গণপতি নির্বিকারভাবে বললেন, “আরও একটা পকেট টর্চ ছিল ওর কাছে, আসল টর্চ, সেটা কোথায় আমি জানি না। পেয়েছেন নাকি?”
শর্মা মাথা নাড়লেন। না, পাননি।
“পুকুরের জলে পড়ে আছে হয়তো।” গণপতি বললেন।
শর্মা এবার রুপোর তাবিজ আর ছেঁড়া চেনটা দেখালেন। “এটা কার? চিনতে পারেন?”
গণপতি দেখলেন তাবিজ-লকেট আর চেনটা, হাত বাড়িয়ে নিলেন না। শুধু তাকিয়ে থাকলেন।
“কার এটা?” শর্মা আবার জিজ্ঞেস করলেন।
গণপতি কিছু বলার আগে কিকিরা বললেন, “গণপতিবাবুর দৈব বিশ্বাস খুব। অত আংটি আঙুলে। দামি দামি পাথর। তাই না, মশাই!… ওই তাবিজ-তক্তিও আপনার!”
জবাবটা দিতে সময় নিলেন গণপতি। বললেন, “হ্যাঁ। দৈবে বিশ্বাস। তবে তাতে কী?”
“তাতে আর কিছু নয়, শুধু প্রমাণ হয়, আপনি সে-সময় সেখানে ছিলেন। বোধ হয় ধস্তাধস্তির সময় এগিয়েও গিয়েছিলেন। কিন্তু বয়েস হয়েছে। লড়ালড়ি কি আপনার পোষায়! লাভের মধ্যে ওটা ছিঁড়ে হাত থেকে পড়ে গিয়েছে।”
গণপতি চুপ।
“কী আছে ওতে?”
“ধরুন, প্রসাদী ফুলপাতা।”
“ঠাকুরদেবতার ফুলপাতা নিয়ে কিছু বলতে নেই গণপতিবাবু! তবে আপনি কি সত্যি কথা বলছেন?”
গণপতি এবার বিরক্ত হলেন। বললেন, “ভেঙে দেখুন। …আমি দৈব বিশ্বাস করি আর না করি তাতে আপনাদের কী! …হ্যাঁ, করি। দৈব মেনে নিয়েছি বলেই পর পর কত বড় ঘা সইতে পেরেছি জীবনে আপনারা তার কী জানেন! ..আমার ছেলে গিয়েছে। তাজা ছেলে! ওই শয়তান প্রেমলাল তাকে নেশায় ভিড়িয়েছিল। ছেলেটা নিজের সর্বনাশ করছিল। আমাদেরও। শেষে একদিন গলায় দড়ি দিয়ে মরল। রাগে, অভিমানে। মাথা বিগড়ে গিয়ে। প্রেমলাল মুখে আহা-উঁহু করল। মনে মনে ভাবল, নেশার চক্করে পড়লে এরকম কতই না যায়! আরও একটা গেল। …আমার স্ত্রী সন্তানশোক সহ্য করতে না পেরে পরের বছরেই মারা গেল।” গণপতি থামলেন, যেন পুরনো কথা মনে এসে গেল পর পর। সামান্য থেমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “চোরাই কারবার আমার ছিল না। টাকা আমার আছে। …তবু একদিন আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, ওই প্রেমলালকে আমি দেখে নেব । ওকে আর মানুষের চেহারায় বাঁচতে দেব না সংসারে। … আমার ভেতরের কথা ওকে বুঝতে দিইনি। ধীরে ধীরে ভাবসাব করেছি। কমসম চোরা কারবারও করেছি ওর সঙ্গে। …এবার ওকে এখানে টেনে এনেছিলাম আমি। ভুলিয়ে। নয়তো হাজার পঞ্চাশ ষাটের কারবার তো কলকাতাতেই হওয়ার কথা। এখানে কেন!” গণপতি থেমে গিয়ে এদিক ওদিক তাকালেন, “একটু জল খাওয়াতে পারেন! …যা বলছিলাম। বলছিলাম প্রেমলালকে ভুলিয়ে এখানে আনার একটাই কারণ, কলকাতায় ওর অনেক শাগরেদ। এখানে ও একা। ও একলা। আমরা দু’জন। আমি আর ভৈরব। ভৈরবকে দোষী করবেন না দারোগাবাবু! ও বোকা, ওর মাথা বলে কিছু নেই। আমার হুকুমই ওর কাছে সব।”
শর্মা জল আনতে বলেছিলেন হাঁক মেরে।
জল আসার আগেই কিকিরা বললেন, “আপনি প্রতিশোধ নিতে চেয়েছেন বলছিলেন, প্রেমলালকে একরকম শেষ করতেই চাইছিলেন। ও তো মারা গিয়েছে সেদিনই। তাহলে আজ ক’দিন রাত্রে কী খুঁজে বেড়াচ্ছেন ভৈরবকে ঝিলের কাছে পাঠিয়ে? নিজেই বলেছেন, সেই সোনার কাঠিওলা ব্যাটারিগুলো। তাই না?”।
গণপতি কেমন মুখ করে হাসবার চেষ্টা করলেন একটু। ধীরে ধীরে বললেন, “না, সোনা নয়। সোনা বললে আপনাদের মগজে ঢুকবে, তাই সোনা বলেছিলাম। বাজারি সোনা দিয়ে আর আমি কী করব! ওই সোনার কী দাম আমার কাছে!”
