“দিয়েছেন।”
“তাস আছে আপনার দোকানে?”
“তাস?” কচি দোকানের চারপাশে তাকাল। “তাসের প্যাকেট ছিল। সিজনে মাঝে মাঝে বাবুরা চায়। এখন কোথায় রেখেছি দেখতে হবে। পরে খুঁজে দেখব। কী করবেন তাস নিয়ে? খেলবেন?”
“পেশেন্স!” কিকিরা মজার মুখ করে হাসলেন। “আমি তাসের খেলাও দেখাতে পারি।”
“ও!”
“চলি!” বলে তারাপদদের ডাকলেন। “চলো হে।”
বিশ-পঁচিশ পা এগিয়ে এসে কিকিরা বললেন, “কচির ব্যাপারে আমার একটা ধাঁধা থেকে গেল! ও সেদিন সত্যি কি এখানে ছিল না?”
“ধাঁধার কী হয়েছে? আপনি ওর বাড়িতে খোঁজ নিতে পারেন।”
“আমি?”
“না হয় চামেলিবাবুকেই বলবেন। কিন্তু কেন সার? কচি মামুলি ছেলে । ওকে এই মার্ডার কেসে টানছেন কেন?”
“টানিনি । ওকে টানছি না। কিন্তু আমার মনে হয়, ওকে একটু ওয়াচফুল থাকতে বললে হত।…আচ্ছা, কচির মা কি সত্যিই সেদিন কোনও ডাক শুনেছিলেন।”
“কেন?”
“কে-ন!…শুনলে বুঝতে হবে ওটা নিশাচরের ডাক। মিনিংফুল। …তা থাক, আমার মন কী বলছে জানো তারাবাবু! মন বলছে, খুনটা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু খুনের পর যে জাল গুটনো থাকে সেটা এখনও হয়নি। …বরং আরও গুছিয়ে বললে বলতে হয়, খুন করার পাটটা মিটলেও পরের কাজটা মেটেনি। মিটলে চামেলিবাবু আমায় একটা জরুরি খবর দেওয়ার জন্যে পাঠাতেন না।” ৭০
তারাপদ আর চন্দন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
কিকিরা পকেট থেকে একটুকরো কাগজ বার করে তারাপদদের দিলেন। বললেন, “ওঁর লোক সকালে এসে দিয়ে গিয়েছে। উনি নিজে বেরোতে পারেননি। হোঁচট খেয়ে বুড়ো আঙুল জখম।”
কাগজটা নিয়ে দেখল চন্দনরা।
চামেলিবাবু লিখেছেন : “আজ একবার অবশ্যই দেখা করবেন। নতুন খবর আছে। আমি নিজেই যেতাম। দরজার চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে ডান পায়ের বুড়ো আঙুল ভেঙেছি বোধ হয়। ফুলে গিয়েছে খুব, নীল হয়ে কালসিটে পড়েছে। পায়ের পাতা ফেলতে পারছি না। আসবেন আপনারা। কথা আছে।”
চিঠির টুকরোটা ফেরত দিল চন্দন । কিকিরা রাস্তায় উঠলেন। আজ মাঠে একরাশ ফড়িং উড়ছে। বর্ষাকালের মতন। কাঁটাঝোপে বেগুনি রঙের ফুল ফুটে আছে।
তারাপদ বলল, “জরুরি কথাটা কী হতে পারে, সার? আন্দাজ পাচ্ছেন?”
“না, কী কথা আন্দাজ করতে পারছি না। তবে বুঝতে পারছি, এই ঘটনা নিয়েই কথা।”
“উনি কি শর্মার কাছে সদরের দফতর থেকে আসা রিপোর্টের কথা শুনেছেন?”
“শুনতে পারেন। শর্মার কাছে খবর এসেছে কাল। চামেলিবাবুর সঙ্গে শর্মার যোগাযোগও আছে।”
“তাহলে কি এই খবরটাই উনি আমাদের শোনাতে চান?”
“না বোধ হয়।” চন্দন কী যেন ভাবতে ভাবতে বলল, “কিকিরা, আপনি যেন একটা আঁচ পাওয়ার অবস্থায় এসে পড়েছেন। কী? গন্ধ পাচ্ছেন নাকি?”
“না। এখনও অন্তত নয়। তা ছাড়া আমি তো আগেই বলেছি, খুনোখুনির কারবারে আমি নেই। আঁচ আমি বাস্তবিকই পাচ্ছি না। তবে একটা কথা আমি প্রায় জোর করেই বলতে পারি, মাখনবাবুর তন মানুষদের সাধ্য নেই এমন ভয়ঙ্কর কাজ করার। কিন্তু এঁরা কেউ ঘুণাক্ষরেও সেদিন কিছু জানেননি, শোনেননি–ভাবতে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তবু না হয় তাঁরা কিছুই না জানলেন–তারপরও কি কিছুই ওঁদের নজরে পড়ল না আজ পর্যন্ত! আমি তো আলাপ করে দেখলাম, ওঁরা একেবারে হাঁদাবোকার মতন ব্যবহার করেন।”
“ছেলে দুটো? পল্লব আর হকি প্লেয়ার লাডলি?”
