প্রথমটায় তিনি শর্মাজিদের কথা শুনলেন। চামেলিবাবুর রাগারাগি দেখলেন। না জেনেশুনে অচেনা লোককে বাড়িভাড়া দিয়ে কত মূখামিই না করেছেন তিনি চামেলিবাবু আফসোস করছিলেন। অবশ্য এটা সবসময় সর্বক্ষেত্রে ঠিক নয়। ভাড়া তিনি অজানা অচেনাকেও দেন, তবে একটু দেখে শুনে।
এক তরফা নানান কথা শোনার পর গণপতি পাঁজা বললেন, অধৈর্য হয়েই, “আপনারা আমাকে থানায় ধরে এনেছেন কেন? ধরে এনেছেন প্রমাণ করতে যে আমি সেদিনের ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছি। এই তো?”
চামেলিবাবু বললেন, “আলবাত। আপনি ছাড়া…”
হাত তুলে চামেলিবাবুকে থামতে বললেন গণপতি, তারপর চামেলিকে যেন উপেক্ষা করেই শর্মাজির দিকে তাকালেন। বললেন, “আমাকে আপনি আসামি হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছেন দারোগাবাবু! তা আপনি পারেন। সন্দেহ করে মামলা সাজাতে পারেন। কিন্তু আমার তরফেও আইন আছে। বড় বড় উকিল ব্যারিস্টারও খাড়া করতে পারি । সহজে আপনি আমায় ফাঁসাতে পারবে না।”
শর্মা উত্তেজিত হলেন না। ঠাণ্ডা গলাতেই বললেন, “আপনি যা বলার বলতে পারেন। আমার কাজ আমি করব।”
“করুন।” বলে কিকিরার দিকে তাকালেন গণপতি। “আপনি এদের দলে ঢুকে পড়েছেন! ভালই করেছেন। মশাই, মানুষ চেনায় ভুল আমার কমই হয়। আপনাকে চিনতে আমার ভুল হয়নি। তবে আপনারা যে এতটা নেচে উঠবেন, বুঝতে পারিনি।”
কিকিরা অমায়িক মুখ করে হাসলেন। “আমারও হয়নি।”
“হয়নি?”
“না।”
“তাহলে আপনি বলতে চাইছেন, আমি খুনি!”
“নিজের হাতে আপনি কী করেছেন আমি বলতে পারব না। তবে ওই মানুষটির খুনের পেছনে আপনার হাত থাকতে পারে।”
গণপতি সামান্য চুপ করে থাকলেন। দেখলেন কিকিরাকে তীক্ষ্ণভাবে। শেষে বললেন, “অশ্বিনী দালাল, ওরফে প্রেমলাল, ওরফে খুশিবাবু, জানেন লোকটাকে? নাম শুনেছেন? পুলিশের খাতায় লোকটা নামকরা স্মাগলার। বাইরে থেকে মাল আনে। সোনা, ড্রাগস– সব ব্যাপারেই হাত আছে। ক্রিমিন্যাল। একটা দল আছে ওর। ব্যবসা ছড়ানো। ব্যাঙ্ক ডাকাতিও করেছে।”
কিকিরা রীতিমতো অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। স্মাগলারদের সম্বন্ধে তাঁর কোনও ধারণা নেই। কাগজে পড়েন মাঝে মাঝে, গল্পেও হয়তো শুনেছেন কারও কারও নাম- তবে পাকা স্মাগলার চোখে দেখেননি।
শর্মাজিও নড়েচড়ে বসলেন। এখানে স্মাগলার?
চন্দন আর তারাপদ মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। চামেলিবাবু চুপ।
“তাতে কী!” কিকিরা বললেন শেষপর্যন্ত, নিজেকে সামলে নিয়ে, “স্মাগলার হলে তাকে আপনি ধরিয়ে দিতে পারতেন, কোনও মানুষকে খুন করার অধিকার আপনার নেই।”
“আমি খুন করিনি।” গণপতি বললেন, একটু থেমে আবার, “আর অধিকার থাক শোধবোধের ব্যাপার ছিল।”
“কে খুন করেছে?”
