কিকিরাও অবাক হচ্ছিলেন। চন্দন আর তারাপদ বলল, “আলেয়া?”
“না,” চামেলিবাবু মাথা নাড়লেন, “আলেয়ার আলো আমরা অনেক দেখেছি। আগেকার মাইনিং ফিল্ডে হরদম ওটা দেখা যেত। ওটা গ্যাসের ব্যাপার। ছেলেবেলায় আমরা বলতাম, মাঠেঘাটে ভূতগুলো ছুটে বেড়ায় । কালকের দেখা আলো আলেয়া নয়।”
“কেমন করে বুঝলেন?”
“দেখে বুঝলাম। তা ছাড়া ঝিলের পাশে আজ পর্যন্ত কখনও কেউ আলেয়া দেখেনি।”
“কীসের আলো তবে?”
“মনে হয় লণ্ঠনের।…কাল যখন আলোটা দেখি–তখন আর আকাশে চাঁদ নেই। ডুবে গিয়েছে। পুরো অন্ধকার।”
“তখন ক’টা হবে?”
“পরে ঘড়ি দেখেছি, রাত সোয়া দুই।”
“আপনি কতক্ষণ দেখেছেন?”
“মিনিট দশ পনেরো বড়জোর। শীত করছিল। দাঁড়িয়ে থেকে কী আর করব। ঘরে চলে এলাম।”
চন্দন বলল, “আলোটা কতক্ষণ ছিল?”
“তা বলতে পারব না।”
তারাপদ বলল, “সকালে কাউকে দেখতে পাঠিয়েছিলেন?”
“বিজুয়াকেই পাঠিয়েছিলাম। ও ওই জায়গাটা দেখে আসার পর আমার চিরকুটটা রায়বাবুকে দিয়ে এসেছে।”
কিকিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন, পরে বললেন, “কথাটা কি জানিয়েছেন কাউকে?”
মাথা নাড়লেন চামেলিবাবু। “না।…শুনুন রায়সাহেব, আমার বিশ্বাস শুধু ঝিলপাড়েই আলো ছিল না, অন্য কিছুও থাকতে পারে।”
“শর্মাকে জানিয়েছেন কথাটা?”
“না। আজ শর্মার সঙ্গে দেখা হয়নি। শুধু আপনাকেই জানিয়েছি। শর্মা যদি কাল আসে এদিকে, জানাব।”
“এটা ক’দিন হচ্ছে?”
“বলতে পারব না। কালকেই চোখে পড়ল প্রথম। “
“ঠিক আছে। আজ আমরাও নজর করব। আমাদের বাড়ি থেকে ঝিল দেখা যায় না। তবে ছাদে উঠলে আপনাদের এদিকটা দেখা যায়।”
“দেখুন তো একবার । আমিও দেখব।”
তারাপদ বলল, “কিকিরা সার, আমাদের সঙ্গে চামেলিবাবুর একটা সিগন্যালিং কোড থাকলে ভাল হত। উনি যখন দেখতেন…”
কিকিরা বাধা দিয়ে বললেন, “সে পরে হবে। আগে আমরা দেখি।”
চামেলিবাবু বললেন, “আমি জোর করে বলতে পারি, ভূত প্রেত নয়, আলেয়াও নয়, কেউ একজন ওখানে আলো হাতে ঘুরে বেড়ায়।…আপনারা কলকাতার লোক, কথাটা ঠিক বুঝবেন না হয়তো। কিন্তু আমরা বনজঙ্গলে ফাঁকা মাঠেঘাটে পড়ে থাকি। আমরা দেখেছি, কেউ যদি দূরের মাঠ দিয়ে হাতে লণ্ঠন ঝুলিয়ে হেঁটে যায়, আলোটা দোলে। মাঝে মাঝে উঁচু নিচু জায়গায় এমনকী লণ্ঠনধারীর গায়ের আড়ালেও পড়ে যায়। এই আলো মশাই, তেমন নয়। আলো হাতে কেউ হেঁটে যায় না একনাগাড়ে, আলোটা দেখলাম কমুহূর্ত, তারপর আর নেই। আবার একসময়…”
কিকিরা হেসে বললেন, “রহস্য তো ভালই জমেছে চামেলিবাবু। এতদিন ছিল লোকটা কে, কেমন করে মারা গেল? এখন আবার দেখা যাচ্ছে, ঝিলের আশেপাশে মাঝরাত্তিরে একটা ভৌতিক আলোও হাজির হয়েছে। মানে, এখন চলছে ভুতুড়ে খেলা। বোধ হয় হাতড়ানোর পালা…”
“হাতড়ানোর পালা?”
