গতকাল থানার শমজির লোক খোঁজাখুজি করে বেড়িয়েছে এখান-ওখান, ডেকে এনেছে অনেককেই থানায়, কেউ যদি কোনও হদিস দিতে পারে মৃত মানুষটির। পারেনি কেউ। আজই সকালে প্রথমে জানা গেল গিরিবাবার ধর্মশালার কথা। খবরটা রটে যাওয়ার জন্যই হোক কিংবা পুলিশের পোষা এই ইনফরমারের মুখে শমজি ধর্মশালার কথা শুনলেন। শুনেই ছুটেছিলেন নিজে ধর্মশালায়। খোঁজ নিলেন। কথাটা ঠিকই। এসেছিল একজন সামান্য বেলার দিকে। সারাদিন ছিল, তারপর রাত্রে সে উধাও।..
কিকিরা বললেন, “সেই সাধুই যে ওই ভদ্রলোক, তার প্রমাণ কী?”
“এমনিতে কোনও প্রমাণ নেই। ডেডবডি বিকেলে সদরে চালান হয়ে গিয়েছে। ধর্মশালার লোক এসে আইডেন্টিফাই করবে তার উপায় নেই।”
“তবে?”
“শর্মাজি রেলস্টেশনের টিকিট কালেক্টারের কাছে খোঁজ করে জেনেছেন–এক সাধু বাস্তবিকই এসেছিল। তার কাছ থেকে টিকিটও কালেক্ট করেছেন টি.সি। গুপ্তা বলে একজন তখন ডিউটিতে ছিলেন। তিনি বলেছেন, সাধুর মুখ তিনি দেখেছেন। দাড়ি ছিল, মাথা ভরতি রুক্ষ চুল। ঘাড় পর্যন্ত। গায়ে গেরুয়া আলখাল্লা। কাঁধে এক ঝোলা।”
চামেলিবাবু বললেন, “দাড়িঅলা গেরুয়া আলখাল্লা পরা এক সাধু আর ওই লোকটা–যে মারা গিয়েছে–দু’জনে এক হয় কেমন করে?”
তারাপদ বলল, “ব্যাপারটা এখানেই মিলছে না। গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।”
“শর্মাজির সঙ্গে তোমাদের দেখা হয়েছে বুঝি?” কিকিরা জানতে চাইলেন।
“খানিকটা আগেই হয়েছে, বাজারে।” তারাপদ বলল, “তিনিই বললেন ব্যাপারটা।”
কিকিরা তখন আর কিছু বললেন না। না বলে চামেলিবাবুর দিকে তাকালেন।
চামেলিবাবু ইঙ্গিতটা বুঝলেন। বুঝে রুপোর তাবিজ বা লকেটটা দেখালেন তারাপদদের। “এটাও আজ সকালে আমি পেয়েছি। ঘটনাটা যেখানে ঘটেছে তার কাছাকাছি এক ঝোঁপের কাছে।”
.
॥ ৫ ॥
দুটো দিন কাটল ।
সদর থেকে কোনও খবর এসে পৌঁছল না। না আসাই স্বাভাবিক। বড়-বড় শহরে, যেখানে হাসপাতাল মর্গ পোস্টমর্টেম করার সব ব্যবস্থাই আছে–সেখানেও রাতারাতি কিছু হয় না। যথেষ্ট কাঠখড় পোড়ালেও অন্তত দুটো দিন তো কিছুই নয়, রিপোর্ট পেতে চার-পাঁচদিনও লেগে যায়। আর এ তো নেহাতই এই ছোট মফস্বল আধা-শহর, এখানে একটা বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া গেলে তার বৃত্তান্ত জানতে সময় তো লাগবেই।
শর্মাজির দোষ নেই। তিনি আর কী করবেন!
সেদিন তারাপদ কিকিরাকে বলল, “সার, কলকাতা হলে..”
চন্দন বিরক্ত হল। বলল, “বাজে বকিস না। কলকাতা হলে রাতারাতি সব হয়ে যায়, তোর ধারণা। কলকাতায় থাকিস, কাগজ পড়িস না! লাশ খোঁজ করতেই ক’দিন যায় দেখিসনি! একটা চুরি ডাকাতি, দিনের আলোয় মাড়ার–এসব নিত্যকার জিনিস ধরতে মাস কাবার হয়ে যায়–যায় না?”
তারাপদ হাসল। “খেপে যাস না! এমনি বলছিলাম…!”
