“এসব হালে হয়েছে। চোখে ধূলো দেওয়ার জন্যে!… কাঠবাদাম জানেন তো, চিনেবাদাম নয়, সেই কাঠবাদামের মধ্যে করে চুনি আসে, হিরের কুচি আসে শুনেছেন? তবে বাদামগুলো কাঠবাদাম নয়, দেখতে অবিকল ওইরকম। নকল বাদাম। ধরা যায় না।”
শর্মা ড্রয়ার খুলে আবার বন্ধ করে দিলেন। ছোট্ট একটা জায়গার সাধারণ দারোগা। এত কথা কেমন করে জানবেন। “স্টিক বা কাঠি, নিডল আসে কীভাবে!”
“যেভাবে আসে, না দেখলে আপনারা বুঝতে পারবেন না।” গণপতি বললেন, “অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। তবে বেশিরভাগ সময়ে আসে বড় টর্চের ব্যাটারির সেলের মধ্যে। পিনগুলো লম্বায় ইঞ্চি দুই। বাণ্ডিল করা থাকে সেলের মধ্যে, ওপরের দিকটা অবিকল ওই সেলের মতন প্যাকিং। লেবেলিং। চট করে দেখলে ধরার উপায় নেই, ব্যাটারির সেল বলেই মনে হবে।”
কিকিরা বুঝতে পেরে গেলেন। একবার তাকালেন শর্মার দিকে। তারপর চোখ ফিরিয়ে গণপতিকে দেখলেন। “ও, আপনিই তাহলে টর্চ থেকে সেলগুলো বার করে নিয়েছেন? তিন সেলের টর্চ! কত টাকার মাল ছিল পাঁজাবাবু?”
গণপতি মাথা নাড়েন। “না, আমি বার করে নিইনি। নিতে পারিনি। নিতে পারলে কম করেও আড়াই লাখ টাকা হত।” মনে মনে একটা হিসেব ছিল যেন ওঁর।
“কেন পারলেন না?”
“আমার সঙ্গে কথা ছিল নগদ পঞ্চাশ হাজার পাবে প্রেমলাল। টোপ দিয়ে রেখেছিলাম। এখানে অত টাকা আমি পাব কোথায়? অবশ্য ওকে কথাটা জানাইনি। তা সেদিন একটা ছুতো দেখিয়ে বললাম, হাজার পাঁচ-সাত নাও, বাকি টাকা কলকাতায় গিয়ে অমুকের কাছ থেকে নিয়ে নিয়ো। আমি চিঠি লিখে এনেছি।”
“ও! টাকা নিয়ে গোলমাল? পাওনাগণ্ডা আদায়..”
“এককথার মানুষ আমি। কারবার আমার কাছে কারবার। প্রেমলাল চেল্লাতে লাগল। আমি বারণ করলাম। ও আমায় গালাগাল দিতে লাগল। বলল, টাকা দেব কথা দিয়েই আমি তাকে ডেকে আনিয়েছি। হ্যাঁ, তা ঠিকই। আনিয়েছিলাম। তবে সে অন্য মতলবে। প্রেমলালকে একটা ছুতো দেখাবার চেষ্টা করলাম। ও আরও খেপে গেল। ভৈরবকে বললাম, ওকে ধরতে। তখন ঝটপট লেগে গেল। ধস্তাধস্তি। প্রেমলাল ভোজালি চালাল। তারপর টর্চ থেকে ব্যাটারির সেলগুলো বার করে ঝিলের মধ্যে ফেলে দিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে।
শর্মাজি বললেন, “সেলগুলো আপনি পাননি?”
“না।”
“ওগুলো ঝিলের মধ্যে পড়ে আছে?”
“ঝিলের মধ্যে আছে । না, আশপাশেও পড়েছে দু-একটা ছোঁড়ার সময় জানি না।”
“আপনি ভৈরবকে দিয়ে রাত্রে সেগুলো খোঁজেন।” কিকিরা বললেন।
“অত টাকা…” গলার স্বর অন্যরকম শোনাল! তামাশা করলেন নাকি!
“তা দিনের বেলায় খোঁজেন না কেন?”
