তোড়া নিয়ে রেখে দিল।
“চাঁদুর খবর কী?” কিকিরা বললেন।
“আসছে। ও আপনার জন্যে একটু মুখরোচক কিনে চলে আসবে।”
“বাঃ! ব্যবস্থাটি ভাল।”
তারাপদ বসল। বসেই চেঁচিয়ে জল চাইল বগলার কাছে। কলকাতায় গরম পড়ে আসছে। ফাল্গুন মাসের একেবারে শেষ। বেলা বেড়ে গিয়েছে অনেকটা। সকালের সূর্যই কেমন ঝাঁঝিয়ে উঠছে। বাতাস শুকনো। মাঝে মাঝে হলকা ওঠে দুপুরে, যেন কাছাকাছি কোথাও আগুন ধরে গিয়ে তার তাত আসছে বাতাসে।
“তোমাদের বাঁকড়ো বিষ্টুপুর কেমন হল?” কিকিরা বললেন।
“ভালই। হইচই হল খুব।”
তারাপদরা দু-তিনদিন কলকাতায় ছিল না। চন্দনের এক ডাক্তার বন্ধুর বোনের বিয়ে ছিল বাঁকুড়ায়। বন্ধু চন্দনের–সেই সূত্রে তারাপদরও। সেই বন্ধুই ধরে নিয়ে গিয়েছিল ওদের। গতকালই ফিরেছে তারাপদরা।
আজ সোমবার। আগামীকাল দোল। অফিস ছুটি। আজ অফিস ফেরতই এসেছে তারাপদ। চন্দনও আসবে। একটু দেরি হতে পারে।
ফাল্গুনের শেষ বেলার আলো এবার মরে আসছে। একটু পরেই ঝাপসা অন্ধকার হয়ে আসবে। ঘরে এখনও বাতি জ্বালানো হয়নি।
বগলা জল নিয়ে এল।
জল নিল তারাপদ। গলা যেন কাঠ হয়ে ছিল তারাপদর, এক চুমুকেই জলের গ্লাস শেষ।
বগলা চলে গেল।
“আপনার খবর কী?” তারাপদ বলল।
কিকিরা কাগজ পেন্সিল সরিয়ে রেখে বললেন, “একটা চাকরি নিচ্ছি।”
“চা-করি! আপনি?” তারাপদ যেন আকাশ থেকে পড়ল–ভাবটা এই রকমই।
কিকিরা সহজভাবেই বললেন, “সেদিন ব্যাঙ্কে গিয়েছিলাম। শুনলাম আমার ব্যালেন্স তলানিতে। মানে, এর পর অনাহার। নো ফুড। তা মনটা বিগড়ে গেল। ব্যাঙ্ক থেকে ফিরে আসছি, হঠাৎ পানুবাবুর সঙ্গে দেখা। পানু মল্লিক। ক্রিমিন্যাল কেসের ওকালতি করেন। আমায় দেখে খপ করে ধরে ফেললেন। সঙ্গে সঙ্গে চাকরি। ম্যানেজার-কাম-কেয়ারটেকার। থাকা খাওয়া ফ্রি।”
তারাপদ তখনও বিশ্বাস করতে পারছিল না। কিকিরা তামাশা করছেন নিশ্চয়। চাকরি করার মানুষ তিনি নন। তা ছাড়া, উনি ধনী না হন, গচ্ছিত যথেষ্ট না থাকুক, একেবারে খাওয়া-পরার ব্যবস্থা থাকবে না–এমন হতেই পারে না। অপব্যয়ী, বিলাসী–কোনওটাই নন কিকিরা। যা আছে তাতে দুটি মানুষের (তিনি ও বগলা) দিব্যি চলে যায়। আর মাঝেমধ্যে আয়ও হয় বইকী! উঠতি ম্যাজিশিয়ানদের খেলার নকশা করে দেন, সাজসরঞ্জাম কারিগরের ব্যবস্থা করেন-তাতে কিছু হাতে আসে। দু-চার হাজার টাকা ওঁর ক্লায়েন্টরাও দেয়। অবশ্য এখানে তিনি জোর-জবরদস্তি করেন না। যে যা দেয়–জোর করেই কিকিরার পকেটে গুঁজে দেয়।
তারাপদ বিশ্বাস করল না চাকরির কথা। হালকা ভাবেই বলল, “কোন কোম্পানির চাকরি, সার?”
“কোম্পানি নয়; এক ভদ্রলোকের …”
“ভদ্রলোকের! প্রাইভেট পার্টি! কে সে?”
