চন্দন ইশারায় তারাপদকেও শুয়ে পড়তে বলল।
কিকিরা পাট করা অলেস্টারের ওপর মাথা রেখে বালাপোশ গায়ে টেনে শুয়ে পড়তে পড়তে বললেন, “স্যার, একটু সাবধানে থাকবেন। চোখের পাতাটি বুজেছেন কি সর্বনাশ হয়ে যাবে।…আচ্ছা, শুয়ে পড়ি। আসানসোলে আমায় ডেকে দেবেন। চা খাব।”
কিকিরা লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে চোখ বুজলেন। তারাপদও যেন বাধ্য হয়ে শুয়ে পড়ল।
কামরার মধ্যেটা একেবারেই চুপচাপ। কেউ কেউ বেঞ্চের ওপর কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমোচ্ছে, কেউ কেউ বাংকের ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে, পুঁটলি পাকানো চেহারা করে বসে বসেই ঘুমোচ্ছে দু-চার জন। মাঝে মাঝে কাশির শব্দ, এক-আধটা ঘুম-জড়ানো কথা, ট্রেনের একঘেয়ে শব্দ–সব মিলিয়ে কেমন একটা নিঝুম আবহাওয়া।
একটা ছোট স্টেশনে গাড়ি থেমে আবার চলতে শুরু করল চন্দন বড় বড় হাই তুলছিল।
কিকিরা ঘুমিয়ে পড়েছেন। তারাপদ অনেকক্ষণ মটকা মেরে পড়েছিল। সারাদিনের ক্লান্তি যেন কখন তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল।
চন্দন নানারকম কথা ভাবছিল। কিকিরা লোকটা কি সত্যিই চালাক? তার ভাঁড়ামির খানিকটা হয়ত অভিনয়, কিন্তু চালাকির ব্যাপারটা অভিনয় করে দেখানো যায় না। কিকিরা যদি চালাকই হবে তাহলে সে কেন অযথা প্রথমেই চন্দনদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করতে গেল? যে-লোক জানে চন্দনরা শংকরপুরে ভুজঙ্গভূষণের কাছে যাচ্ছে সেই লোক কেন আগেভাগে তা প্রকাশ করে দেবে? বরং সে চুপচাপ থাকবে, ঘুণাক্ষরেও জানতে দেবে না তারাপদদের ব্যাপারটা সে ছিটেফোঁটাও জানে। তারপর সবাই যখন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়বে, কিকিরা তারাপদর কিট ব্যাগ নিয়ে নেমে পড়বে যে কোনো স্টেশনে। এই গাড়িটা এমনই যে, যখন তখন নেমে পড়া যায়, অনরবত থামছে, চলছে, আবার থামছে।
কিকিরা বোকামি করেছে। হয় বোকামি করেছে, না হয় জেনেশুনে ইচ্ছে করেই সতর্ক করে দিয়েছে। জানিয়ে দিয়েছে, তারাপদদের ব্যাপার সে জানে । কিন্তু কেন কিকিরা সতর্ক করে দেবে? চোর কি বাড়ির লোককে সাবধান করে দিয়ে চুরি করে? তবে?
চন্দন যতই ভাবছিল ততই তার মাথার মধ্যে জট পাকিয়ে যাচ্ছিল । শুরু থেকেই যার মধ্যে এত রহস্য আর ঝামেলা–শেষে গিয়ে তার মধ্যে যে আরও কত গভীর রহস্য দেখা যাবে কে জানে।
.
