কিকিরা চলে গেলেন।
চামেলিবাবু হাতের লাঠিটা কোলের পাশ থেকে সরিয়ে মাটিতে রাখলেন। এই বাড়িটা তাঁর নয়। দাসবাবুর। দাসবাবু মারা গিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী থাকেন আদায়, আশ্রমে। গুরুমায়ের কাছে। বিধবার সম্পত্তির জিম্মাদার এখন চামেলিবাবু। বাড়িটা ভাড়া খাঁটিয়ে বছরে যা পান, আদরায় পাঠিয়ে দেন চামেলিবাবু।
সকালটা চমৎকার গাঢ় হয়ে আসছিল। রোদে তাত ফুটছে। কোথায় যেন একটা রোড রোলার চলতে শুরু করল। কাছেই একটা রোলার পড়ে আছে বছর কয়েক ধরে, মাঝে মাঝে তার বুঝি ঘুম ভাঙে।
কিকিরা এলেন। হাতে চায়ের মগ।
“নিন। দুধ কম। যাদবচন্দ্র না এলে দুধ আসে না।”
“ও ঠিক আছে । অকারণ আপনি ব্যস্ত হলেন।”
“আমি অকম্ম নই, চামেলিবাবু! চা তো কিছুই নয়, কুকিংয়ে আমি আপনার খেপা যদুর কান কেটে দিতে পারি। ভেরি গুড কুক, সার। একদিন আপনাকে খাইয়ে সার্টিফিকেট নেব।” হাসতে লাগলেন কিকিরা। “হোটেলে চাকরি পেয়ে যেতে পারি।”
চামেলিবাবু চায়ে চুমুক দিলেন। হেসে বললেন, “বাঃ।”
“যা বলছিলাম সার । আপনি এই হাতে-পরা লকেটটা ঠিক কোথায় পেয়েছেন? মানে, যে-পাথরের কাছে লোকটি মরে পড়ে ছিল সেখান থেকে কতটা দূরে?”
“ক-ত-টা!…তা ধরুন, কতটা হবে, আন্দাজে বলতে হলে বলতে হয়, বিশ-পঁচিশ গজ দূরে।”
“বেশি দূরে নয় তবে!”
“না না। যদি আপনি ভাল করে নজর করেন, ওখানে মাটিতে টানাহেঁচড়ানির দাগও দেখতে পাবেন।”
“দেখেছি। তবে স্পষ্ট নয়।” কিকিরা বললেন, “ওখানকার মাটি শক্ত। ভিজে হলে দাগ ধরা যেত। কিন্তু…! আচ্ছা চামেলিবাবু, আপনার কি মনে হয় লোকটিকে আচমকা কেউ বা কারা অ্যাটাক করেছিল?”
“আমার তাই ধারণা। … আর এটাও মনে হয় আমার, লোকটার সঙ্গে হাতাহাতিও হয়েছিল। ও যা লোক, কোমরে ড্যাগারের খাপ, সে যে একেবারে ন্যাড়া হয়ে হাত-পা এলিয়ে দেবে তা আমার মনে হয় না। ফাইট একটা হয়েছিল।”
কিকিরা কিছু বললেন না, চা খেতে খেতে মাথা নাড়লেন। চামেলিবাবু চায়ের মগ নামিয়ে রেখে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট দেশলাই বার করলেন। “কাল কী তিথি ছিল জানেন?”
“অন্ধকার ছিল।”
“কৃষ্ণপক্ষ চতুর্দশী। আজ অমাবস্যা। ঘোর অন্ধকার ছিল কাল।”
“ওই অবস্থায় একটা নোক কেমন করে ঝিলের গায়ের আলপথ ধরে আসে, মশাই?”
“টর্চ নিয়ে এসেছিল। দেখেছেন তো আপনি। শর্মা টর্চটা পেয়েছে কাছেই।”
“দেখেছি। বড় টর্চ। তিন সেলের।”
“তবে?”
“কিন্তু টর্চটা ফাঁকা কেন? সেলগুলো কোথায় গেল! অবাক ব্যাপার নয়?” চামেলিবাবু মাথা নাড়লেন। তিনি কোনও জবাব দিতে পারলেন না। শেষে বললেন, “ব্যাটারিগুলো বার করে নিয়েছে।”
“কেন? কে নিয়েছে? কারা?” কিকিরার চোখ হঠাৎ ঝকঝকে হয়ে উঠল। এই একটা কথা তিনি প্রথম থেকে ভাবছেন। তাঁর কাছে এটাই যেন সবচেয়ে অদ্ভুত মনে হচ্ছিল। গতকাল রাত্রে তারাপদ আর চন্দনের সঙ্গে অনেক গবেষণা করেছেন বিচিত্র এই কাণ্ডটা নিয়ে। এ টর্চ উইদাউট ব্যাটারি কেন? চন্দনরা কোনও জবাব দিতে পারেনি। টর্চটা সত্যিই রহস্যের বস্তু। তা ছাড়া থানায় শর্মার কাছ থেকে টর্চটা চেয়ে নিয়েও দেখেছেন কিকিরা। মামুলি বাজারি টর্চ বলেই মনে হয়েছে। ভেতরে ফাঁকা।
দু’জনেই তখন চুপচাপ। হঠাৎ চোখে পড়ল, তারাপদরা আসছে। তারাপদ চন্দন খেপা যদু। যদুর হাতে বাজারের ব্যাগ।
“ওরা আসছে,” কিকিরা বললেন।
চামেলিবাবু বললেন, “তাবিজ লকেটটার কী হবে?”
