“রায়সাহাব,” শর্মাজি কিকিরার দিকে তাকালেন, “গণপতিবাবুকে আজই থানায় তুলে নিয়ে যেতে পারি। থানায় ডেকে নিয়ে যাওয়া ডিফিকাল্ট নয়। তাতে কোনও কাম হবে না। অফেন্স? কোনও অফেন্স তো চাই। নিজের ঘরে আলো জ্বালায়–এ তো অফেন্স নয়!”
কিকিরা মাথা হেলালেন। এ তো সাফ কথা। রাম শ্যাম যদু মধু-যে কোনও লোক যখন খুশি তার বাড়িতে আলো জ্বালাতে পারে, তাতে তার দোষটা হচ্ছে কোথায়? মিছিমিছি এই বাজে কারণ দেখিয়ে কাউকে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া যায় না। এমনকী…
কিকিরার আর ভাবা হল না, তার আগেই শর্মা কথা বললেন, “আজ আমি আমার লোক নিয়ে নাইটে ঝিলের আশপাশে থাকব। ওয়াচ করব। ওই লোকটাকে পাকড়াও করব! লেট আস সি…!”
চামেলিবাবু বললেন, “আজ যদি লণ্ঠনধারী ঝিলের কাছে না আসে?” কিকিরা বললেন, “মনে হয় আসবে।” বলে একটু হাসলেন, বললেন আবার, “আমি শিকারী নই, বনেজঙ্গলেও ঘুরে বেড়াই না। শুনেছি, বাঘসিংহ নাকি তার আধমরা বা মরা শিকার যেখানে ফেলে যায় সেখানে বারবার ঘুরে আসে। আমরা জানি না। কিন্তু আমার বিশ্বাস–ওই ঝিলের আশপাশে কোনও কিছু খোঁজার চেষ্টা হয়। সেটা সামান্য জিনিস নয়। ওই লণ্ঠনধারী আজও আসবে। পাঁজাবাবু কি জানতে পারছেন, আমরা ওঁদের আলোর খেলাটা নজর করেছি! করেননি। তিনি জানেন না। বরাত জোরে আমরা যা দেখেছি তা নেহাত তুচ্ছ নয় চামেলিবাবু, এই গিটটা খুলতে পারলে হয়তো অনেক জট আলগা হয়ে যাবে।”
চামেলিবাবু স্বীকার করলেন কথাটা। “দেখুন, কপালে যদি লেগে যায় আজ!”
শর্মাজি আর অপেক্ষা করতে চাইলেন না। সামান্য শলা-পরামর্শ করে তিনি উঠে পড়লেন।
.
মাঝরাতের পর পরই ঘটনাটা ঘটে গেল।
ঝিলের আলপথ ধরে যে-লোকটা ঘোরাফেরা করছিল, সে ধরা পড়ে গেল। তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয়নি যে ঘন অন্ধকারে, ঝিলের গায়ে বাঁকা হয়ে ঝুলে পড়া গাছটার আড়াল থেকে কেউ আচমকা বেরিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলবে।
তবু হয়তো সে পালাবার চেষ্টা করত। কিন্তু বুঝতে পারল তাতে লাভ হবে না। পুলিশের হুইশলের শব্দ, টর্চের আলো, জনা কয়েক সেপাইয়ের ছুটে আসা, দারোগাজির হাতের অস্ত্রটি তাকে আর পালাবার সাহস জোগাতে পারল না।
লোকটাকে চট করে দেখলে মনে হয় না, ও মানুষ। চেহারায় যতটা ভীতিকর তার চেয়েও বেশি আতঙ্কজনক তার সাজপোশাক। ঘন কালো, কর্কশ এক কম্বলের কাপড় কেটে যেন তার গায়ে এক বেয়াড়া জোব্বা বা জামা চাপানো রয়েছে। গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা। মাথা মুখ গলা কালো টুপিতে আড়াল করা। হনুমান-মাকা টুপি। শুধু চোখ নাক দেখা যাচ্ছে। টুপির গলার কাছে একটা কালচে মাফলার। হাতে দস্তানা। সেটাও কালচে রঙের। পায়ের জুতো গামবুট ধরনের। অল্প আলো বা অন্ধকারে দেখলে লোকটাকে বুনো জন্তু বলেই মনে হয়।