“ঠাণ্ডা হয়ে আছে।…শর্মা ওদের এবার হয়তো ছেড়ে দেবে।”
তারাপদ বলল, “সার, ওদের ব্যাপারটা হল হিন্দি সিনেমার হিরো-মাকা । নাচ-গান হুল্লোড় । আমার মনে হয় না, ভেতরে ওরা বদ। চামেলিবাবুকে
জ্বালাত হয়তো। সে মজা করেই। সিরিয়াসলি নয়।”
কিকিরা কিছুই বললেন না।
.
॥ ৭ ॥
চামেলিবাবুর বাগানের একটা প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এখানকার জমি এমনিতেই সমতল নয়, উঁচু নিচু, কোথাও চড়াই মতন, কোথাও ঢালু। চামেলিবাবুর বাগানের দিকটা ঢালু হতে হতে মাঠের সঙ্গে মিশে গিয়েছে, যত বড় বড় গাছপালা সবই যেন ধাপ ভেঙে ভেঙে মাটিতে নেমেছে–মানে মাঠের দিকে। ওঁর বসতবাড়ি একতলা হলেও সবচেয়ে উঁচু জায়গায়। জলবৃষ্টিতে বাড়ির আশেপাশে একফোঁটাও জল থাকে না, গড়িয়ে বাগানে নেমে যায়। গোয়ালঘর বসতবাড়ি থেকে বেশ খানিকটা তফাতে, খামারি ঘর চমৎকার। পুব দিকে, সেখানে খেতের ধান কলাই যা ওঠানো হয় জমা পড়ে। ধান ভাঙার কাজ হয় অন্যত্র, খামারি ঘরের গায়েই।
সন্ধে বলতে এখন ঘড়িতে ছটাও বাজে না, তার আগেই অন্ধকার। আজ অবশ্য অন্ধকার তেমন ঘন নয় এখনও। শুক্লপক্ষ। চাঁদ রয়েছে আকাশে। নবমী দশমী তিথি হবে।
চা খাওয়ার পাট চোকাবার আগেই চন্দনকে দিয়ে ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা দেখিয়ে নিয়েছেন চামেলিবাবু। না, ভাঙেনি। তবে জোর হোঁচট খেয়েছেন। গাঁটে লেগেছে। রক্ত জমে নীলচে আঙুল ফুলে আছে। একদিকে চুনহলুদ চলছে, অন্যদিকে শীতলবাবুর হোমিওপ্যাথি। ব্যথা কি তাতে তেমন কমে! তবে উনিশ বিশ ।
চামেলিবাবু বললেন, “এবার কাজের কথা বলি। .আমার এই বাড়ি থেকে ঝিলটা দেখা যায় জানেন তো রায়সাহেব।”
“জানি। দেখতেই পাওয়া যায়।”
“ভালই যায়। আমার বাড়িটা উঁচুতে। আর ওগুলো অনেক ঢালুতে।”
“বুঝেছি। ঝিলে..”
“শুনুন আগে সব।” চামেলিবাবু বললেন, “কাল পায়ের যন্ত্রণায় ঘুম আসছে না। একটু করে ঘুমোই, তন্দ্রার মতন হয়, আবার ঘুম ভেঙে যায়।…তা তখন মাঝরাত হবে, আমার শোয়ার ঘরের পাশে বিজুয়া শোয়। বিজুয়াকে তো চেনেন। দেখছেন সবসময়। ও আমার হাতের লাঠি। আমার সব কাজ ও করে। বুড়োমানুষ, কখন কী হয়, বিজুয়া আজ ক’বছরই রাত্রে আমার পাশের লম্বা ঘরটায় শোয় রাত্রে। কাল আমি যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে বিছানায় উঠে বসেছি। একবার কলঘরে যাব। আমার সাড়া পেয়ে বিজুয়া এসে বলল, বাবু একবার বাইরে এসে দেখে যান; ঝিলের ধারে ভুতুড়ে আলো ঘুরে বেড়াচ্ছে। …বিজুয়াদের ভূতপ্রেতে বিশ্বাস থাকা অস্বাভাবিক নয়। ও ভয় পেয়েছিল বলে মনে হল। আমি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাইরে এসে দেখি, বিজুয়া ভুল বলেনি। একটা আলো, ঝিলের আলপথ ধরে ঘুরছে। ঘুরছে মানে, অনেকটা সেই আলেয়ার মতন এই একটা জায়গায় জ্বলল তা খানিক পরে নিভে গেল; খানিকটা তফাতে আবার দেখি আলো। অদ্ভুত ব্যাপার, মশাই।”
