চন্দন মাথা নেড়ে সায় দিল।
কিকিরা বললেন, “আমার হিসেব ধরলে বলতে হবে, এখানে যা ঘটেছে তার পেছনে একটা অঙ্ক আছে। মানে কোনওরকম প্ল্যান। পরিকল্পনা।”
“কেমন প্ল্যান?” তারাপদ বলল।
“সঠিক বলা মুশকিল। মনে হয়, দুটো পার্টিই এখানে হাজির হয়েছিল। একটা পার্টি কোনও মতলব নিয়ে এসেছিল, আর-একটা পার্টি হাজির হয়েছিল–কী বলব বুঝতে পারছি না, বোধ হয় কোনও লেনদেন মিটিয়ে ফেলতে!”
চন্দন মাথা নেড়ে বলল, “তা নাও হতে পারে। ধরুন, একজন ক্রিমিন্যাল অন্য এক ক্রিমিন্যালকে ফলো করে এখানে এসেছিল। উদ্দেশ্য একটাই। হয় এ ওকে মারবে, না হয় ও একে মারবে।”
হাঁটতে হাঁটতে আলপথের কাছে এসে পড়ল তিনজনে। টর্চ জ্বলছে। এই পথ ধরে ঝিল পেরোলেই মেঠো পথ। তারপরই চামেলিবাবুর বাগান।
চাঁদের আলোর অতি অস্পষ্ট আভাটুকুও আর নেই। তারার আলোয় অন্ধকার ঝিল যেন ঘুমিয়ে আছে। ঘটনা ঘটার পরের দিন থেকেই ঝিলটা যেন লোকের দেখার বস্তু হয়ে উঠেছে। লোকে আসে যায়, আর তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখে।
কিকিরা বললেন, “তা বলতে পারো। …দুই রথীর লড়াই।”
“রথী বলবেন না সার,” তারাপদ বলল, “দুই ক্রিমিন্যালের লড়াই।”
“যাক গে,” কিকিরা বললেন, “লড়াইটা তো এখানে অন্য কোথাও হতে পারত। এমন ফাঁকা জায়গা, বিস্তর মাঠঘাট, চাই কী ঝোঁপজঙ্গলও কম নেই। এত ফাঁকা জায়গা থাকতে ওরা এই ঝিলের ধারে কেন?”
“আপনিই বলুন!”
“আমি একটা কথাই বলব । আগেই বলেছি। চামেলিবাবুর বাগান থেকে আমাদের বাড়ির দিকে যাওয়ার এটাই একমাত্র শর্টকাট রাস্তা। “
“কিন্তু আমরা তো কোনও পক্ষ নই এখানে।”
“আমরা নই। কিন্তু এক পক্ষ নিশ্চয়ই এদিকে থাকে, চামেলিবাবুর বাগানের দিকে?”
“সে কে?”
“খোঁজ করছি। ভাবছি। …আমি একটু-আধটু আলাপ জমাবার চেষ্টা করি সকলের সঙ্গে।“
“চামেলিবাবুকে কেমন মনে হয়?”
“সন্দেহ করতে পারো। তবে কারণ খুঁজে পাচ্ছি না।”
“শীতলবাবু?”
“না। বেচারি বুড়ো মানুষ। নিরীহ। হোমিওপ্যাথি প্লাস কবিরাজি করেন। ওঁকে বাদ দাও।”
“কচি, মানে কাঞ্চন?”
“সন্দেহ করতে পারো। কিন্তু কচির কী স্বার্থ?”
“তা ছাড়া সেদিন তো সে রাত্রে এখানে ছিল না।”
“এটা কোনও প্রমাণ নয়। ধোপে না টিকতে পারে। ইচ্ছে করলে, আমরা সবাই একটা চাতুরি বা ছল করতে পারি। থেকেও থাকি না, না থেকেও থাকি। বুদ্ধিমান ক্রিমিন্যালরা খুব ভাল অ্যালিবাই বানাতে পারে। যাক গে কচিকে আমি বাদ দিতে পারি । ওর কোনও স্বার্থ দেখতে পাচ্ছি না।”
আলপথের মাঝামাঝি এসে দাঁড়ালেন কিকিরা। টর্চের আলো ফেলে ঝিলটা দেখলেন।
শীতের বাতাস এল মাঠ থেকে। ঝিলের জোলো ঠাণ্ডাও এখানে।
চন্দন পা বাড়াল। “আর কে থাকল তাহলে?”
