কথাটা কিকিরা মিথ্যে বলেননি। রজনী সরকারের বাড়িতে আলাপ হয়েছিল চামেলিবাবুর সঙ্গে। রজনীবাবুরা অ্যাটর্নির বংশ । তিন পুরুষ হয়ে গেল একরকম। রজনীবাবু অবশ্য আইনের চেয়ে ধর্মকর্মের বই লেখা নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। পেটের চিন্তা নেই, পরমার্থ চিন্তাতেই আনন্দ পান। মানুষটি ভাল, সুরসিক। কিকিরার সঙ্গে পরিচয় অনেকদিনের।
রজনীবাবুর বাড়িতে চামেলিবাবুকে দেখেছিলেন কিকিরা, আলাপও হয়েছিল। নিজের বিষয়গত একটা কাজে কলকাতায় এসেছিলেন চামেলিবাবু। বছরে এক-আধবার তাঁকে আসতে হয় কলকাতায়, বৈষয়িক কাজে। অবশ্য বৈষয়িক কাজগুলোর বৃত্তান্ত কিকিরা জানেন না, জানার আগ্রহও বোধ করেননি।
চামেলিবাবুই বেড়াতে আসার কথা তুলে উসকে দিলেন কিকিরাকে।“চলে আসুন, মশাই। আমাদের হাবিলগঞ্জ নামকরা জায়গা নয়। ছোট জায়গা। লোকজন কম। কিন্তু ভাল জায়গা। ক্লাইমেট ভাল এখন। জল হাওয়ার গুণ রজনীবাবুই জানেন।“
রজনীবাবু বার দুই এসেছেন এখানে। তাঁর এক মক্কেলের বাড়িও আছে। বললেন, “যাও কিঙ্কর, ঘুরে এসো কিছুদিন। তোমার শরীরটাও তো ভাল যাচ্ছে না বলছিলে। দিস ইজ প্রপার টাইম-বেশি শীত পাবে না, ভিড়ও পাবে না, জলটাও এমন স্বাস্থ্যকর! চলে যাও।’
কিকিরার শরীর হালে ভাল যাচ্ছিল না। গ্যাসট্রিকের ব্যথা, খানিকটা দুর্বলতা, ঘুমের গোলমাল। কী যেন মনে করে রাজি হয়ে গেলেন।
চামেলিবাবুই ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন সব। বাড়ি, খেপা যদু থেকে ঘরদোর ঝাড়মোছ করার একটা লোকও। সামান্য বিছানাপত্র ছাড়া কিকিরাদের কিছুই আনতে হয়নি । তক্তপোশ, অল্পস্বল্প আসবাব থেকে রান্নার বাসনপত্র–সবই ছিল এই বাড়িতে।
এখানে মাত্র দিন দুই এসেছেন কিকিরা। চামেলিবাবুর সঙ্গে অন্তরঙ্গতা তেমন হয়নি। তবে এটুকু বুঝেছেন, ভদ্রলোকের মানমর্যাদা এখানে যথেষ্ট। পুরনো মানুষ তো অবশ্যই। তার ওপর মোটামুটি ধনী। কলকাতার ধনী বলতে যেমন বোঝায় লোকটি তেমন নয়। মানে ধনীর আড়ম্বর চাকচিক্য নেই। অহঙ্কারও নয়। সেদিক থেকে গেঁয়ো হয়তো। চামেলিবাবুর জমিজায়গা আছে এখানে, ধানের জমি আছে, বাজারে কয়লা কেরোসিনের ডিপো আছে, লোক আছে দোকানে। আরও টুকটাক আছে কিছু।
চামেলিবাবু কিন্তু অবিবাহিত। তাঁর নিজের কেউ নেই। একটি মাত্র ছেলে থাকে–সম্পর্কে ভাইপো। এখানে থাকে না। চামেলিবাবুর নিজের ভাই ‘একজন মাত্র। সে বরাবরই ঘরছাড়া। কবে কোন কালে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে জাহাজের আর্টিজান হয়েছিল। এখন পদমর্যাদা বেড়েছে অনেক। কিন্তু ঘরে ফেরা আর হয়ে ওঠেনি। মাঝে মাঝে চিঠি লেখে; শেষ দেখা একবারই হয়েছিল, বছর দুয়েক আগে। দাদাকে দেখা দিতে এসেছিল।
চামেলিবাবু সম্পর্কে এর বেশি কিছু জানেন না কিকিরা।
“কই, কিছু বলছেন না যে!” চন্দন বলল।
“কী বলব?”
