“তাহলে লোকটা এল কোথা থেকে?”
“ওহি তো বাত।”
“আরও তো লোক থাকে এখানে শর্মাজি…”
“থানা থেকে আমার লোক পাঠিয়ে ঘরে ঘরে খোঁজ নিচ্ছি, সব খবর পাইনি এখনও।”
“নো ওয়ান ইজ মিসিং?”
শর্মা মাথা নাড়লেন। “নো। নান।” বলে চন্দনের দিকে তাকালেন শর্মা, “হোয়াট ইউ থিঙ্ক ডাগতারসাহেব? টাইম অব ডেথ?”
চন্দন কেমন বিভ্রমে পড়ে গেল। বলল, “শর্মাজি, আমার পক্ষে ঠিক বলা সম্ভব নয়। আন্দাজে বলতে পারি, মাঝরাত বা শেষরাত।”
“আপনি পারেন না?”
“না। ডাক্তারদের ওপিনিয়ান সব সময় ডিফার করে। এ ব্যাপারে বেস্ট জাজ পোস্টমর্টেম যিনি করবেন তিনি। যদিও দেখেছি এঁদের মতও পুরোপুরি মেলে না। আপনি অন্য কাউকে…”
শর্মা মাথা হেলালেন। মানে, তিনি এদিককার কোনও ডাক্তারকেও দেখিয়েছেন মৃতদেহ। তিনিও সময় বলতে পারেননি ঠিকমতন।
কিকিরা বললেন, “আপনি কী মনে করেন শমজি? ন্যাচারাল ডেথ?”
“না।” মাথা নাড়লেন শর্মা, “ন্যাচারাল মনে হয় না।”
“মার্ডার? এ কেস অব কিলিং?” তারাপদ বলল।
“আই থিঙ্ক সো! মাগর লোকটা কে? কে মার্ডার করল? হোয়াই? হু ইজ দিস ম্যান?”
কিকিরাও এই দুটি কথা জানতে চান। সামান্য সময় চুপ করে বসে থেকে হঠাৎ হাত বাড়ালেন, “দিন সার, আপনার প্যাকেটের খইনি দিন। আমি চুরুট খাই। খইনি হজম করতে পারব।”
চন্দন যেন আঁতকে উঠল। কিকিরার সর্দিজ্বর, সামান্যই জ্বর অবশ্য, গলা বসে আছে। কাশছেন মাঝে মাঝে। এর ওপর খইনি। নিঘাত কাশির দমকে একটা বিপদ বাধাবেন।
খইনির প্যাকেট নিয়ে কয়েক মুহূর্ত দেখলেন কিকিরা। তারপর হেসে বললেন, “এই খইনি কারা খায় শর্মাজি! গোলাপ মাকা খইনি! নরম বোধ হয়।” বলে প্যাকেট থেকে একটু জরদা বাঁ হাতের তালুতে ঢেলে নিলেন। প্যাকেটটা এগিয়ে দিলেন শর্মাকে।
“স্টেশনের বাবুরা লোকটিকে জানতে পারেন নাকি?” কিকিরা বললেন, খইনি তখনও মুখে দেননি।
শর্মা বললেন, “চান্স আছে। বাত কী জানেন রায়সাহাব, এখন প্রপার সিজন টাইম নয়; দেওয়ালি শেষ। পূজায় যারা এসেছিল তারা ফিরে গিয়েছে। নভেম্বরের এন্ডে কম লোক আসে এখানে বেড়াতে। ডিসেম্বরের মিড উইক থেকে আবার লোক আসবে। জানুয়ারিতে রাশ থাকে …। ব্যস সিজন খতম।”
কিকিরা শুনলেন, ভাল বুঝলেন না। তাকিয়ে থাকলেন।
শর্মা বুঝতে পারলেন, কথাটা ধরতে পারেননি রায়সাহাব। তারপর ব্যাখ্যা করে বোঝালেন, এ-সময় এত কম লোক আসে–মানে বেড়াতে আসে বাঙালিবাবুরা যে রেলস্টেশন থেকে বেরুবার সময় টিকিট কালেক্টররা মোটামুটি মুখগুলো নজর করতে পারেন। স্টেশনের মালবওয়া পোটাররাও চিনে নিতে পারে। শমজি সেই আন্দাজে ডেকে আনিয়েছিলেন জনা কয়েক স্টেশনের বাবুকে। কেউ কিছু বলতে পারল না। বাজারের লোকরাও নয়। তা ছাড়া একেবারে নয়া লোক না হলে হাটেবাজারেও তার মুখ দেখা যায়। এই লোকটি একেবারে নয়া হতে পারে।
খইনি মুখে দিলেন কিকিরা, ঠোঁটের তলায়। মুখ সামান্য বিকৃত করলেন। কাশলেন না।
শর্মা হাসছিলেন।
চন্দন বলল, “শর্মাজি, আমরা এবার উঠতে পারি?”
