“কীরকম?”
“এ তো ছোট জায়গা। গাঁ গ্রামের দেহাতিরা অনবরত আসছে যাচ্ছে ওই রাস্তা দিয়ে। তার ওপর ডেডবডিটা সারাদিন পড়ে ছিল থানার সামনে। শর্মার হুকুমে লোকজনও কম ধরে আনা হয়নি লোকটাকে আইডেন্টিফাই করতে।…”
“হ্যাঁ! কিছু পাওয়া গেল! মানে কোনও খোঁজ?”
“না।”
“এখানে আসার ব্যবস্থা বলতে তো শুধু ট্রেন?”
“ট্রেন। আর অন্য ব্যবস্থা হল ট্রেকার। ট্রেকার মাত্র একটা। তাও সেটা ঝুমুরিয়ার মোড় থেকে আসে। হাটের দিন ছাড়া ট্রেকারে লোক পাওয়া যায়। না। “
“ট্রেকারে লোকটি আসেনি। শর্মা খোঁজ নিয়েছে।”
“ট্রেনেই এসেছে,” চামেলিবাবু বললেন। “ট্রেকারে নয়।”
“আসুন বসা যাক,” কিকিরা বারান্দার দিকে এগুলেন। “ট্রেনে এসেছে তা না মেনে উপায় নেই আপাতত! কিন্তু কেমন ভাবে এল! শর্মা বলছে, টিকিট কালেক্টার স্টেশনের খালাসি–কেউ ওকে দেখেনি নামতে।”
“না পারতে পারে। এখানে ট্রেন কমই আসে। দুটো প্যাসেঞ্জার, একটা বেলা দশটা নাগাদ, একটা বিকেলে। এক্সপ্রেস গাড়ি একটা। বাকি সব মালগাড়ি। . অ্যাাঁ, কোনও প্যাসেঞ্জার নামলে–দেহাতি যদি না হয়, বিশেষ করে কোনও নতুন বাঙালি ভদ্রলোক-স্টেশনের লোকের নজরে পড়ে। সেটা আমি মানছি। কিন্তু ভুল তো হয়। তা ছাড়া ধরুন কামরার উলটোদিক থেকে নেমে রেললাইন ধরে এগিয়ে তেঁতুলতলার আড়ালে চলে গেল। কে দেখবে! এখানে দেহাতিদের সে-অভ্যেসও আছে। টিকিট কাটে না। পেছন দিয়ে পালায়।”
কিকিরা কথাটা শুনলেন। আগে শোনেননি। তবে কামরার পেছন-দরজা দিয়ে নেমে পালানোর কথা নতুন কী! এ তো সর্বত্রই হয়।
“বসুন।”
চামেলিবাবু বসলেন কাঠের চেয়ারে।
“একটু চা করি?” কিকিরা বললেন।
“না না, আপনি কেন? ওরা কোথায়?”
“স্টেশনে বাজারের কাছে গিয়েছে। যদি মাছ পায় …”
“মাছ! আরে ওদের বলুন খেপাকে পুটলির কাছে যেতে । পুটলি ব্যবস্থা করে দেবে। আমি আবার মাছ-মাংস খাই না। ভাল কথা, কাল রাত্রে আমার ওখানে আসুন আপনারা। দুটো মুখে দেবেন।”
“পরশুদিনই তো খেলাম ..”
“খেলেন কোথায়! নতুন এলেন, দু-চারটে শাকসবজি পাঠিয়েছিলাম।”
প্রসঙ্গটা পালটে নিলেন কিকিরা। বললেন, “আপনি বলছেন লোকটি ট্রেনে এসেছিল। এসে লুকিয়ে গা-ঢাকা দিয়ে স্টেশন ছেড়ে পালিয়েছিল!”
“তা নয়তো আর কী হবে, আপনি বলুন?”
“বেশ, আপনার কথাই মানলাম। কিন্তু একজন ভদ্রলোক এমন কাজ করবে কেন? উদ্দেশ্য কী? মোটিভ?”
