আলোটা যে লণ্ঠনের, তা বোঝা যায়। টর্চের আলোর ধরন আলাদা। সাদাটে, উজ্জ্বল, স্থির। এই আলো ম্যাটমেটে, ঘোলাটে । মাঝে মাঝে আলোটা হারিয়ে যাচ্ছে, বা আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। না, একেবারেই দপদপ করছে না।
কিকিরার মাথায় ঢুকছিল না, লোকটা কে হতে পারে? কেনই বা এই মাঝরাতে শীতের মধ্যে ঝিলের আলের পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে! কেন? মনে হয়, লোকটা যেন কিছু খুঁজছে। তন্নতন্ন করে। কিন্তু খোঁজাই যদি উদ্দেশ্য হয়–তবে দিনের আলোয় নয় কেন?
কিকিরা এটাও বুঝতে পারছিলেন না, ঠিক কতদিন ধরে আলোটা দেখা যাচ্ছে! হালে? না, আগে থেকেই! চামেলিবাবুর নজরে পড়েছে মাত্র গতকাল!
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফিরে এল তারাপদরা। শীতে কাহিল।
কিকিরাও ছাদ থেকে নীচে নেমে এসেছেন।
তারাপদ আর থাকতে পারছিল না। ভীষণ উত্তেজিত। গা গরম করার জন্য হাত বাড়িয়ে সিগারেট চাইল চন্দনের কাছে। তারপর কিকিরাকে বলল, “সার, আপনি যা ভেবেছিলেন একেবারে রাইট। চামেলিবাবুর বাগানের বাইরে যে পাঁচটা বাড়ি আছে, চামেলিস ফাইভ ফিঙ্গার–” ঠাট্টা করেই বলল তারাপদ, এই ঠাট্টাটা সে করে মাঝেমধ্যে। “ওই বাড়িগুলোর একটার মধ্যে থেকে আলোর সিগন্যালিং চলছিল।”
“কেমন সিগন্যালিং?”
চন্দন বলল, “তারা পারবে না, আমি আপনাকে বুঝিয়ে বলছি।…একটা বাড়ির একটাই জানলা খোলা ছিল। জানলার বাইরের দিকে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল না–আলো হাতে থাকলে বাইরে আলো পড়ত। মানে বাইরে আলো থাকলে আশপাশ থেকে চোখে পড়ত সহজেই। জানলার ভেতর দিকে ঘরের মধ্যে কেউ ছিল। তার আলোও টর্চের নয়, লণ্ঠনের। আলোটা কুপির আলোর মতন, কিংবা সাধারণ মোমের। ওই আলো কখনও ডাইনে কখনও বাঁয়ে কখনও ওপরে নীচে ঘোরানো হচ্ছিল। এক দু’বার দেখলাম ক্রশ চিহ্ন করল। সারকেলও করেছিল।…কোনও সন্দেহ নেই-ওপারে জানলার আড়াল থেকে কেউ সাঙ্কেতিকভাবে কিছু বোঝাতে চাইছিল ঝিলের লোকটাকে।”
“কোন বাড়ি বুঝতে পারলে?”
“পাঁজামশাইয়ের। ওটাই তো পশ্চিম দিকে একটেরে।”
তারাপদ বলল, “আমরা আরও অনেকটা এগুলে ঝিলের লোকটাকে আন্দাজ করতে পারতাম। এগিয়ে যেতে সাহস হল না। আপনি বারণ করেছিলেন। আমরা টর্চও জ্বালিনি, পাছে ওরা আলো দেখে ধরে ফেলে ওদের ওপর কেউ নজর রাখছে। “
কিকিরা বললেন, “ঝিলের লোকটা কখন ফিরে গেল?”
“ওপাশ থেকে বার কয়েক বাতি কম-বেশি করল। নিভিয়ে দিতেই লোকটা চলে গেল।”
“অন্ধকারে আর কিছু দেখতে পেলে না?”
“না, সার।”
কিকিরা চুপ। চন্দন বলল, “শর্মাজিকে ব্যাপারটা জানিয়ে আমরা এবার থার্ড পার্টি হয়ে যাই, কিকিরা! অযথা এই গণ্ডগোলের মধ্যে গিয়ে কাজ নেই। এসেছিলাম বেড়াতে, দু’দিন আরামসে থাকব, খাবদাব ঘুমোব, তা না কোথায় কে খুন হল, থানা পুলিশ..আমাদের মাথা ঘামিয়ে লাভ কী বলুন?”
