তারাপদ ঘুমোবে কি, ঘুম তার মাথায় উঠে গেছে।
কিকিরাই যেন কী মনে করে বললেন, “বাস্তবিক স্যার, রাত হয়ে গেছে অনেক, বারোটায় বর্ধমান পেরিয়ে পেরিয়ে এসেছি। তা ধরুন এখন সাড়ে বাররা। শীতটাও জব্বর। এবার শোবার ব্যবস্থা করতে হয়। তবে একজনের জেগে থাকা উচিত, নয়ত এ-গাড়িতে যা চোরের উৎপাত, গা থেকে জামাকাপড়ও খুলে নিয়ে যায়।”
চন্দন একটু ঠাট্টার ছলেই বলল, “আপনার নিশ্চয় অম্বলের রোগ আছে, বয়েসও হয়েছে, আপনি শুয়ে পড়ন–আমি জেগে আছি।”
কিকিরা বললেন, “ঠিক ধরেছেন স্যার, আমার জুস বেশি হয়, রাত জাগলে বোতলের সোডার মতন হয়ে যায় পেট বুক। সে কী কষ্ট! যাকগে, আমি একবার বাথরুম ঘুরে এসে শুয়ে পড়ি, কী বলেন?”
বালাপোশটা হাত দিয়ে আবার একটু ঝেড়েঝুড়ে কিকিরা উঠে দাঁড়ালেন, বাথরুমে যাবেন।
তারাপদ যেন এই সুযোগের অপেক্ষা করছিল।
কিকিরা ওপাশে বাথরুমের দিকে যেতেই নিচু গলায় তারাপদ বলল, “চাঁদু, লোকটা ঘোড়েল। ওর কোনো মতলব আছে।”
চন্দন বলল, “আমিও তাই ভাবছি। ম্যাজিক-ফ্যাজিক বাজে কথা।”
“কিকিরা কি আমাদের ফলো করছে?” তারাপদ জিজ্ঞেস করল।”
“তাই তো মনে হয়। কিন্তু কেন?”
তারাপদ দূরে বাথরুমের দিকে তাকাল। কিকিরা দরজা খুলে ঢুকে গেলেন।
তারাপদ বলল, “আমার ভুজঙ্গভূষণের নামে একটা সিল করা প্যাকেট, চিঠিঠি আছে, মৃণাল দত্ত দিয়েছেন। ওগুলো যতক্ষণ না ভুজঙ্গভূষণের হাতে দিতে পারছি ততক্ষণ আমার কোনো ক্লেম হচ্ছে না সম্পত্তির ওপর। “
“তা জানি,” চন্দন মাথা নাড়ল।” কিকিরা কি ওটা হাতাবার জন্যে এসেছে? তাতে ওর লাভ কী হবে? কিকিরা তো তারাপদ নয় যে, ওগুলো হাতিয়ে ভুজঙ্গভূষণের কাছে হাজির হলেই দেড় দুই লাখ টাকার সম্পত্তি পেয়ে যাবে। তা ছাড়া ওর মধ্যে কী আছে তাও তো আমরা জানি না।”
তারাপদ চিন্তায় পড়ে কেমন বিমর্ষ হয়ে আসছিল। বলল, “আমিও তো তাই ভাবছি।..আচ্ছা, তোর কি মনে হয়, কিকিরা মৃণাল দত্তর লোকর?”
“মানে?”
“মৃণাল দত্ত ওকে পাঠাননি তো? উনি ছাড়া আর তো কেউ জানে না আমরা শংকরপুরে ভুজঙ্গভূষণের কাছে যাচ্ছি।”
চন্দন বন্ধুর দিকে তাকিয়ে থাকল। ভাবল। বলল, “তা ঠিক। তুই যখন সকালে মৃণাল দত্তর বাড়ি গিয়েছিলি তখন কাউকে দেখেছিস?”
“না”, মাথা নাড়ল তারাপদ।
“ঘরে কেউ ছিল না?”
“কালকের সেই বুড়োমতন লোকটি দু একবার এসেছিল।”
“তার চোখের সামনেই মৃণাল দত্ত তোকে এই এই সব দিয়েছেন?”
“হ্যাঁ।”
“গাড়ির কথা কিছু বলেছেন?”