“জরুর পারেন। … আমার দরকার পড়লে আপনাদের সঙ্গে মিট করব।”
কিকিরা উঠলেন না। বললেন, “শর্মাজি, চামেলিবাবুর বাগানের বাইরে যে বাড়িগুলো আছে; তাদের খোঁজখবর রাখেন?”
শর্মা অবাক। বললেন, “শীতলবাবু! ওল্ড ম্যান। আমি চাচাজি বলি। গুড হোমিওপ্যাথ । পুরনো লোক। ভাল লোক!”
“কাঞ্চন। ছোকরা।”
“আরে, কচিবাবু আমার ইয়ার দোস্ত।”
“বাকিরা? চামেলিবাবুর ভাড়াটেরা?”
“শুনেছি। দেখিনি।”
“মোটরবাইক নিয়ে যে ছোকরা দুটো ঘুরে বেড়ায়।”
“দেখেছি। এনিথিং রং উইথ দেম?”
“না। ওই ছোকরা দুটো যাতে এখান থেকে হুট করে পালাতে না পারে, সার। দু-চারদিন আটকে রাখুন। পারবেন না?”
শর্মা অবাক হয়ে বললেন, “কেন?”
“দেখুন না ক’দিন।” কিকিরা এবার উঠলেন। খইনি হজম করে ফেলেছেন নাকি!
শর্মা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন–তার আগেই কিকিরা নিজের জিভ বার করে দেখালেন। জিভের ডগায় একটা কাশির দমক থামার বড়ি। “
অবাক হয়ে শর্মা বললেন, “আরে!”
“পেপস!… কাল এখানের দোকানে কিনেছি।”
“আমায় বুদ্ধ বানালেন রায়সাহাব।” শর্মা হাসতে লাগলেন। কিকিরা হাসতে হাসতে বললেন, “আমি ম্যাজিশিয়ান শর্মাজি। এক সময় খেলা দেখাতাম। এখন সিটিং আয়ছিল।”
শর্মাজি হো হো করে হাসতে লাগলেন। চলে আসার সময় কিকিরা কী মনে করে ঝিলের কাছে পাওয়া টর্চটা দেখতে চাইলেন। দেখালেন শর্মা। দেখলেন কিকিরা ।
.
বাড়ি ফেরার পথে তারাপদ বলল, “কিকিরা সার, বেড়াতে এসে আচ্ছা এক প্যাঁচে পড়ে গেলুম।”
“কেন?”
“কেসটা যদি মার্ডার কেস হয়, আমরা দুজন–চাঁদু আর আমি তো ঝামেলায় পড়ে যাব। উইটনেস হওয়ার জন্যে ডাক পড়বে না?”
“আরে দাঁড়াও। কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় দেখো আগে। আর উইটনেস হলে ফাঁসি যেতে হয় না।”
“আমার বাজে লাগছে।”
চন্দন বলল, “কিকিরা, এই চামেলিবাবু লোকটি কেমন?”
“কেমন করে জানব! পরিচয় সামান্য।”
“বাঃ!”
“বা কেন?”
“চামেলিবাবুর কথায় আপনি এখানে বেড়াতে এলেন, সঙ্গে লেজুড় করে নিয়ে এলেন আমাদের, এখন বলছেন–কেমন করে জানব!”
কিকিরা মজার গলায় বললেন, “সংস্কৃতে একটা কথা আছে, পত্রম্ ন পরিচয়তে গুণম্ …! ঠিক সংস্কৃতটা ভুলে গিয়েছি–মনে নেই। আদত কথাটা বলি, তোমরা তো আবার সংস্কৃত বোঝো না। নিমপাতা যে তেতো এটা অভিজ্ঞতা থেকে জানা গিয়েছে, মুখে না দিলে জানা যেত না। একটা বাচ্চাকে এক আধ চামচে নিমপাতার রস খাওয়ানো যায়–যতক্ষণ সে না বুঝছে জিনিসটা খেতে কেমন! একবার মুখে গেলে আর কি খেতে চায়! এটাও সেইরকম হে! চামেলিবাবুর সঙ্গে আলাপ হয়ে মন্দ লাগেনি। কত বাবুর সঙ্গেই তো পরিচয় হয়, আগে থেকে বুঝব কেমন করে সে কেমন–”ভাল, না, মন্দ!”
