কিকিরারা হাঁটতে হাঁটতে কচি–মানে কাঞ্চনের দোকান পর্যন্ত এসে পড়লেন। দোকান খুলেছে কচি। বোধ হয় খানিকটা আগে। দু-তিনজন খদ্দের দাঁড়িয়ে।
কী মনে করে কিকিরা কচির দোকানের দিকে পা বাড়ালেন।
কচি একটা ছেলেকে চায়ের পাতা দিল ওজন করে। অন্যজন কাপড়কাঁচা সাবানের টিকিয়া নেবে। দামদস্তুর করে না কচি। তবু পঁচিশ পয়সা বেশি নিল। দাম নাকি বেড়ে গিয়েছে। তৃতীয় খদ্দেরের সঙ্গে বচসা বেধে গেল কচির। ছেঁড়াফাটা একটা প্যাকেট গছাবার চেষ্টা করছে কচি, মেয়েটা নেবে না। কচি প্রথমে তাকে বোঝাতে চাইল, অবশ্য মেজাজি গলায়, মেয়েটা শুনবে না। কচি তখন হাঁকিয়ে দিল। “ভাগ। অন্য কোথাও যা। সাত সকালে ধারে মাল কিনবি–তার আবার ছেঁড়াফাটা। যা যা, তোর মালকিনকে বলবি, আমার এখানে এইরকম মালই পাওয়া যায়।”
মেয়েটা বোধ হয় কাছের কোনও বাড়িতে কাজ করে। রুক্ষ চুল, ময়লা এক কাপড় পরনে, ওপরে ছেঁড়া সুতির চাদর। খালি পা।
কিকিরারা দোকানে এসে দাঁড়ালেন।
কচি তাকাল। চেনাজানা হয়েছে কিকিরাদের সঙ্গে। তবে ওই মুখচেনা গোছের। অল্প আলাপ।
কচি হাসল না । মেয়েটাকে ভাগিয়ে দিয়ে তার মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছে।
“কী হল?” কিকিরা বললেন হাসিমুখেই।
“কিছু নয়। …আরে, আমি কি নিজে এখানে প্যাকিং করি। মাল আনতে গিয়ে একটু ছিঁড়েফেটে যেতেই পারে। তার আমি কী করব!”
“তা ঠিক। সবাই কি বোঝে?”
“মেয়েটা পাজি। বাড়িতে নিয়ে গেলে ওর মনিব–মালকিন বুঝত। নন্দীদার বউ আমায় বিলক্ষণ চেনে। জানে, আমি ভেজাল কারবার করি না । মেয়েটা পাজি। এখান থেকে নিল না, বলরামের দোকান থেকে নিয়ে যাবে। ওখানে খুচরো এটা-ওটা পায় যে! টিপ, সেফটিপিন, চিনির ডেলা লজেন্স..” বলতে বলতে কচি তার ক্যাশের ডালা খুলে খুচরো কিছু গুনে নিল। নিয়ে চন্দনের দিকে বাড়িয়ে দিল। “আপনার কালকের ব্যালান্স। সত্তর পয়সা। তখন দিতে পারিনি।”
কিকিরা হাসিমুখে বললেন, “ব্যবসা চালাতে গেলে ওরকম কিছু খুঁজতে হয়। আপনিও…”
“থাক মশাই, আমাকে আর খুঁজতে বলবেন না– কচি বিরক্ত হয়ে বলল, “এই ছোট্ট দোকানটা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে আমার আট-দশ হাজার টাকা গলে গেছে। ক্রেডিট! ধার। ধারে মাল দিয়েছি, উসুল করতে পারি না। এর কাছে একশো ওর কাছে দেড়শো–এই করে লাস্ট পাঁচ বছরে হাজার সাত-আট। জোর করে আদায় করতে গেলে খদ্দের পালাবে। কাজেই টাকাটা গুরুর নামে লিখে ফেলে রেখেছি। ছিপ জানেন তো! ব্যবসার ছিপ ফেললে বঁড়শি অনেকটা টেনে নেয় জলে। মানে জলে পড়ে অনেক টাকা। খাতায় খরচ জলে লেখাই থেকে গেল!”
তারাপদ, চন্দন হেসে ফেলল।
কিকিরাও হাসলেন, “ব্যবসা বড় ঝকমারির কাজ। তবু ভাল। স্বাধীন বৃত্তি। …ভাল কথা, খবরটা শুনেছেন?”