“বলেছেন, রাত্রে দুটো গাড়ি আছে, একত্সপ্রেস শংকরপুরে থামে না।”
চন্দন কিছুই বুঝতে পারল না। মৃণাল দত্ত নিজেই তাঁর মক্কেলের জন্যে তারাপদর খোঁজ করছিলেন, তিনি যেচে তারাপদকে ভুজঙ্গভূষণের কাছে। পাঠাচ্ছেন, এটা তাঁর কর্তব্য। তবে কেন তিনি পেছনে লোক লাগাবেন? তা হলে কি ওই বুড়ো লোকটা, মৃণাল দত্তর বাড়ির কাজের লোকটা, আসলে অন্য কারও হাতের পুতুল। তাই যদি হয়, তবে ধরে নিতে হবে, ভুজঙ্গভূষণের সম্পত্তি যাতে তারাপদর হাতে না যায় সেজন্যে ফন্দি আঁটার লোক আছে। তারাই কিকিরাকে লাগিয়েছে। কিন্তু এ-সব ভাবনা কি বাড়াবাড়ি নয়। কার গরজ তারাপদকে বঞ্চিত করার। তেমন কাউকে তো দেখা যাচ্ছে না ।
চন্দন বলল, “আমি ভাই কিছু বুঝতে পারছি না। এভরিথিং ইজ মিস্টিরিয়াস। ভুজঙ্গভূষণ, মৃণাল দত্ত, কালো বেড়াল, কিকিরা–সবই কেমন গোলমেলে।”
তারাপদ ম্লান মুখ করে বলল, “আমারও মাথায় কিছু ঢুকছে না। লাভের মধ্যে ভাবতে ভাবতে মাথা ধরে গেল। টাকা-পয়সা, সম্পত্তি ব্যাপারটাই ঝাটের। বেশ ছিলুম, এখন কী প্যাঁচেই পড়লাম।”
কিকিরাকে আবার দেখা গেল।
চন্দন নিচু গলায় বলল, “যাই হোক–তুই ঘাবড়াবি না, তারা। ওই লোকটার কাছে একেবারেই নার্ভাসনেস দেখাবি না। ওর সামনে তুইও শুয়ে পড়।”
“আমার ঘুম হবে না।”
“না হোক, তবু তুই শুয়ে পড়বি। ঘুমোবার ভান করবি। আমি জেগে থাকব। হাসপাতালের ডিউটিতে আমার রাত জাগা অভ্যেস আছে।”
“তুই একলা কতক্ষণ জাগবি?”.
“সারা রাত। কিকিরাকে আমি নজর রাখব।”
তারাপদর হঠাৎ মনে পড়ল, কিকিরা বলেছে, তার সুটকেসে নাকি খুরটুর আছে। স্যাম্পল দেখাবে বলেছিল। লোকটা কত বড় শয়তান। সুটকেসে করে খুর এনেছে। গলা কাটবে নাকি? খুন?
তারাপদ ভয়ে ভয়ে বেঞ্চির তলার দিকে তাকাল, কিকিরার সুটকেস দেখবার চেষ্টা করল। তারপর অস্ফুটভাবে চন্দনকে বলল, “কিকিরার কাছে খুর আছে–।”
কিকিরা ততক্ষণে একেবারে কাছে এসে পড়েছেন।
চন্দন আবার একটা সিগারেট ধরাল। যেন কিছুই হয়নি।
তারাপদ তখনও বসে।
কিকিরা বললেন, “জমজম করে শীত পড়ছে। পানাগড় দুর্গাপুর কাছেই বোধ হয়। আরও জব্বর ঠাণ্ডা পড়বে স্যার, একেবারে আর্লি মর্নিংয়ে আসানসোল, তারপর শীতের বহরটা দেখবেন, লাইক্ ক্যাটস অ্যান্ড ডগস্।”
চন্দন ব্যঙ্গ করে বলল, “ওটা বৃষ্টির বেলায় স্যার, শীতের বেলায় নয়।”
কিকিরা তাঁর স্বভাবসিদ্ধ খখকে হাসি হেসে বললেন, “একই হল স্যার, বৃষ্টির বেলায় যদি বেড়াল কুকুর পড়তে পারে শীতের বেলায় কেন পড়বে না। ইংরিজি ভাষার কোনো নিয়ম নেই, যা পড়াবেন তাই পড়বে।”
কথা বলতে বলতে কিকিরা তাঁর সেই বেখাপ্পা অলেস্টার খুলে পাট করে বালিশের মতন করে নিলেন। টুপি আগেই খুলেছিলেন, মাফলারটা পাগড়ির মতন করে কানে বাঁধলেন, জুতো খুললেন।