“হরিচন্দনবাবু। হরিচন্দন মুখোপাধ্যায়।”
“কী নাম বললেন? হরি”
“হরিচন্দন।”
“এমন নাম জীবনে শুনিনি। হরিহর, হরিমাধব, হরিধন … এসব অনেক শুনেছি। এ একেবারে হরিচন্দন–! দারুণ।”
“নামে শুধু নয় হে, অন্যদিক থেকেও দারুণ। ফ্যামিলি হেরিটেজ প্রায় সেই ফোর্ট উইলিয়ামের আমল থেকে। বিস্তর ধনী ছিলেন পূর্বপুরুষ। গাছের ডাল ভাঙতে ভাঙতে এখন তিনি যে-ডালের ডগায় বসে আছেন, সেই ডালে একজন বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার, একজন কাউন্সিলার, একজন রায়বাহাদুর ছিলেন। আপাতত সেই বংশে হরিচন্দন নিজে, তাঁর ছেলে ধরণী, আর হরিবাবুর স্ত্রী। ছেলে কলকাতায় থাকে না। বম্বেতে রয়েছে। ব্যবসা করে। পুতুল আর খেলনার ব্যবসা। এক্সপোর্ট বিজনেসই বেশি।”
তারাপদ যেন সব গুলিয়ে ফেলছিল। বলল, “দাঁড়ান, একটু বুঝে নিই। … আগে বলুন, পানুবাবুটি কে? তাঁর সঙ্গে আপনার দেখা হল হঠাৎ আর আকাশ থেকে চাকরি খসে পড়ল! আরব্য রজনী নাকি?”
কিকিরা মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন। পকেট হাতড়ে তাঁর সেই পাতলা চুরুট বার করলেন একটা। ধরালেন ধীরে সুস্থে। তারপর বললেন, “পানুবাবু আমার ওল্ড ফ্রেন্ড। বউবাজার পাড়ায় থাকার সময় আমাদের একটা ক্লাব ছিল। তাস, দাবা খেলা হত, আর বছরে একবার করে থিয়েটার লাগানো হত–”চন্দ্রগুপ্ত’, ‘কণার্জুন, ষোড়শী’–এইসব। পানুদা ভাল অ্যাক্টার ছিলেন না। তবে গলায় জোর ছিল। হাজার হোক ক্রিমিন্যাল প্র্যাকটিস করেন তো?”
“আপনার এমন মাই ডিয়ার বন্ধু কত জন, সার?”
“অনেক। বন্ধুর ভ্যারাইটিও কম নয়। কলকাতার সেরা পকেটমার লালুচাঁদও আমার বন্ধু ছিল।”
“বাঃ! তা পানুবাবু আপনাকে চাকরি দিলেন?”
“দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন,” কিকিরা চুরুটের মুখের দিকে ছাই সরিয়ে আগুন, ঠিক করে নিতে নিতে বললেন।
“একটু ঝেড়ে কাশুন তো! বড্ড মিস্ত্রি হয়ে যাচ্ছে।”
“সবটা শুনতে চাও! তা হলে তো অনেক বলতে হবে। আসল কথাটাই বলি : পানুবাবু একটা কাজে শিয়ালদা কোর্টে এসেছিলেন। কাজ শেষ করে নিজের গাড়িতে ফিরছিলেন, যাবেন সেই পুলিশ কোর্ট। রাস্তায় আমায় দেখতে পেয়ে গাড়ি থামিয়ে চেঁচাতে লাগলেন। কাছে যেতেই হাত ধরে টেনে তুললেন তাঁর গাড়িতে। দুপুরবেলায় অত্যাচার। ছাড়াতে পারি না। আমায় প্রায় বগলদাবা করে নিয়ে গিয়ে তাঁর চৌখুপিতে আটকে রেখে ডাবের জল, চা, পান, সিগারেট দিয়ে আপ্যায়ন। নিজের টুকটাক কাজ সেরে শেষে কাজের কথা পাড়লেন। বললেন, ব্রাদার কিঙ্কর, তুমি একেবারে ঠিক সময়ে দেখা দিয়েছ। ভগবানের মনে ছিল, ভাই; পেয়ে গিয়েছি। তোমায় একটা কাজ করতে হবে। আমার খুব চেনাজানা এক ভদ্রলোক হরিচন্দনদা বেজায় ঝামেলায় পড়েছেন। তুমি একটিবার হাত লাগাও।”
