তারাপদ কিব্যাগ-টিটব্যাগ দেখল।
“তোর ব্যাগের মধ্যে আমার একটা সিগারেটের প্যাকেট রেখেছিলাম–দেখ তো আছে কি না?” একবারে ডাহা মিথ্যে কথা চন্দনের! সে চাইছিল, ব্যাগ খুলে তারাপদ একবার আসল জিনিসটা আছে কিনা দেখে নিক।
তারাপদ কোলের ওপর ব্যাগ তুলে চেন খুলল। দেখল। হাত ডুবিয়ে ডুবিয়ে ঘাঁটল। তারপর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। মৃণাল দত্তর দেওয়া জিনিসগুলো ঠিকই রয়েছে।
তারাপদ কায়দা করে বলল, “আছে।…তুই এখন আমার সিগারেট নে। নতুন প্যাকেট পড়ে ভাঙবি।”
চন্দন নিশ্চিন্ত হল। বাব্বা, যা ভয় ধরে গিয়েছিল তার।
কিকিরা সমস্ত ব্যাপারটাই স্বাভাবিকভাবে দেখছিলেন। এবার বললেন, “আমায় একটা সিগারেট খাওয়ান, স্যার; যা শীত…।”
চন্দন তারাপদর প্যাকেট থেকে কিকিরাকে সিগারেট দিল। নিজেও ধরাল।
বালাপোশ গায়ে জড়িয়ে বসে সিগারেট খেতে খেতে কিকিরা খখক্ করে কাশছিলেন। বললেন, “সিগারেটের নেশা আমার নেই, একটা দুটো খাই কখনো।”
গাড়িটা যেন কোনো ইয়ার্ডে ঢুকল । লাইন বদলের শব্দ হচ্ছে। এক একবার বাঁয়ে টাল খাচ্ছে, আবার যেন ডাইনে টাল খেল।
কিকিরা বললেন, “অন্ডাল এসে গেল । আর খানিকটা পরে আসানসোল। সোয়া চারটে নাগাদ আসানসোল পৌঁছোয়।”
“আপনি এদিকে খুব যাতায়াত করেন?” চন্দন জিজ্ঞেস করল ।
“প্রায়ই।”
“সবই আপনার চেনা।”
“তা বলতে পারেন।”
তারাপদ হঠাৎ বলল, “যশিডিতে থাকবেন এখন?”
“যশিডিতে নয়, দেওঘরে যাচ্ছি…। ওখানে আমার ফিল্ড আছে।”
“কী?”
“ফিল্ড স্যার, মানে চেনাজানা আছে, কাস্টমার রয়েছে।”
চন্দন মনে মনে একটা প্যাঁচ ভাবছিল। দাবা খেলার চালের মতন একটা মোক্ষম চাল দিলে কেমন হয়? কিকিরা কি সামলাতে পারবে? হয়ত কিকিরা আরও পাকা খেলোয়াড়, চন্দনকে বসিয়ে দেবে। তবু একটা ঝুঁকি নিতে আপত্তি কী? এখনও যাত্রা শেষ হয়নি চন্দনদের, আরও পাঁচ ছ ঘণ্টার বেশি ট্রেনে থাকতে হবে। কিকিরার যদি কোনো মতলব থাকে, এর মধ্যে হাসিল করবে কি না কেউ বলতে পারে না। তবে এখন পর্যন্ত করেনি। সুযোগ পেয়েও ছেড়ে দিয়েছে। যদি তারাপদর ব্যাগ নিয়ে কিকিরা কোথাও নেমে যেত মাঝপথে, চন্দনরা জানতেও পারত না। লোকটাকে পুরোপুরি অবিশ্বাস করার চেয়ে একটু বিশ্বাস করা যাক না, ক্ষতি কী!
চন্দন আরও খানিকক্ষণ ভেবে শেষে বলল, “স্যার, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“নিশ্চয় নিশ্চয়, একশোটা কথা জিজ্ঞেস করুন।”
“আপনি যে বললেন, আমরা মধুপুরে যাচ্ছি না–এটা কী করে বললেন?”