“শর্মার হাতে তুলে দেওয়াই উচিত।”
চামেলিবাবু ঘাড় নাড়লেন। “আমিও তাই ভাবছিলাম। যার যা কাজ …!”
তারাপদরা কাছে চলে এসেছে।
খেপা যদুর হাতে বাজারের ব্যাগ। চন্দনের হাতেও একটা প্লাস্টিকের বাস্কেট।
ওরা কাছে এলে চামেলিবাবুর সঙ্গে আলাদা কথা হল দু’-চারটে।
বাজারের ব্যাগ তুলে নিয়ে যদু রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
তারাপদ সামান্য উত্তেজিত গলায় বলল কিকিরাকে, “একটা নিউজ আছে, সার?”
“কী নিউজ?”
চামেলিবাবুর দিকে তাকাল তারাপদ। “এখানে একটা ধর্মশালা আছে?”
চামেলিবাবু যেন প্রথমটায় খেয়াল করতে পারেননি। পরে বললেন, “ধর্মশালা! গিরিবাবার আখড়া। লোকে বলে বটে ধর্মশালা! কেন?”
“স্টেশন থেকে আধ মাইলটাক তফাতে। বিচলি গাঁওয়ের …”
“ওটা ঠিক ধর্মশালা নয়,” চামেলিবাবু বললেন, বলে হাত তুলে একটা দিক দেখালেন। “ওদিকে ছোট গাঁ আছে একটা, কয়েকটা মাত্র ঘর, লোকে বলে বিচলি গাঁও। ওপাশে ঝোঁপজঙ্গল শুরু হয়ে গিয়েছে। আমলকী গাছ আর মহুয়া ঝোঁপ। গিরিবাবা বলে এক সাধু ওখানে একসময়ে একটা চালা বেঁধেছিল। আশ্রম করেছিল। থাকত দু-চারজন চেলাচামুণ্ডা। গিরিবাবা অনেকদিন হল গত হয়েছে। ওখানে লোকজন বিশেষ থাকে বলে শুনিনি। তবে কখনও কখনও এক-আধজন সাধুটাধু জুটে যায়। চলেও যায় দু-চারদিন থাকার পর …। তা সেখানে” ।
“সেখান থেকেই একটা লোক উধাও হয়েছে, তারাপদ বলল।
“মানে?” কিকিরা বললেন। “উধাও হয়েছে মানেটা কী! ওটা কি বাসাবাড়ি, না হোটেল–যে একটা লোক আজ ছিল–কাল উধাও।”
চন্দন বুঝতে পারল, তারাপদ ব্যাপারটা ঠিক গুছিয়ে বলতে পারেনি। স্পষ্ট করে না বললে সত্যিই ধরা মুশকিল ঘটনাটা। চন্দন এবার বুঝিয়ে বলল ব্যাপারটা।
গিরিবাবার আশ্রমই হোক আর ধর্মশালাই হোক, যে দু-তিন জন পড়ে আছে। সেখানে, তারা সাদামাটা গেঁয়ো সাধু, নিজের মনে থাকে, কাজকর্ম সারে আশ্রমের, সকাল-সন্ধে ঘণ্টা বাজায় মন্দিরের, বাগান যেটুকু আছে দেখাশোনা করে। কোনও পথভোলা সাধুসন্ন্যাসী এখানে এসে পড়লে মাথা গোঁজার ঠাঁই পায়। নিজেই নিজের মতন করে দুটো রুটি-চাপাটি করে খেয়ে নাও, কুয়োর জল রয়েছে স্নান করো, ময়লা কাপড় কেচে নাও। শোওয়ার জন্য মাটি, দু-চার আঁটি খড়ও জুটে যেতে পারে। তা গত দিন দুই আগে এক সাধুজি এসে হাজির, বেলার দিকে। বিকেলেও ছিল সে। সন্ধেবেলাতেও তাকে দেখা গিয়েছে। পরের দিন ভোর থেকে আর নয়। কিছু ফেলে যায়নি সে, নেহাতই একটা দেশলাইয়ের খাপ আর বিড়ির টুকরো ছাড়া। যাওয়ার আগে কাউকে কিছু বলে যায়নি, তাকে চলে যেতে দেখেওনি কেউ।