“তা বলতে পারব না,” চামেলিবাবু মাথা নাড়লেন। “আপনি তো দেখেছেন লোকটির কোমরে বেল্ট ছিল। ভোজালির খাপ…। লোকটিকে কি খুব নিরীহ মনে হয়! আমার তো হয় না।”
কিকিরা বললেন, “তা বলতে পারেন। … তবে এটাও ভাবতে হবে, ওটা ছিল কেন? আত্মরক্ষার জন্যে, না, কাউকে ঘায়েল করার জন্যে? যে-কোনও অস্ত্র দু’কারণেই ব্যবহার করা যায়? নয় কী?”
চামেলিবাবু মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, “আপনাকে একটা জিনিস দেখাই। আজ এখানে আসার সময় আমি ঝিলপারের পথটা ভাল করে দেখতে দেখতে এসেছি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি চারপাশ। একটা জিনিসও পেয়েছি।”
কিকিরা তাকিয়ে থাকলেন। কৌতূহল বোধ করছিলেন।
চামেলিবাবু বললেন, “আপনি তো দেখেছেন ওই পথটার এখানে ওখানে ছোট ছোট ঝোঁপঝাড়, বুনো লতা- কত কী! আজ আমি কেমন ইচ্ছে করেই সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলাম! ভাবছিলাম, লোকটাকে যদি আড়াল থেকে লুকিয়ে কেউ মেরেই থাকে তবে একটুও ধস্তাধস্তি হবে না? যাই বলুন লোকটা দুবলাপাতলা নয়। ওকে দেখলে বোঝা যায় গায়ে ক্ষমতাও আছে খানিকটা। একেবারে বেটপ্পা-মানে আচমকা মার খেলাম আর ধড়াস করে পড়ে মরে গেলাম, তেমন মানুষ ও নয়। ঠিক কী না, বলুন?”
কিকিরা বললেন, “তা ঠিক। … আপনি একটু বসুন। আমি দু’ কাপ চায়ের জল চড়িয়ে আসি। শুধু মুখে কথা হয় না।” বলে একটু হেসে কিকিরা রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।
সামান্য পরে ফিরে এসে কিকিরা বললেন, “জিনিসটা কী বললেন না?”
“আমি একটা তাবিজ লকেট পেয়েছি।” বলে জামার পকেট থেকে এক তাবিজের লকেট বার করে দেখালেন। হাতে বাঁধা থাকে এই ধরনের তাবিজ।
দেখলেন কিকিরা । সাধারণ জিনিস। রুপোর চেনে আটকানো রুপোর লকেট বা তাবিজতক্তি। পরে অনেকেই। ওর মধ্যে কী আর থাকতে পারে? কোনও ঠাকুর দেবতার পুজো দেওয়া শুকনো ফুলপাতা, কিংবা শেকড়-বাকড়, দৈব কিছুও হতে পারে।
“দেখি,” হাত বাড়ালেন কিকিরা ।
চামেলিবাবু জিনিসটা এগিয়ে দিলেন।
রুপোর লকেটটা বাহারি। গোল বা চৌকো নয়, গাছের পাতার ধরন–মানে পাতলা চ্যাপটা, ওপর-নীচে মানানসই করে ছড়ানো। লকেটের চেন ছিঁড়ে গিয়েছে। একটা আংটা ভাঙা। অন্যটার গায়ে একরত্তি চেন ঝুলে আছে।
না, রুপোর লকেটের ওপর কোনও নাম লেখা নেই। থাকে অনেক সময়, যেমন ‘অমূল্য’ ‘সলিল’ বা বেশ নকশা করে একটা অক্ষর ‘র’ ‘ফ’ অথবা ‘ইংরিজিতে ‘পি’ ‘এন। সেসব কিছুই নেই লকেটটায়, শুধু একটা অস্পষ্ট চিহ্ন। বোঝা যায় না, ওটা কী! হরফ কিছুতেই নয় ।
“কোথায় পেলেন?” কিকিরা জিজ্ঞেস করলেন।
“আলের গায়ে, একটা ছোট তেঁতুল ঝোঁপের পাতার আড়ালে।”
“শর্মাজির নজরে পড়েনি? তার সেপাইদের?”
“পাতার আড়ালে ছিল। সেখানে আগাছাও জন্মেছে।”
“নজর এড়িয়ে গিয়েছে তবে! তা চামেলিবাবু জায়গাটা …” বলতে বলতে উঠে পড়লেন কিকিরা। “একটু দাঁড়ান। চায়ের জল ফুটে গিয়েছে। আসছি…।”