চন্দন নীলচে রঙের পুলওভারটা গায়ে গলিয়ে নিল। এখন সন্ধে। আজ তারা চামেলিবাবুর বাড়িতে রাত্রে খেতে যাবে। গতকাল হয়ে ওঠেনি। অসুবিধে ছিল চামেলিবাবুর। দিন পালটে নিয়েছিলেন।
কিকিরার শরীর এখন ভাল। গোড়ার দিকে ঝপ করে নতুন জল-হাওয়ায় যে সর্দিজ্বর মতন হয়েছিল, চন্দনের ডাক্তারিতে তা সেরে গিয়েছে। তবু কিকিরা সাবধানী। জোব্বা চাপিয়েছেন গায়ে, গলায় মাফলার, মাথায় কাশ্মীরি টুপি।
যাদবচন্দ্র কাজ সেরে চলে গিয়েছে বিকেলের শেষে।
তারাপদও তৈরি।
“তাহলে চলো, বেরনো যাক,” কিকিরা বললেন।
“চলুন।”
“ঘরে তালাটালা দিয়ে নাও। একটা লণ্ঠন জ্বলুক। যাওয়ার সময় ওই বিরজুমিস্ত্রিকে বলে যাবে, একটু যেন নজর রাখে এ দিকে।”
.
সামান্য পরেই তিনজনে বেরিয়ে পড়ল।
তারাপদ আর কিকিরার হাতে টর্চ। চন্দন আর অনর্থক আলো নেয়নি।
কৃষ্ণপক্ষ শেষ হয়ে শুক্লপক্ষ পড়েছে। আকাশ ভরতি তারা। চাঁদের আলো যেটুকু ফুটেছিল সন্ধের আগে, এখন আর চোখে পড়ে না। শীত এসে গেল।
টর্চের আলোয় পথ দেখে এগোতে এগোতে কিকিরা বললেন, “দেখো চাঁদু, আমরা এখানে এসেছি বেড়াতে। লিভার-টনিক, মানে এখানকার জল দু’-চার গ্লাস খাচ্ছি রোজ, হাঁটছি দু’বেলা অল্পবিস্তর। নট ব্যাড। তা বলে এখানে কোনও খুনখারাপি হলে ওটা আমাদের জানার কথা নয়। চোরছ্যাঁচড়, ধান্দাবাজ, চিট, নচ্ছার লোকজনকে পাকড়াও করার বেশি মুরোদ আমাদের নেই। বৃথা গোঁফ ফুলিয়ে লাভ কী! এই যে একটা লোক হুট করে মারা গেল। বা তাকে মারা হল–আমরা ও নিয়ে মাথা ঘামাতে গেলে ব্রেন শুকিয়ে। যাবে। খুনটুন আমাদের ধাতে পোষায় না। এসব পুলিশের কাজ। নয় কী?”
চন্দন কিছু বলার আগেই তারাপদ খোঁচা মেরেই যেন বলল, “মাথা আর কে ঘামাচ্ছে! আপনিই বরং রোজ দাবার চাল দেওয়ার মতন মুখ করে ব্যাপারটা নিয়ে…”
“আবার ব্যাপার! তোমার সব কিছুতেই ব্যাপার!”
“আপনি মাথা ঘামাচ্ছেন না?”
“না । যাকে মাথা ঘামানো বলে–তেমন করে মাথা ঘামাইনি তারাবাবু! কেননা আমার মাথায় এসব ঢোকে না। …তবে!”
“কী তবে?”
“আমার কাছে অবাক অবাক লাগে! ভেরি স্ট্রেঞ্জ! অনর্থক একটা খুন হবে কেন?”
“কেন?”
“কেন?” কিকিরা ধীরে ধীরে বললেন, খানিকটা অগোছালো গলায়, “একে একে বলি তাহলে! …প্রথমে আমার কেমন এক ধোঁকা লাগে যখন ভাবি, হরবখত যেসব জায়গায় খুনটুন হয়, মানে ক্রাইম জিনিসটা ডালভাত হয়ে গিয়েছে যেখানে-সেখানে এসব জিনিস মানিয়ে যায়। এখানে মানায় না। শান্ত সুন্দর একটা নিঝুম জায়গা হাবিলগঞ্জ। ক্রিমিনালদের আস্তানা এটা নয়। এখানে বড়জোর দু’-একটা গাঁইয়া লাঠালাঠি হতে পারে। সেটা মানায়। খুন এখানে মানায় না। অবশ্য যদি এই ঘটনাটাকে মার্ডার কেস হিসেবে ধরা হয়। অ্যাকসিডেন্ট কেস হলে বলার কিছু নেই! কি চাঁদু, আমি রাইট কি না! অ্যাম আই রাইট সার?
