“শীতলবাবুর চলে কেমন করে?”
“সামান্য জমানো আছে। বাকিটা চলে বদ্যিগিরি করে। উনি একদিকে কবিরাজ অন্যদিকে হোমিওপ্যাথ। গাঁ গ্রামের গরিব মানুষ শীতলবাবুর কাছে আসে। সকালে ভিড় হয়।”
“ও! অন্য বাড়িটা কার?”
“কচি–মানে কাঞ্চনের। কচির দোকান আছে বাজারে। স্টেশনারি। পুরনো দোকান। কচি তার মাকে নিয়ে থাকে। ছোকরা বেশ তেজি।”
“মানে?”
“মানে কাউকে রেয়াত করে না। কথা বলে কটকট করে! এমনিতে ভাল।”
“ওকে কি সকালে দেখেছি ভিড়ের মধ্যে?”
“না। ওকে কেমন করে দেখবেন! আজ বৃহস্পতিবার। ওর দোকান বন্ধ। ও বুধবার সন্ধের গাড়িতে মালপত্র কিনতে ধানবাদ আসানসোল চলে যায়। আজ বিকেলে ফিরবে। আপনি শীতলবাবুকে দেখেছেন।”
“রোগা বুড়োমতন দেখতে। গায়ে মেরুন রঙের চাদর ছিল।”
“ঠিক ধরেছেন। চুপচাপ মানুষ।”
“বাকি তিনটে বাড়ি আপনার?”
“করেছিলাম এক সময়ে। এখন ভাড়া দিই। সিজন টাইমে ভাড়া হয়ে যায়-অন্য সময় ফাঁকা।”
কিকিরা কথা বলতে বলতে কাশলেন বার কয়েক। “এখন তিনটে বাড়িতেই ভাড়াটে আছে?”
“তা বলতে পারেন।” চামেলিবাবু পকেট থেকে সিগারেট বার করলেন। “খাবেন নাকি?” কিকিরা মাথা নাড়লেন, কাঁচা সর্দিতে গলা জ্বালা করছে। চন্দনরা সিগারেট নিল।
চামেলিবাবুর বাড়িটি মাঝারি। একতলা। পুরনো ধাঁচের বাড়ি। বারান্দায় বসে চা খাওয়া হচ্ছিল। সামনে আশেপাশে বাগান। বড় বড় গাছ। ফুলবাগান মামুলি। অনেকটা তফাতে গোয়ালঘর। একপাশে বড় ইঁদারা।
কিকিরা বললেন, “ভাড়াটে কারা? কোত্থেকে এসেছে?” চামেলিবাবু বললেন, “কলকাতা থেকে এসেছেন গণপতি পাঁজা। বলেন, আলসারের রোগী। জল হাওয়া বদলাতে এসেছেন। মোটেই মিশুকে নন। ঘোরাফেরাও বড় করতে দেখি না। কথাবার্তা বলেন কম। চোখমুখ দেখলে মনে হয় স্বভাবে খিটখিটে।”
“কী করেন কলকাতায়?”
“চিৎপুরে পাঁজাবাবুর দু’ পুরুষের দোকান। ডিজাইনার অ্যান্ড ড্রেস মেকার। বলেন তো তাই। থিয়েটার যাত্রার সাজ তৈরি করান। নকল চুল দাড়িও। বলেন, ড্রেস মেকার পাঁজা বললেই–এক ডাকে সবাই চিনতে পারে, থিয়েটার যাত্রা মহলে!”
“ও! একাই এসেছেন?”
“স্ত্রী মারা গিয়েছেন বছর কয়েক আগে। এখন ভৈরব বলে একটা লোকই পাঁজাবাবুর দেখাশোনা করে। অনেক কাল ধরেই ওঁর কাছে। “
“ভৈরব!”
“চেহারা দেখলে মনে হয় ডাকাত। যেমন তাগড়া তেমনই কালো। মাথার চুল একেবারে সেই হাবসি টাইপ। বেটার গলায় আবার কণ্ঠি।” চামেলিবাবু হাসলেন যেন।
“অন্য ভাড়াটে কারা?”
“গোল বারান্দাওয়ালা বাড়িটায় এসেছেন, মাখনলাল দত্ত, ভদ্র সজ্জন মানুষ, কলকাতায় এক ছাপাখানার ম্যানেজার। সঙ্গে স্ত্রী আর একটি বাচ্চা ছেলে। স্ত্রী বোধ হয় গানটান জানেন। আসা যাওয়ার পথে শুনেছি এক-আধবার।”
“একেও কি আজ সকালে দেখেছি?”