“না, দিনে নয়। ও মারা যাওয়ার পর আমি ঝিলের আশেপাশেও যাইনি। কার চোখে পড়ে, কী সন্দেহ হয়, কে বলতে পারে! পুলিশের নজর ছিল, আপনারাও ঘোরাঘুরি করতেন ঝিলের কাছে।”
“সাবধানের মার নেই” হাসলেন কিকিরা। “তা রাতের খোঁজটা শুরু হয়েছিল কবে থেকে?”
“এই তো দিন তিনেক…।”
“আপনার ভৈরব ওভাবে আলো নিয়ে অন্ধকারে…”
“ভৈরব দিনকানা!”
“দিনকানা! মানে!…শুনেছি প্যাঁচারা দিনে..” কিকিরা ঠাট্টা করলেন।
“রাতকানা তো শুনেছেন। দিনকানাও হয়। ভৈরব দিনের বেলায় ভাল দেখতে পায় না, ঝাপসাটে দেখে। এ ওর প্রায় জন্মগত রোগ। ডাক্তার দেখিয়েছি অনেক। তাঁরা বলেন, বুঝতে পারি না; তবে এমন হয় পাঁচ লাখে হয়তো দু-একজন । রোগের একটা নামও বলেন। …এক-একজন মানুষ নিয়মের বাইরে থেকে যায় মশাই, প্রকৃতির খেয়াল ।”
শর্মা নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। বললেন, “প্রেমলালই এখানে এসে ওই ধরমশালায় ছিল? গিরিবাবার ধরমশালায়?”
“হ্যাঁ।”
“দাড়িগোঁফ লাগিয়ে গেরুয়া আলখাল্লা পরে এসেছিল, ভেক ধরে?”
“হ্যাঁ। ভেক ধরতে কী আছে দারোগাবাবু। এক-দু’দিনের ভেক । প্রেমলাল কোন মুলুকে না চক্কর মারে! তা ছাড়া ওর ওপর নজর আছে পুলিশের। “
“হুঁ! ও আপনাকে জানিয়ে এসেছিল তাহলে!”
“চিঠি লিখে এসেছিল। চিঠি আমার কাছে আছে। আমি আসতে বলেছিলাম। ও চিঠি পড়লে আপনি কিছু বুঝবেন না। সাঁটে লেখা ।”
“বেশ,” কিকিরা বললেন, “চিঠি পেয়ে আপনি কেন লিখলেন না যে আপনার কাছে এখানে অত টাকা নেই।”
“সত্যি কথা আগেই বলেছি। ওকে আমি এখানে আনতেই চেয়েছিলাম।… তার কারণ ছিল। কী কারণ জানতে চাইবেন না। তবে সেদিন তবু ওকে আমি টাকার ব্যাপারে মিথ্যে বলিনি । টাকা আমার কাছে ছিল না। ও বলল, টাকা নিয়ে কালই সকালে ও গোরখপুর চলে যাবে। সেখান থেকে নেপালে। অনেক টাকার মাল আনতে হবে।”
শর্মা উঠে গিয়ে তাঁর অফিস ঘরের আলমারির তালা খললেন। তারপর একটা প্যাকেট বার করে আনলেন। কোরা কাপড়ে মোড়া। গালার সিল চার-পাঁচ জায়গায়।
নিজের চেয়ারে বসে প্যাকেটটার গালা ভাঙলেন।
ভেতরের জিনিসগুলো সামনে রাখলেন শর্মা। বললেন, “এই টর্চ! শাল! চিনতে পারেন?”
মাথা নাড়লেন গণপতি। “টর্চটা ওর হাতে ছিল । আমার হাতে আসেনি। “
“এই টর্চের ভেতরেই তো ছিল আসল জিনিস,” কিকিরা মুচকি হেসে বললেন।
গণপতি জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না প্রথমে। পরে কী ভেবে বললেন, “প্রেমলাল জখম হওয়ার পর ওর হাত থেকে টর্চটা আমরা কেড়ে নিতে পারতাম। কেন নিইনি কে জানে!”
“টর্চের ভেতর মাল ছিল না বলে।”
চামেলিবাবু আচমকা বললেন, “আচ্ছা পাঁজাবাবু, এই অন্ধকারে আপনার বন্ধুটি এল কেমন করে? তার চোখ কি আঁধারিতে জ্বলে?”