ধরা পড়ে গেল লোকটা। তার হাতের লণ্ঠন কেড়ে নিল একজন সেপাই ।
কিকিরারাও ততক্ষণে হাজির হয়ে গিয়েছেন ঝিলের ধারে ।
শীতের দিন। তবু ঘন ঘন হুইশলের শব্দ, সেপাইদের চেঁচামেচিতে চামেলিবাবুর প্রতিবেশীদের কারও কারও হয়তো ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। জানলাও খুলে গেল দু-এক বাড়ির।
শর্মাজি আর দাঁড়াতে রাজি নয়।
লোকটাকে ধরে রাখল দুই সেপাই। অন্য একজনকে শর্মা হুকুম করলেন, গণপতি পাঁজার বাড়িতে গিয়ে পাহারায় থাকতে। ভোর হলেই তাঁকে তুলে নিয়ে থানায় যেতে।
“রায়সাহাব, আপনারা ঘর চলে যান। রাত বহুত হয়ে গেল। কাল থানায় আসবেন। “
কিকিরা পাঁজাবাবুর অনুগত লোকটিকে দেখছিলেন। দেখছিলেন আর ভাবছিলেন, বুনো জন্তুর মতন পোশাক পরলেও লোকটাকে অনেক বেশি ভৌতিক দেখায়। এরকম কাউকে রাত্রে আচমকা দেখলে ভয়ে মূর্ছা যাওয়া অসম্ভব নয়। হার্টফেলও হতে পারে দুর্বল চিত্তের মানুষের।
“তোমার নাম ভৈরব?” কিকিরা বললেন।
লোকটা জবাব দিল না কথার । সে যেন এখনও ভাবতে পারছে না যে কেমন করে সে ধরা পড়ে গেল।
জবাব না-পাওয়ায় কিকিরা যেন একটু হেসে বললেন, “তুমি বাপু কতক্ষণ আর বোবা হয়ে থাকবে! থানায় যাও, পুলিশের গুঁতো খেলে বোবারাও ‘বাবা’ বলে। কথা ওরা বলিয়ে নেবে।”
চন্দন বলল, “চলুন, সার। আজ আর নয়। ঠাণ্ডা লেগে গিয়েছে।”
কিকিরাও আর দাঁড়াতে রাজি নন। তারাপদকে টানলেন।“চলো।” যেতে গিয়ে শর্মার দিকে তাকালেন। “কাল আপনার সভা কখন বসবে দারোগাসাহেব?”
“স-ভা!”
“আমরা তো যাব ।”
শর্মা বুঝতে পারলেন। বললেন, “সাড়ে ন দশ বাজে আসুন।”
“চামেলিবাবু?…পায়ে ব্যথা।“
“আনিয়ে নেব।”
“চলি।”
কষ্টই হচ্ছিল যেতে। ঝিলপারের চারদিক কুয়াশায় ঢাকা। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস আসছে উত্তরের। আকাশের তারাগুলিও যেন আবছা হয়ে এসেছে হিমে কুয়াশায়।
যেতে যেতে কিকিরা বললেন, “বুঝলে চাঁদু, পাঁজাবাবু, থিয়েটার যাত্রার ড্রেস মেকার, সাজ মাস্টার হতে পারেন। ওঁর সুনাম কতটা, আমি জানি না। তবে লোকটির অন্য মিস্ত্রিও আছে, চাঁদু। হয়তো সেটাই আসল! দেখা যাক, কী। বলেন উনি!”
.
॥ ৯ ॥
থানায় শর্মাজির অফিস ঘরে চামেলিবাবুরা সবাই বসে ছিলেন। কিকিরারা একপাশে; চামেলিবাবু শর্মার মুখোমুখি। বাঁদিকে একটা কাঠের চেয়ারে গণপতি পাঁজা। গণপতি পাঁজাকে দেখলে মনে হবে না, উনি ভয়ে তটস্থ হয়ে বা বিহ্বল হয়ে বসে আছেন। শক্ত মানুষ। গলার স্বর মিনমিনে নয়, খানিকটা নিস্পৃহ ও গম্ভীর।
