কিকিরা চামেলিবাবুকে বললেন ঠাট্টা করেই, “আপনি তাহলে বেঁচে গিয়েছেন বলুন!”
“বাঁচা আর কী! স্বস্তি পেয়েছি।…তবে ছোকরা দুটো এখানে আর বোধ হয় থাকবে না।”
“কেন? এক মাসের ভাড়া নিয়েছে…”
“মাস-ভাড়া ছাড়া বাড়ি তো আমি দিই না। কেউ দেয় না। ওরা ভাড়া নেওয়ার সময়েই বলে দিয়েছিল–হপ্তা দেড়েক থাকবে বড় জোর!”
“হপ্তা দেড়েক হয়ে গিয়েছে?”
“তা হল!”
কিকিরা এবার উঠে পড়লেন। খানিকটা আচমকাই। বললেন, “এখন চলি। চামেলিবাবু! অনেকক্ষণ হয়ে গেল! বেলা হয়ে যাচ্ছে! একবার থানায় যেতে হবে।”
ঘড়ি দেখল চন্দন। দশটা বেজে গিয়েছে।
চামেলিবাবু বললেন, “আমি আপনাদের সঙ্গে যাই। থানায় যাবেন–!
“আরে না না, আপনি বসুন! আমরা তো এ-সময় একবার টহল মারতে বেরোই। থানাটাও ঘুরে যাব।”
তারাপদরা উঠে পড়ল।
আসবার সময় তারাপদ হালকাভাবে বলল, “আপনার জংলীকে কিন্তু আমরাও দেখিনি। “
“আছে বাড়িতেই। ইঁদারার ওপরের ঢাকা জালটা ভেঙে গিয়েছিল একপাশে। সারানোর কাজ করছিল সকাল থেকেই। পরে দেখতে পাবেন, ওকে দেখা কঠিন কিছু নয়। কাজ নিয়ে থাকে।”
কিকিরারা আর দাঁড়ালেন না।
.
বাইরে এসে মাঠের রাস্তা ধরে যেতে যেতে কিকিরা প্রথমে ছড়ানো ছিটোনো বাড়িগুলো দেখছিলেন। আগেও দেখেছেন তবে নজর করে নয়। এখানে আসা তো মাত্র দিন দুই। গতকালই যা একবার এসেছিলেন চামেলিবাবুর বাগানে। আর আজ।
তারাপদ আর চন্দন থানায় গিয়ে কতক্ষণ আটকে যাবে সেটাই ভাবছিল। বেলা তো বেড়েই যাচ্ছে। বাজারে সামান্য কাজও ছিল। এ-বেলা হয়তো হবে না। খেপা যদু বাড়িতে কী করছে কে জানে!
কিকিরা হঠাৎ বললেন, “চাঁদু, ট্র্যাঙ্গল মানে ত্রিভুজ জানো তো!”
চন্দন তাকাল। তারাপদও।
কিকিরা হাত দিয়ে ঝিলের দিকটা দেখালেন। তারপর এপাশ ওপাশ। বললেন, “এটা একটু নজর করো। আমরা যে মাঠের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি–চামেলিবাগানের গা ঘেঁষে, এটা ঝিলের দক্ষিণ দিক। এই রাস্তাটা গিয়ে ওই বড় রাস্তা–মানে এখানকার মেন রাস্তায় পড়েছে। ওটা উত্তর দিক। আর ঝিল তো দেখতেই পাচ্ছ। আমরা থাকি উত্তর দিকে। প্রায় উত্তর। বিশ ত্রিশ পা হাঁটলেই কাঁচা মেন রোড। “
“আপনি সার আমাদের দিক শেখাচ্ছেন?”
“না। আমি বলছি, ঝিলের কথা। দু দিকে দুই রাস্তা। উত্তর আর পুবে। এ দিকে দক্ষিণে আলপথ ঝিলের। এই আলপথ দুই রাস্তাকে জয়েন করেছে। মানে ইট ইজ লাইক এ ট্র্যাঙ্গল। অর্থাৎ তিন দিকে তিন পথ, মাঝখানে ঝিল। ত্রিভুজ বলা যায় কি না!”
চন্দন দেখল । মাথা নাড়ল। “তা বলতে পারেন। “
“আমার প্রশ্ন হচ্ছে, মাঝরাতেই হোক কি শেষরাতে, একটা লোক বড় রাস্তা ছেড়ে আলপথ দিয়ে যাবে কেন? হোয়াই?”