“খোঁজখবর হচ্ছে হয়তো!”
“কীসের?”
“সেটাই তো বলতে পারছি না আমরা। বুঝতেও পারছি না। পারব হয়তো এবার।”
উঠে পড়লেন কিকিরারা। “আসি।”
“সাবধানে যাবেন।”
“আমরা ইচ্ছে করেই আলপথ দিয়ে যাব না এখন। বড় রাস্তা ধরে ঘুরে যাব। আপনিও বেশি হাঁটাচলা করবেন না। ব্যথা বাড়বে।”
কিকিরারা আর বসলেন না। ওঠার সময় মজা করে বললেন, “দেখবেন মশাই, ভূতকে ভয় দেখানোর জন্যে যেন দোনলা চালিয়ে দেবেন না। তাহলে ভূত পালাবে।”
মাঠের রাস্তায় এখন স্পষ্ট জ্যোৎস্নার আলো। শীতের কুয়াশা ততটা ভারী হয়নি। রাতও বেশি নয়। মাত্র সাড়ে সাত । চামেলিবাবুর বাগানের লাগোয়া পাঁচটা বাড়ি গায়ে গায়ে নয়। তবু আলো জ্বলছিল ল্যাম্পের, লণ্ঠনের। কিকিরা যেন আরও নজর করে করে বাড়িগুলো দেখছিলেন। শীতলবাবুর বাড়ি প্রায় অন্ধকার। কচির বাড়িতে বাতি জ্বলছে। অন্য তিনটে বাড়িও অন্ধকার নয়।
তারাপদ হঠাৎ হেসে বলল, “কিকিরা সার, আপনি তাহলে আজ ভূত দেখবেন?”
“দেখব কি গো! ভূত নিয়েই তো আমার কারবার।”
তারাপদ ঠাট্টাটা বুঝতে পেরে হেসে উঠল ।
.
ঘড়ি দেখার দরকার হল না।
কিকিরা অনুমান করলেন, রাত দেড়টাও হয়তো হবে না, চামেলিবাবুর কথা বর্ণে বর্ণে মিলে গেল।
শীত কিন্তু বেশ কিকিরা গা-মাথা যতই ঢাকা দিন না কেন–শীতে কাঁপুনি ধরে যায়। চাঁদের আলো মরে গেল। শুক্লপক্ষ, তিথিও বোধ হয় নবমী। অস্ত গেল চাঁদ। অন্ধকার। তারা ফুটে আছে এপাশে।
ঝিলের আলপথে আলো দেখা গেল।
কিকিরারা দেখলেন ।
আলের উঁচু রাস্তায় কখনও, কখনও বা নীচে–ঝিলের গা ধরে একটা আলো জ্বলছে, থামছে। আড়াল পড়ে যাচ্ছে। আবার দেখা যাচ্ছে ।
কিকিরা কিছুক্ষণ লক্ষ করতে করতে বললেন, “চাঁদু, তোমরা তৈরি?”
“হ্যাঁ, সার।”
“ঠাণ্ডা লাগবে না?”
“না সার, হেড টু ফুট এমনভাবে কভার করেছি যে, নর্থ পোলে চলে যেতে পারি।”
“তাহলে খানিকটা এগিয়ে যাও। এই ছাদ থেকে ঝিলটা আমি দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু ওপারে চামেলিবাগানের বাড়িগুলো নজরে পড়ছে না। তোমরা খানিকটা এগিয়ে বড় রাস্তায় জামগাছটার সামনে দাঁড়ালেই বাড়িগুলো দেখতে পাবে। একবার দেখে এসো ওই বাড়িগুলোর কোনওটা থেকে..”
“বুঝেছি সার। আলোর খেলা চলছে কিনা?”
“হ্যাঁ। যেমন বলেছিলাম।”
“আয় তারা, চলে আয়।”
তারাপদ বলল, “চল। জয় মা কালী । টর্চ নিয়েছিস?”
চন্দনরা ছাদ থেকে নেমে গেল।
কিকিরা মাথা বাঁচাবার জন্য কয়েক পা সরে গেলেন। ছাদের সিঁড়িঘরের মাথায় অ্যাসবেসটাসের শেড। এখান থেকেও ঝিলের দিকটা দেখা যায়।