তারাপদ বলল, “মাখনলাল দত্ত, কলকাতার এক ছাপাখানার ম্যানেজার । স্ত্রী আর ছেলে নিয়ে এসেছেন। ছেলেটা ছোট। বছর বারো বয়েস।”
চন্দন বলল, “বাজারে দেখেছি। আলাপও হয়েছে। বয়েস চল্লিশ-বিয়াল্লিশ হবে। হাঁপানির রোগী। সাধারণ ভদ্রলোক। মনে হয়, কলকাতার পৈতৃক বাড়িটাই ওঁর সম্পদ। প্রেস-ম্যানেজারি করে যা পান সেটা বোধ হয় বিরাট কিছু
নয়। “
তারাপদ বলল, “ওঁকে বাদ দেওয়া যায়। “
কিকিরা আপত্তি করলেন না।
“ওই ছেলে দুটো সম্পর্কে সার কী বলেন?” চন্দন বলল।
কিকিরা বললেন, “ওই পল্লব মুখার্জি আর লাডলি–”
“লাডলি হকি প্লেয়ার ছিল।”
“আলাপ হয়েছে?”
“না।”
“আপাতত সন্দেহ যাচ্ছে না। “
“ওদের মোটরসাইকেল তো থানায় আটক পড়েছে সার। আপনি শর্মাজিকে নজর রাখতে বললেন। আর শর্মা একটা ছুতো করে বাইক আটক করে রাখলেন।”
কিকিরা মুচকি হাসলেন, “কার গোরুর গাড়িতে ধাক্কা মেরে একটা গোরুর পা জখম করে দিয়েছে ওরা.”
“পুলিশ সবই পারে।”
“ছোকরা দুটো সুবিধের হলে ভাল!” কিকিরা বললেন, “শর্মা ওদের একটু বাজিয়ে দেখতে চায় ।” আলপথের প্রায় শেষে এসে পড়েছেন কিকিরারা। সামনের মেঠো রাস্তার গা ঘেঁষেই এদিক-ওদিক ছড়ানো গোটা পাঁচেক বাড়ি । শীতলবাবু, চিনুরা থাকে একপাশে। অন্য দিকে চামেলিবাবুর ভাড়া-দেওয়া তিন বাড়িতে তিন ভাড়াটে। লণ্ঠনের সামান্য আলো দেখা যাচ্ছিল বাড়িগুলোতে। কিকিরা বললেন, “শর্মা কি তোমাদের বলেনি?”
“কী বলবেন?”
“ছোকরা দু’জন সম্পর্কে খোঁজ করতে লোক পাঠিয়েছে ওদের ঠিকানায়। ওরা জেনুইন, না, জাল?”
“মানে?”
“মোটরবাইকটার রেজিস্ট্রেশন নাম্বার গোলমেলে। অন্য স্টেটের।”
চন্দন অবাক হল । খেয়াল করেনি অতটা। মোটরবাইকটা দেখেছে। বাজারেই দেখেছিল একদিন। কে আর খেয়াল করে বাইকের নম্বর দেখবে!
তারাপদ বলল, “সার, এ তো দেখছি–জট পাকিয়েই যাচ্ছে পর পর। তা ওই আরেক জন–ওঁর সম্পর্কে?”
“কে? পাঁজামশাই! গণপতি পাঁজা!”
“হ্যাঁ, পেটের রোগী? আলসার পেশেন্ট! থিয়েটার যাত্রার ড্রেস ডিজাইনার অ্যান্ড মেকার। চিৎপুরে দোকান! আমি তো ভদ্রলোককে একদিনই দেখেছি। আপনি দেখেছেন?”
“দেখেছি। …আমার বাপু একটু ঘোরাফেরা স্বভাব। তোমরা যাও সকালে বাজারে বেড়াতে আমি আমাদের বড় রাস্তা ধরে খানিকটা ওয়াকিং করি।”
“আসলে আপনি ঝিলের গা বরাবর বড় রাস্তাটা ধরে হাঁটেন, তারাপদ ঠাট্টা করে বলল, “চোরের মন বোঁচকার দিকে।”
কিকিরা মুচকি হাসলেন। দেখা গেল না। টর্চের আলো পায়ের সামনে দোলাতে দোলাতে কিকিরা বললেন, “গতকালই পাঁজামশাইয়ের সঙ্গে খানিক আলাপ করলাম রাস্তার মধ্যে। আগেও মুখ-চেনা করেছি।”
