“খেজুরে আলাপ?”
“বলতে পারো। আমি একসময় একটু-আধটু যেতাম ওদিকে। চিৎপুর পাড়ায় রাজুবাবু বলে আমার এক দোস্ত ছিল। তার হাতে দরজি ছিল ভাল ভাল। ম্যাজিশিয়ানরা এক-একজন সাজপোশাকের দিকে খুব নজর দেয়। রাজাগজা সাজে, আরব্য উপন্যাসের শাহাজাদা সাজে, কেউ-বা দেখবে সাজ পালটে চিনে চুং ফুং সাজে। এগুলো খেলা দেখাবার অঙ্গ। সাজের বাহার আলাদা একটা এফেক্ট তৈরি করে, ইলিউশন। কাজেও লাগে। সাজের কেরামতিতেও ম্যাজিক হয়। …তা পাঁজাবাবুর সঙ্গে খেজুরে গল্প করতে করতে আমার মনে হল, দশ আঙুলে ছ-ছ’টা আংটি পরে যে-লোক তার দৈব-ব্যাপারে যথেষ্ট বিশ্বাস আছে।”
“উনি কোনও দৈববাণী করলেন নাকি? মানে বাড়ির সামনে ঝিলে অমন একটা ঘটনা ঘটে গেল..” চন্দন বলল ।
“না। ও রাস্তায় হাঁটতেই চাইলেন না।”
“কেন?”
“তা বলতে পারব না। তবে চাঁদু, ভদ্রলোককে আমার ভাল লাগেনি।“
“কী জন্যে?”
“কী জন্যে! …দেখো, এক-একজন লোক থাকে যাদের দেখলেই তোমার কেমন খারাপ লাগে। চেহারার জন্যে নয়, তাদের মধ্যে এমন কিছু থাকে যা তোমাকে রিজেক্ট করবে, আসলে তুমি তার কাছে ঘেঁষতে চাইবে না। “
তারাপদ বলল, “ক্রিমিন্যাল টাইপের মনে হয়?” কিকিরা একটু ভেবে বললেন, “কোথায় যেন একরকম রোখ আর ধুরন্ধর ভাব আছে।”
“তাহলে গণপতি পাঁজাকে আপনি সন্দেহ করেন?”
“না করে পারছি না।”
“কিন্তু পাঁজাবাবু বয়স্ক লোক। আধবুড়ো। তিনি কী করে অমন জোয়ান গোছের লোককে খুন করবেন?”
“ঠিক কথা। কেমন করে? আর কেনই বা?” কিকিরা বললেন, “আমি তোমাদের মতন ওই কথাগুলো ভেবেছি। ভেবে কোনও উত্তর পাইনি। তবে নিজের হাতে খুন না করেও খুন করানো যায়। খুনে গুণ্ডার কি অভাব আজকাল! টাকা দিলেই তোমার কাজ করে দেবে। তা ছাড়া পাঁজাবাবুর হাতেই তো তাঁর মহাভৈরব আছে। লোকটা দৈত্যবিশেষ।”
তারাপদ চন্দনের দিকে তাকাল। অন্ধকারে মুখ দেখতে পেল না। উপরন্তু একটা হোঁচট খেল।
চামেলিবাবুর বাড়ির কাছে এসে পড়েছিল তারা।
ডাইনে ঘুরে বসত বাড়ির ফটক। ফটক খুলে এগিয়ে যেতে যেতে চন্দন বলল, “ভেতরে গলা পাওয়া যাচ্ছে যেন!”
কিকিরা কান পেতে শুনলেন। তারপর বললেন, “চামেলিবাবু রেডিয়ো শুনছেন! ট্রানজিস্টার।”
.