“তবে?”
গণপতি চোখের ইশারায় তাবিজটা দেখালেন। “ওটারই খোঁজ করছিলাম। ওর মধ্যে সত্যি সত্যি ফুলপাতা নেই। আছে আমার ছেলে আর স্ত্রীর চিতার ছাই। প্রেমলালের জন্যে ওদের আমি চিতায় উঠিয়েছি। মন থেকে সেটা তাড়াতে পারতাম না। এই ক’বছর ওটা হাতেই ছিল। আজ আর নেই। বড় ফাঁকা লাগছিল। তবে সবই শেষ হয়ে গিয়েছে কখন। হয়তো কলকাতায় ফিরে ওটাও গঙ্গার জলে ফেলে দিতাম একদিন।“
চামেলিবাবু অপলকে তাকিয়ে থাকলেন।
তারাপদ আর চন্দন একদৃষ্টে তাবিজের দিকে তাকিয়ে ছিল।
শর্মা যেন অস্বস্তি বোধ করে অন্যমনস্কভাবে কালো শালটার কোণা খুঁটছিলেন।
কিকিরা একটিও কথা বললেন না। ততক্ষণে জল এসে গেল। একজন সেপাই গ্লাসে করে জল এনে টেবিলে রাখল।
৩.৩ সোনালি সাপের ছোবল
বেশ সুর করে টেনে টেনে– ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’ বলতে বলতে তারাপদ ঘরে ঢুকল। সাহেবি কায়দায় ‘ইউ’-টাকে বলল, ‘য়্যু’। হাতে ফুলের তোড়া।
কিকিরা কাগজ পেন্সিল নিয়ে বসে বসে কীসের এক আঁকজোক করছিলেন। তাকালেন মুখ তুলে।
ফুলের তোড়া এগিয়ে দিয়ে তারাপদ বলল, “ধরুন সার, আপনাকে একটা প্রণাম করি।”
কিকিরা ফুলের তোড়া নিলেন। তারাপদ প্রণাম করল।
“আজ আমার বার্থ ডে তোমায় কে বলল?” কিকিরা বললেন।
তারাপদ হাসল। “আপনিই একদিন বলেছিলেন। দোলপূর্ণিমার আগের দিন। ঠিক কি না?”
কিকিরা বললেন, “সে-বছর তাই ছিল শুনেছি। তা বলে প্রতি বছর কি একই তারিখে দোলপূর্ণিমা হয় হে, তারাবাবু! দিন পালটে যায়।”
“আরে তাতে কী? আমাদের কাছে পাঁজি থাকে না, সার; অতশত বুঝি না। হিসেবটা ওই দোলপূর্ণিমা নিয়ে। ইজি হিসেব। অ্যাডভান্স হলে ক্ষতি নেই। আবার লেট হলেই বা কী! আসলে তো আপনাকে ‘উইশ’ করা।”
“বুঝেছি। আমার পিসিমার হিসেব।”
“সেটা আবার কী?”
“আমার পিসিমা হিসেব করত, যখন আমাদের বুধন গোয়ালা টাকায় চার সের দুধ দিত তখন পাঁচকড়ি জন্মেছে, আবার যখন টাকায় দু’ সের দুধ হল–তখন এল সাতকড়ি।”