“ইচ্ছে করে কেউ করেনি। গণ্ডগোলে হয়ে গিয়েছে।”
“গণ্ডগোলে হয়ে গেল?”
“হ্যাঁ। দু’জনে যদি লড়াই করে, একজন অন্যজনকে টুটি টিপে মারার চেষ্টা করে তাহলে যে যা পায় হাতের কাছে তাই দিয়ে অন্যকে জখম করে । স্বাভাবিক ব্যাপার এটা। প্রেমলাল জখম হয়েছিল।”
“কে করেছিল! ভৈরব!”
“হ্যাঁ।”
“আপনি হুকুম করেছিলেন?”
“না,” মাথা নাড়লেন গণপতি, “আমি খুন করতে হুকুম করিনি। চিরকালের মতন অকেজো করে দিতে বলেছিলাম। প্রেমলাল বাহাদুরি করতে গেল। ভৈরবের গায়ে অসুরের ক্ষমতা, ছাড়া ও লড়ালড়ির সময় ঝিলের পাড়ে একটা পাথরের টুকরো পেয়ে যায়, ভারী পাথর, প্রেমলালের মাথায় মেরেছিল। তার আগে প্রেমলালের ভোজালিতে সামান্য লেগেছিল ভৈরবের পিঠের দিকে। প্রেমলাল ভোজালি চালালেও জায়গা মতন জখম করতে পারেনি ভৈরবকে।”
শর্মা বললেন, “প্রেমলালকে জখম করার পর তাকে ঝিলের জলে পাথরের ওপর ফেলে দিয়েছিল আপনার ভৈরব।”
“হ্যাঁ। … তবে এখানে ও নিদোষ। ওর মাথায় বুদ্ধিটা খেলেনি। ওটা আমিই বলেছিলাম।”
“আপনি ওখানে ছিলেন?”
“সত্যি কথা বললে বলতে হয়–ছিলাম”, গণপতি বললেন, “নগদ টাকার তোড়া ওকে দিতে হলে থাকব না নিজে।”
শর্মা আর কিকিরা পরস্পরের দিকে তাকালেন। হয়তো চমকেও উঠেছিলেন ভেতরে ভেতরে। টাকা! তোড়া! কেন?
“আপনি ওকে টাকা দিতে গিয়েছিলেন কেন?” গণপতি যেন তামাশা করছেন, বললেন, “টাকা ছাড়া প্রেমলালের সঙ্গে লেনদেনের কারবার হয়! সোনার কাঠি শুনেছেন? হংকং গোল্ড স্টিক!”
“সেটা আবার কী?” চামেলিবাবু বললেন।
“পিনও বলতে পারেন।… হাই ক্লাস টুথ প্রিক কিংবা ধরুন ইনজেকশানের ছুঁচ নিশ্চয় দেখেছেন। এগুলো সেইরকম। জিনিসটা শুনতে যত মামুলি মনে হচ্ছে- আসলে তেমন নয়। সোনার কাঠি, খাঁটি, ভীষণ শক্ত, ওরা বলে– কী বলে যেন মানে দেখতে কাঠি হলেও ওজনে কাঠি নয়।”
“এসব আসে কোথা থেকে?”
“হংকং, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর চোরাপথে ঘুরেফিরে আসে।“
“ওই লোকটা যে মারা গিয়েছে, সে এসব আনাত?”
“লাইনে ছিল। আগেই বলেছি, ও স্মাগলার। ওর হাত হয়ে বাজারে সোনা, স্টোন, নেশাটেশাও ঘুরত।”
“মানে আপনি বলতে চাইছেন, বাইরে থেকে এইসব মাল সে নিজে বা লোক দিয়ে এখানে আনাত?”
“হ্যাঁ। তবে ওর মাথার ওপর লোক ছিল। প্রেমলালের মনিব । তার কাজকর্মের কথা আমি বেশি জানি না । শুধু জানি, বাইরে বাইরেই সে মক্কেল বেশি ঘুরত।”
“এখানকার বাজারে ওই সোনার কাঠির দাম কত হতে পারে?”
“দা-ম! তা এক-একটা কাঠি কম করেও আটশো হাজার।”
“সোনার বিস্কুটের কথা শুনেছি। কাঠি কখনও শুনিনি।”