কিকিরা অদ্ভুত মুখ করে হাসলেন, “ম্যাজিক।”
“ম্যাজিক দেখতে আমাদের ভাল লাগে, কিন্তু তা বিশ্বাস করি না।”
“ভাল ম্যাজিক আপনারা দেখেননি স্যার, তাই বলছেন–” কিকিরা বললেন। একটু চুপ করে থেকে আবর বললেন, “আপনারা ছেলেমানুষ, অনেক কিছুই জানেন না, দেখেননি। যখন দেখবেন, জানবেন,–তখন বিশ্বাস করবেন।”
“তা বলে এই থট রিডিং না কী যেন বলে, তাও বিশ্বাস করতে হবে? আপনি নিজেই তখন বলছিলেন, ম্যাজিক হল খেলা, মন্ত্রট বাজে–।”
“বলেছি,” কিকিরা ঘাড় হেলালেন, “এখনও বলছি, মন্ত্রটন্ত্র বাজে। তবে যোগীদের আমি বিশ্বাস করি। তাঁরা আশ্চর্য আশ্চর্য ঘটনা ঘটাতে পারেন। মাটি চাপা হয়ে তিন ঘণ্টা কী করে মানুষ থাকতে পারে স্যার, আপনি তো ডাক্তার, বলুন না?”
চন্দন কোনো জবাব দিল না। কিকিরাকে এখন আর ভাঁড় মনে হচ্ছে না। তার গলার স্বরও যেন পালটে গিয়েছে।
তারাপদ লল, “আপনি কি যোগী?”
“না, না”, কিকিরা মাথা নেড়ে জিব কাটল, “যোগের য পর্যন্ত আমি জানি না। ওসব মহাপুরুষরা পারেন, আমরা কত তুচ্ছ।”
“তা হলে আপনি কী করে জানলেন আমরা কোথায় যাচ্ছি, কার কাছে যাচ্ছি?”
কিকিরা খুব বিনয় করেই যেন বললেন, “একথাটা ঠিক হল না স্যার, আমি শুধু বলেছি, আপনারা যেখানে যাচ্ছেন সেই জায়গাটার নামের প্রথমে ‘এস’ অক্ষর আছে। যার কাছে যাচ্ছেন তাঁর নামের প্রথমে ‘বি’ অক্ষর আছে তা আপনারা তো ‘এন’ অক্ষর দিয়ে নামের কত জায়গাতেই যেতে পারেন, সীতারামপুর, সালানপুর, শিমুলতলা আর যার কাছে যাচ্ছেন তাঁর নাম বিহারীপ্রসাদ, বিজনকুমার, বটুকচন্দ্রও হতে পারে…”
চন্দন বুঝতে পারল, কিকিরা পাকা লোক, সহজে মচকাবে না। বলল, “হতে সবই পারে, কিন্তু আপনি জানেন আমরা কোথায় যাচ্ছি। জানেন না?”
কিকিরা হাসি-হাসি মুখ করে চেয়ে থাকলেন।
চন্দন আর তারাপদ তাকিয়ে থাকল, অপেক্ষা করতে লাগল।
কিকিরা কোনো কথাই বলছিলেন না।
“কিছু বলছেন না?”
“কী বলব স্যার!”
“আপনি সত্যি সত্যিই কিছু জানেন না?”
কিকিরা এবার একবার তারাপদর দিকে তাকালেন। চোখ বন্ধ করলেন। আবার খুললেন। তাঁর হাসি-হাসি মুখ মুখ ধীরে ধীরে গম্ভীর, করুণ হয়ে উঠল, গলার স্বর ভারী শোনাল। বললেন, “একটা কথা আপনাদের আমি বলে দিই। আপনারা ছেলেমানুষ। যেখানে যাচ্ছেন সেই জায়গা কিন্তু ভয়ংকর। আপনারা ভয় পেয়ে যাবেন, বিপদেও পড়তে পারেন। চোখ কান খোলা রাখবেন। কোনো ভেলকি বিশ্বাস করবেন না। ওই লোকটা যোগী নয়–শয়তান, পিশাচ। তার চেহারা দেখলে আপনাদের বুক কাঁপবে। অনেক মানুষের জীবন সে নষ্ট করেছে। ও একটা কাপালিক। কী নিষ্ঠুর জানেন না। এত বড় শয়তান কেমন করে বেঁচে আছে–আমি জানি না। ভগবান এত লোককে নেন, ওই পিশাচকে কেন নেন না?” বলতে বলতে কিকিরার মুখ কেমন রক্তজমার মতন নীলচে হয়ে এল। তিনি দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেললেন।