“কীসের খবর?”
“ঝিলে যে লোকটিকে পাওয়া গিয়েছিল–অ্যাকসিডেন্টে সে মারা যায়নি, তাকে খুন করা হয়েছে।”
কচির মুখ দেখে মনে হল, খবরটা শুনে সে আকাশ থেকে পড়ল না। অপ্রত্যাশিত খবর এটা নয়, কেননা আজ কদিন ধরেই ঘটনাটির আলোচনা উঠলেই এই শহরের প্রায় সবাই মোটামুটি এইরকমই অনুমান করছিল।
“কোথায় শুনলেন?”
“থানায়। রিপোর্ট এসেছে। মার্ডার কেস। “
কচি অল্পসময় চুপ করে থেকে বলল, “আমাদের এখানে এমন কাণ্ড কখনও হয়নি। কেউ শোনেনি। অনেককাল আগে একবার ট্রেন অ্যাকসিডেন্টে ক’জন মারা গিয়েছিল বলে জানি। দিস ইজ ফার্স্ট টাইম একটা মার্ডার হল । ….ইস, এমন পিসফুল ছোট্ট একটা জায়গায় খুন। ভাবাই যায় না।”
কিকিরা মাথা নাড়লেন।“সত্যি ভাবা যায় না।”
কচিরই যেন অনুশোচনা হচ্ছে। বলল, “আমরা এত কাছে থাকি, ঝিলের গায়ে, কিছুই জানতে পারলাম না ।…জানেন, আমি সাত তাড়াতাড়ি ঘুমোই না । রাত্রে খাওয়াদাওয়া সেরে ঘণ্টাখানেক রেওয়াজ করি। সারাদিন সময় পাই না। রাত্রে রেওয়াজ করা আমার অভ্যেস। সেতারটা নিয়ে বসি। মাঝেসাঝে বাদ যায়। তা আমি যে-ঘরে থাকি তার দক্ষিণের জানলা খুললে ঝিলটা দেখা যায়। এখন শীত পড়ছে। অন্য জানলা বন্ধ থাকলেও দক্ষিণেরটা খোলা থাকে। ঘরের পাশে অমন একটা খুন হয়ে গেল জানতে পারলাম না। সাড়াশব্দ চিৎকার কিছুই শুনলাম না–আশ্চর্য!”
কিকিরা একটু হাসলেন, দুঃখ জানিয়েই বোধ হয় বললেন, “আপনি তো ছিলেন না সেদিন।”
খেয়াল হল কচির। বলল, “তাই তো, আমি তো ছিলামই না।” বলেই একটু অন্যমনস্ক হল। পরে নিজেই বলল, “জানেন আমার মায়ের ঘুম পাতলা। মা বলছিল–সেদিন কেমন একটা ডাক শুনেছে। টিটিয়া পাখির ডাক যেন।”
তারাপদ আর চন্দন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। লোক দেখছিল রাস্তায় । একটা বড় চৌকোনো বাক্সকে চাকা লাগিয়ে ঠেলার মতন করে, ঠেলাগাড়ি বানিয়ে এক কুমোর রাজ্যের হাঁড়ি কলসি মালসা সাজিয়ে মাঠে নেমে গেল ।
কিকিরা কথা বলতে বলতে দু-চারটে জিনিস কিনে নিলেন কচির দোকান থেকে। টাকাপয়সা মেটালেন। “আচ্ছা কচিবাবু, এখনও আপনি রেওয়াজ করছেন তো?”
“হ্যাঁ। কেন?”
“আপনার নজরে আর কি কিছু পড়েছে, পরে?” ভাবল কচি। মাথা নাড়ল। বলল, “না। মানে আমি তো সেভাবে নজর করে বসে থাকি না। কেন বলুন তো?”
“এমনি বললাম।”
“আপনি…আপনার কি মনে হয়…না। থাক গে! আচ্ছা দাদা, আপনি কী? মানে কী করেন?”
“আমি!” হাসলেন কিকিরা। তারাপদদের দেখালেন, বললেন, “ওরা সব কাজকর্ম করে। ওর চাকরি, এর ডাক্তারি। আমি বেকার। বসে বসে দিন কাটাই। ..ভাল কথা, আমার টাকাটা দিয়েছি না?”