৷৷ ৬ ৷।
নিজেরই গরজ ছিল শর্মাজির। নয়তো আরও কত দেরি হত কে জানে! মফস্বলের এইসব অঞ্চলে কে কার কড়ি ধারে! বড় কিছু না ঘটলে মাথা ঘামায় না কেউ। দিন ছয়-সাতের মাথায় জানা গেল, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে, ঘটনাটা স্বাভাবিক নয়, পড়ে গিয়ে মাথায় মারাত্মক চোট পেয়ে লোকটি মারা যায়নি। তাকে আহত বা আঘাত করা হয়েছে মাথার পেছন দিকে। অর্থাৎ কোনও ভারী শক্ত জিনিস দিয়ে কেউ লোকটির মাথার পেছনে মেরেছিল। গুরুতর আঘাত অবশ্যই। উদ্দেশ্য সম্ভবত স্পষ্ট, লোকটিকে হত্যা করা।
থানায় বসে কথা হচ্ছিল। শর্মা বললেন, “এ কেস অব মার্ডার।” চন্দন, তারাপদ বা কিকিরা–কেউই আর অবাক হলেন না। একেবারে গোড়ায় যদি একটু সন্দেহ কিংবা দ্বিধা থেকে থাকে–পরে যত দিন গিয়েছে তাদের আর দ্বিধা ছিল না। তবু, যতক্ষণ না কাগজে-কলমে বলা হয়, ওটা দুর্ঘটনা নয়–হত্যাই–ততক্ষণ জোর করে বলা যাবে না একটা কথাও, আইনত।
“লোকটি কে–তা কিন্তু জানা গেল না,” কিকিরা বললেন।
“না। আইডেন্টিফিকেশন হল না। চেষ্টা করেছিলাম রায়সাহেব, সাকসেসফুল হলাম না। লাশ একেবারে পচে গিয়েছিল। সদরে মর্গের নামে
যে বাড়িটা পড়ে আছে সেখানে কুত্তা পর্যন্ত ঢুকতে চায় না। সো হরি কন্ডিশন। আমি গিরিবাবার ধরমশালার মুটিয়াকে নিজে টাকাপয়সা দিয়ে থানার লোক সঙ্গে দিয়ে সদরে পাঠালাম। ওই যে সাধুজি ভেগে পড়ল ওহি লোক আর ওই আদমি আগর একই হয়! তো মুটিয়া মর্গে গেল না। পালিয়ে এল। ভয়ে। বিমারি হয়ে গেল ব্যাটার।”
“লাশের কী হল?”
“যা হয়!”
কিকিরা অনুমান করে নিলেন, বেওয়ারিশ লাশ পুড়িয়ে ফেলেছে ওরা।
কথাবার্তা শেষ হওয়ার পর কিকিরারা উঠে পড়ছিলেন, শর্মাজি বললেন, তিনি পুলিশের ক’ বছরের চাকরিতে মারদাঙ্গা, গোলমাল এমনকি ছোটখাটো লুটের কেসও ঘেঁটেছেন, খুনখারাপির ঘটনা নিয়ে তাঁকে মাথা ঘামাতে হয়নি। এই প্রথম। “এক্সপিরিয়ান্স ছিল না রায়সাহাব, ডিফিট খেয়ে গেলাম। কিন্তু একটা কথা জানবেন, অফিশিয়ালি এই কেসটায় আমি মার খেয়ে গেলেও আনঅফিশিয়ালি আমি ব্যাক আউট করছি না।”
কিকিরা উঠে পড়লেন। বললেন, “ঠিক কথা, শমজি। আপনি নিশ্চয় চেষ্টা করবেন দোষীকে খুঁজে বার করতে।” বলে দু পা এগিয়েই হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন, “একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“জরুর।”
“আপনি যে টর্চটা সেদিন কুড়িয়ে এনেছিলেন স্পট থেকে–সেটা কোথায়?”
“আমার কাছে। টর্চ, চাদ্দর, চামেলিবাবুর দেওয়া চেন তাবিজ…” বলে ইশারায় নিজের ঘরের আলমারি দেখালেন। “আন্ডার লক অ্যান্ড কী। প্যাকেট করে রাখা আছে। সিল করে।”
“টর্চটা আপনার হাতে প্রথম এসেছিল। আপনি ভাল করে দেখেছিলেন। সার, ভেতরে কোনও কিছুই ছিল না! একেবারে খালি?”
“বিলকুল।…আপনিও তো দেখেছেন?”
“টর্চটায়–মানে টর্চের মুখে তখন বালব ছিল?”
“বালব আছে।”
“অবাক ব্যাপার! কিছু বোঝা যায় না। …চলি শর্মাজি।”
থানা থেকে বেরিয়ে কিকিরা বাজারের দিকেই হাঁটতে লাগলেন। বাজার বলতে যা বোঝায় সাধারণত তার সঙ্গে মিল নেই। মেঠো জমি, গাছ, ঢিবি, আশেপাশে কয়েকটা দোকান, মাঝখানে রেল স্টেশনের রাস্তা। রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে দু’পাশে পাকা আধপাকা এমনকি নিছক খাপরার চালার তলায় ছোটখাটো দোকান। মুদিখানা থেকে আয়ুর্বেদ ওষুধের দোকান, মনিহারি থেকে পান সিগারেট-সবই। রাস্তার পাশে বাজারও বসে শাকসবজির। চার-ছয় দোকানি। এখানে হাট বসে রবিবার, সেদিন হাটতলায় বিস্তর দোকানি এসেছে।