গায়ে হাত পড়তেই চন্দন ধড়মড় করে উঠে বসল ।
মুখের সামনে কিকিরা। চন্দন তারাপদকে দেখে নিল। ঘুমোচ্ছে। তারাপদ।
“আপনি স্যার ঘুমিয়ে পড়েছিলেন”, কিকিরা বললেন, এমনভাবে বললেন। যেন কতই না সহানুভূতি দেখাচ্ছেন।”
চন্দন বলল, “হ্যাঁ, কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।” ঘুমিয়ে পড়ার জন্যে তার লজ্জা এবং রাগ হচ্ছিল।
“অনেকক্ষণ থেকেই ঘুমোচ্ছেন,” কিকিরা হাসি হাসি মুখ করলেন। চন্দন তাড়াতাড়ি হাতের ঘড়ি দেখল। সর্বনাশ, সাড়ে তিনটে বাজে। সে যখন শেষবার ঘড়ি দেখে তখন দুটো বাজছিল। টানা দেড় ঘণ্টা সে ঘুমিয়ে থাকল। আশ্চর্য। হাসপাতালে কখনও এ-রকম হয় না। রাত্রের গাড়িটাড়ির এই দোষ, যাত্রীদের ঘুম, ঢুলুনি, গাড়ির দোলানি, একঘেয়ে শব্দ, ট্রেন থামা আর যাওয়া, হলুদ হলুদ আলো, সব মিলেমিশে কেমন ঘুম এনে দেয়। ছোঁয়াচে রোগের মতন ব্যাপারটা।
চন্দন কিকিরাকে সন্দেহের চোখে দেখল। “আপনি কি জেগেছিলেন?”
“আমার ঘুম স্যার খুব পাতলা, একটু খুসখস শব্দ হলেই জেগে উঠি। রাতের গাড়িতে চলাফেরা করতে করতে এই অভ্যেস হয়ে গেছে ।”
চন্দন হাই তুলল। চোখ যেন এখনও জুড়ে রয়েছে।
“আপনি অনেকক্ষণ থেকে জেগে বসে আছেন?” চন্দন জিজ্ঞেস করল।
“অনেকক্ষণ। বসে নয়, শুয়ে ছিলাম।”
হঠাৎ চন্দনের কেমন যেন মনে হল, মনে হতেই চমকে উঠল। আরে–কিকিরা এর মধ্যে কোনো হাত সাফাই করেনি তো? তারাপদর কিটু ব্যাগে মৃণাল দত্তর দেওয়া সেই কাগজপত্তর ঠিকঠাক আছে? না কিকিরা চুরি করে নিয়েছে?
কথাটা মনে হতেই চন্দনের বুক ধকধক করে উঠল, ভয় যেন লাফ মেরে। গলার কাছে এসে বসল। তাড়াতাড়ি ঝুঁকে পড়ে সে তারাপদকে ঠেলা দিল।“তারা, এই তারা–”
বলিহারি ঘুম তারাপদর। মরার মতন ঘুমোচ্ছে ।
“ওঁকে আবার কেন অযথা জাগাচ্ছেন, স্যার?” কিকিরা বলল।
“দরকার আছে,” চন্দন রুক্ষভাবে জবাব দিল।
বার কয়েক ঠেলা খেয়ে তারাপদ উঠে বসল। উঠে বসে চোখ রগড়াতে লাগল। যেন তার খেয়ালই নেই সে বাড়িতে বিছানায়, না রেলগাড়িতে। কয়েক মুহূর্ত পরে তারাপদ হুঁশ ফিরে পেল।
চন্দন রেগে গিয়ে বলল, “আশ্চর্য ঘুম তোর!”
তারাপদ লজ্জিত হয়ে বলল, “কাল সারাদিন যা ধকল গেছে–পারছিলাম না।”
“এদিকে যে—” বলতে গিয়ে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিল চন্দন, আড়চোখে কিকিরাকে দেখে নিল। তারপর ইঙ্গিতে বলল, ‘আমিও ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বলে কিকিরাকে দেখাল, “উনি জেগে ছিলেন।”
তারাপদ হয় ইঙ্গিতটা বুঝল না, না হয় তার মাথা মোটা। সে তখনো হাই তুলছে।
বিরক্ত হয়ে চন্দন আবার বলল, “এই ট্রেনে ছিঁচকে চোরের যা উপদ্রব । দেখে নে আমাদের জিনিসপত্র ঠিক আছে কিনা?”
তারাপদ এবার বুঝতে পারল। তার মুখের অদ্ভুত এক চেহারা হল ।
কিকিরা বললেন, “না না, এদিকে কেউ আসেনি। আমার ঘুম ভেরি ভেরি ভেরি থিন, গায়ের পাশ দিয়ে কেউ হেঁটে গেলেই ঘুম ভেঙে যায়।”
চন্দন তারাপদকে হুকুমের ভঙ্গিতে বলল, “তা হলেও একবার দেখে নে।“