“না। অত সকালে এঁদের কাউকে বাইরে দেখা যায় না। বিকেলবেলায় বেড়াতে বেরোন। “
“তিন নম্বর ভাড়াটে কারা মশাই?” চামেলিবাবু এবার যেন সামান্য বিরক্ত হলেন। বললেন, “আর বলবেন না, আগে তো কিছু জানতাম না। না জেনেই ভাড়া দিয়ে দিয়েছি। দুটো ষণ্ডা এসে জুটেছে। জামশেদপুর থেকে মোটরবাইক হাঁকিয়ে এসে হাজির। দুই বন্ধু। একজন বলে, সে বড় এক ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেনটেটিভ, অন্য বন্ধুটি নাকি কপার কপোরেশানে। সে ছোকরা আবার খেলোয়াড়, হকি প্লেয়ার। দুই যেন মানিকজোড়। বয়েস কম। হুল্লোড় করে বেড়ায়। আবার কানে যন্তর লাগিয়ে নাচে। ওরা বোধ হয় বেশি দিন থাকবে না। ভাড়া অবশ্য পুরো মাসের দিয়েছে।”
“নাম কী?” চন্দন বলল।
“নামের বাহার আছে। একটার নাম, পল্লব; পল্লব মুখার্জি! আরেকটার নাম, লাডলি হালদার।”
“হকি খেলোয়াড়?”
“তাই হবে। বলে তো হকি খেলত! ওই দুটো ষাঁড় আমাকে জ্বালিয়ে মারছে।”
“কেন, কেন?”
“আরে মশাই, যখন তখন এসে নানান বায়নাক্কা করে।”
“কীরকম?”
“রকম আবার কী! মজা, খেয়াল, অন্যকে বিরক্ত করা। একবার হঠাৎ এসে বলল, মুরগির কী এক রান্না করবে, বাসন দাও!..আর একদিন এসে বলল, নাচ দেখবেন, ভাঙড়া নাচ?… দাদা চলুন না–একটু ফিশ খেলব। দু পয়সা পকেটে আসতে পারে…। আপনার বাগানে ভূত আছে নাকি–কে যেন মাঝরাতে নাক ডেকে ঘুমোয়! রসিকতা করে মশাই! সেদিন এসে বলল, ঘুমের বড়ি আছে? দিন না দুটো। সাউন্ড স্লিপ হচ্ছে না ক’দিন।”
তারাপদ হেসে ফেলল।
“হাসির কথা নয়। আমি ওদের বাপের বয়েসি। আমায় নিয়ে ঠাট্টা তামাশা!…তা সেদিন রেগে গিয়ে বলেছি, ওহে আমার বাড়িতে দোনলা বন্দুক আছে। দেখবে? তোমরা পুরনো বন্দুক দেখেছ! উইলসন রেঞ্জ! জানো না! একবার দেখবে! দেখে নাও! বলে জংলীকে ডাকলাম। জংলী আমার বাড়িতেই থাকে। জংলী বন্দুক এনে দিল। বন্দুক হাতে পেলে তার অবস্থাটা হয়ে দাঁড়ায় ভয়ঙ্কর। ওই দুটো ফাজিল ছেলেকে চোখের পলকে শেষ করে দিতে পারে।”
তারাপদ কৌতূহল বোধ করে বলল, “সর্বনাশ! ওরা জংলীকে বন্দুক হাতে দেখল!”
চামেলিবাবু মুখ টিপে হাসলেন। “দেখল বইকী! তারপর আর মুখে কথা নেই। পালিয়ে গেল। সেদিন থেকে আর জ্বালাতে আসে না।”
চন্দন চিনতে পারল ছোকরা দু’জনকে। কাল বিকেলেই বাজারের কাছে দেখেছে। মোটরবাইকে স্টার্ট দিচ্ছিল। জিনসের প্যান্ট আর গায়ে জ্যাকেট। বোম্বাই সিনেমার লড়াকু হিরোদের মতন দাঁড়িয়ে ছিল। তারাপদও দেখেছে। তবে কলকাতায় এসব আজকাল এত দেখা যায় যে, আলাদা করে চিনে রাখার দরকার করে না।