“চামেলিবাবু কেমন লোক?”
“খারাপ বলে তো মনে হয় না এখনও।”
“মানে আপনি …”
“ক্রিমিন্যাল বলে মনে করি কি না জানতে চাইছ?… তা যদি বলো তাহলে আমি বলব, ক্রিমিন্যালদের ভ্যারাইটি বা ক্লাস আছে। খুনখারাবি যারা করে বা করায় তারা যে-জাতের ক্রিমিন্যাল, আর জমিজায়গা নিয়ে মামলায় অন্যকে যারা ফাঁসায় তারা অন্য ধরনের ক্রিমিন্যাল। চামেলিবাবু ব্যবসাদার লোক। চালাক হতেই পারেন। তবে এই কেসের সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্ক আছে বলে আমি এখনও মনে করি না।”
“কার আছে, সার?”
“কেমন করে বলব। লোকটা যে কে এখনও জানা গেল না।”
“সত্যি, এটাই কেমন অবাক কাণ্ড।
“শর্মাজি কি পাত্তা করতে পারবে?”
“কী জানি! তেমন ভাবে লেগে থাকলে পারতেও পারে।”
তারাপদ বলল, “ডেডবড়িটা তো বিকেলে চালান হয়ে যাবে সদরে । সময় কম। “
কিকিরা কিছুই বললেন না।
.
॥ ৪ ॥
পরের দিন চামেলিবাবু নিজেই এলেন সকালের দিকে।
ভদ্রলোকের পোশাক সাধারণ। ধুতি, গরম পাঞ্জাবি, পায়ে মোজা আর চামড়ার জুতো। পাটকরা মোটা চাদর গলার কাছে জড়ানো। হাতে বেতের মোটা ছড়ি। চামেলিবাবুর বয়েস বুঝতে কষ্ট হয় না। ষাট পেরিয়েছেন। মাথায় পাতলা চুল। রগ ঘেঁষা চুলগুলো সব পাকা। দূরের জিনিস দেখতে অসুবিধে হয় না। কাছের জিনিস ঝাপসা দেখেন। চশর্মা আছে। তবে বেশিরভাগ সময় সেটা খাপ-সমেত পকেটে থাকে। চামেলিবাবুর গায়ের রং কালো, খয়েরি-কালো। গড়ন ছিপছিপে। মাথায় লম্বা।
হাঁটতে হাঁটতেই এসেছেন চামেলিবাবু। তাঁর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আলপথ ধরে এবাড়িতে আসতে মিনিট কুড়ি-পঁচিশ সময় যায়। সাধারণ জোরে হাঁটলে। নয়তো সামান্য বেশি।
কিকিরা বাইরেই ছিলেন। রোদ লাগাচ্ছিলেন গায়ে পিঠে। বললেন, “আসুন, বেড়াতে বেড়াতে নাকি?”
চন্দন আর তারাপদ গিয়েছে বাজারে। খেপা যদুকে বাজারেই পাবে, পেলে একটু মাছের খোঁজ করবে। এখানে মাছ এ-সময় রোজই বড় একটা পাওয়া যায় না। সিজন টাইমে দু-এক ঝুড়ি আসে। খরিদ্দার থাকে তখন। এখন মাছ বলতে মৃগেল। ছোট ছোট। বাজারে মুরগি অবশ্য পাওয়া যায়।
তারাপদরা খেতে পারে না। বাঙালির পেট, মাংস আর কত খাওয়া যায়। যদুপতি–মানে খেপা যদুর হাতে মাংস আবার তেলঝালে ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
চামেলিবাবু বললেন, “বেড়াতে বেড়াতেই এলাম। ওই আল দিয়ে। ভাল করে সব দেখতে দেখতে। খবরটা ছড়িয়ে গিয়েছে রায়বাবু।” এবার আর রায়সাহেব বললেন না।