তারাপদর মনে হল, প্রশ্নটা যথার্থ। কিকিরা বললেন, “লোকটা হয় চামেলিবাগানের দিক দিয়ে এসেছিল–মানে আসছিল; না হয় উত্তর দিক দিরে। শর্টকাট পথে। তাই না?”
চন্দন ভাবল কয়েক মুহূর্ত, তারপর বলল, “তাই তো মনে হয়।।“
কিকিরা হাসলেন। “লোকটা কে? কেন এভাবে যাচ্ছিল?”
.
॥ ৩ ॥
থানা ছোট। ইট রঙের বাড়ি। মাথায় টালির ছাদ। কম্পাউন্ডওয়াল বলে কিছু নেই। তফাতে দারোগাবাবুদের কোয়াটারস, অন্য পাশে সেপাই জমাদারদের। অন্তত তাই মনে হয়। গাছগাছালি কম নয় চারপাশে, মাঠও আছে। খানিকটা তফাতে বিশাল এক ঘোড়ানিম আর কাঁঠালগাছের তলায় একটা খাঁটিয়া পড়ে আছে। স্পষ্টই বোঝা যায়, সকালের সেই অজ্ঞাত মানুষটির মৃতদেহ।
কৈলাসনাথ শর্মা নিজের ঘরে বসে ছিলেন। কিকিরার ঘরে আসতেই শমজি বললেন, “বসুন। আপনাদের কথাই ভাবছিলাম।”
“দেরি হয়ে গেল?”
“না না, ঠিক আছে। “ বলে শর্মা তাঁর টেবিলের ওপর রাখা কাগজপত্র খাতা নাড়াচাড়া করলেন অন্যমনস্কভাবে। তারপর সাদামাটা গলায় যা বললেন–তার অর্থ হল তিনি সাধারণ একটা স্টেটমেন্ট লিখিয়েই চন্দনদের ছেড়ে দেবেন। এটা কোনও ডায়েরি নয়। মোটামুটিভাবে সকালে যা যা দেখেছে তারাপদরা, তা বললেই কাজটা মিটে যাবে। “ঘাবড়াবেন না, তামাকে আমার কাজটা করতে দিন, আপনাদের আমি এই মামলার সঙ্গে জড়াচ্ছি না।”
তারাপদ আর চন্দন যা বলার বলল। শর্মা নিজেই লিখে নিলেন খাতায়। তারপর খাতাটা এগিয়ে দিলেন। অর্থাৎ, আপনারা পড়ে দেখে নিন ভুলভাল লিখেছি কি না! তারপর একটা করে সই করুন প্লিজ।
তারাপদরা পড়ল। সই করে দিল।
কিকিরা বললেন, “আমাকে সই করতে হবে?”
“বেকার। আপনি সই করে কী করবেন! আপনি অনেক পরে এসেছেন। আমি তখন স্পটে প্রেজেন্ট ছিলাম। আরও বহুত লোক ছিল।”
সেপাই-জমাদার গোছের একটা লোক চার গ্লাস চা এনে টেবিলে রাখল। গ্লাসগুলো ছোট, কিন্তু পরিষ্কার।
“নিন বাবু, থোড়া চা পানি খান! পান সিগারেট খাবেন?”
“না না।” বলে চন্দন নিজেই পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করে এগিয়ে দিল।
শর্মা হাসলেন। বললেন, “সিগারেট আমি খাই না। প্যাকেটের খইনি খাই। খাবেন?” বলে টেবিলের ড্রয়ার টেনে খইনির প্যাকেট বার করলেন।
চন্দনরা মাথা নাড়ল। হেসে বলল, “বমি করে ফেলব দারোগাসাহেব, অভ্যেস নেই।”
চা খেতে খেতে কিকিরা বললেন, “ডেডবডিটা গাছতলায় ফেলে রেখেছেন? এবার তো পচতে শুরু করবে।”
শর্মা বললেন, “বিকেলে পাচার হয়ে যাবে।…রায়সাহেব, কী আজব বাত! আমি বিশ বাইশ জন লোককে থানায় হাজির করলাম : রেলস্টেশনের টিকিট কালেক্টর দু-তিনজন, এ এস এম পালবাবু, বাজারের হালুইঅলা লোচন, পানঅলা ভুলুয়া, ট্রেকারের ড্রাইভার মোহন–আরও ক’জন দোকানদার। ওরা বডি দেখল–আইডেন্টিফাই করতে পারল না। বলল, এই লোকটাকে তারা দেখেনি!”