কিকিরা মাথা নাড়লেন, যেন স্বীকার করে নিলেন কথাটা। বললেন, “মাথা আমরা ঘামাতাম না। সেদিন সকালে তারা তোমায় ডেকে নিয়ে গেল, তুমি ঝিলের কাছে গিয়ে একটি মানুষকে দেখলে। মারা গিয়েছে। তারপর থানা পুলিশ, স্টেটমেন্ট…। জড়িয়ে না গিয়ে কী করব! যাক গে, তুমি ঠিকই বলেছ। শর্মাকে এবার কথাটা জানাতে হয়। আমরা জানাতে পারি, চামেলিবাবুও পারেন। তবে চামেলিবাবুর চেয়ে আমরা আরও একটু বেশি দেখেছি।”
তারাপদ বলল, “সার, আপনি ঠিকই বলেছিলেন। গণপতি পাঁজা লোকটাকে সত্যিই সুবিধের মনে হচ্ছে না।”
“তাই দেখছি। একজন থিয়েটার যাত্রার ড্রেস মেকার, সাধারণ মানুষ, পেশাও মামুলি, পাঁজাবাবুর বয়েসও হয়েছে, ভদ্রলোক কেন এইসব গোলমেলে ব্যাপারের মধ্যে থাকবেন, আমি বুঝতে পারছি না।”
“আমাদের বুঝে দরকার নেই। যার বোঝার বুঝবে। আপনি চামেলিবাবুকে বলুন শর্মাজিকে ঘটনাটা বলতে। না হয় দু’জনেই বলুন।”
“ডাল ভার্সান!” তারাপদ ঠাট্টা করে বলল।
কিকিরা আর একটু বসে উঠে পড়লেন। “নাও, শুয়ে পড়ো। রাত কাবার হতে চলল।” বলে কিকিরা উঠে পড়লেন, নিজের ঘরে শুতে যাবেন।
ঘড়ি দেখার দরকার ছিল না। রাত যে শেষের দিকে টলে পড়ছে–বোঝাই যায়।
.
॥ ৮ ॥
চামেলিবাবু নিজেই হয়তো যেতেন পারলে, কিন্তু হাঁটার ক্ষমতা নেই থানা পর্যন্ত। কাজেই চিঠি লিখে থানা থেকে শর্মাজিকে ধরে আনলেন। কিকিরারাও ছিলেন।
সকালে বসা হয়নি। অন্য কাজ ছিল শর্মাজির। বিকেলেই এসেছেন তিনি। আর এখন বিকেল মানে আধ-সন্ধে।
কিকিরারাও এসে পড়েছেন সময়ে।
চামেলিবাবুর বসার ঘরে চা খেতে খেতে ঘটনাটা শুনলেন শর্মা। প্রথমে চামেলিবাবুর মুখে, পরে কিকিরাদের কাছে।
শর্মা ঠাণ্ডা মাথায় ভাবলেন খানিক, তারপর বললেন, “চামেলিজি, ওই গণপত তো আপনার বাড়িতে ভাড়া থাকেন। আপনি আগে জানলেন না, আদমি কেমন?” শর্মা গণপতিকে বলে ‘গণপত’।
চামেলিবাবু বললেন, “না। আগে জানব কেমন করে! ভাড়া চেয়েছিল। দিয়ে দিলাম।”
“আপনার চেনা কেউ রেকমেন্ড করেছিল?”
“না, সেভাবে কেউ করেনি। চিঠি লিখেছিল ভদ্রলোক। এর আগে হরিবাবু বলে এক ভদ্রলোক ছিল বাড়িটায়, পুজোর আগে। কাশীপুরের লোক। কাপড়ের ব্যবসা শোভাবাজারে। তার মুখে আমার বাড়ির কথা শুনে চিঠি লিখেছিল…”।
“কমাস ভাড়া নিয়েছেন গণপত?”
“দু’মাস।”
“আছেন কত দিন?”
“পনেরো বিশ দিন হল।”
“আপনার কাছে আসেন?”
“না। দু-একদিন এসেছেন। কথা বেশি বলেন না। স্ত্রী মারা গিয়েছেন ক’বছর আগে। ভেতরে কোনও আফসোস আছে। মুখ দেখে তাই মনে হয়। … আমিই বরং খোঁজ নিতাম পাঁজার।”
