শর্মাজির হুকুমমতন তার সেপাইরা হরিয়া ডোমদের দিয়ে খাঁটিয়া তুলিয়ে নিল। তারপর চলে গেল। থানাতেই যাবে।
ভিড়টা একবার নজর করে দেখে নিলেন শর্মাজি। চেনা মুখ সব। দরকারে ওদের থানায় হাজির করাতে অসুবিধে হবে না।
ভিড় সরে গেল। সেপাই আর হরিয়া ডোমরা আলপথ ছেড়ে মেঠো রাস্তায় নামল।
কিকিরা কী মনে করে পাথরটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। জল খানিকটা ঘোলাটে, কিছু জলজ লতাপাতা অবশ্য আছে, শ্যাওলাও। তবু ততটা নোংরা নয়। ধোপারা এখানে কাপড় কাঁচার সময় জল সরিয়ে যতটা পারে পরিষ্কার করে নেয়। লক্ষ করলে ভাটির বড় গামলা অবশ্য এখন চোখে পড়বে না। তবে রাখার জায়গা আন্দাজ করা যায়, নীল আর মাড়ের জায়গাও। ঝিলের ওপাশে মাঠে তারা কাপড় শুকোতে দেয়। গতকাল কিকিরার চোখে পড়েছিল বড় রাস্তা দিয়ে ফেরার সময়।
রোদ বাড়ছিল।
শর্মাজি চলে যাবেন।
চামেলিবাবু হঠাৎ বললেন শর্মাজিকে, “বহুত মেহনত হল শমজি। চলুন, একটু চা-পানি খেয়ে যাবেন।”
চামেলিবাবুর বাগান বা বাড়ি কাছেই। শ দুয়েক গজ। সামান্য বেশিও হতে পারে।
শর্মাজি কী ভেবে বললেন, “চলুন।”
চামেলিবাবু কিকিরাদেরও ডাকলেন। “আসুন রায়সাহাব।”
কিকিরা আপত্তি করলেন না।
তারাপদ হঠাৎ শর্মাজিকে বলল, “আপনি এমন বাংলা কোত্থেকে শিখলেন শর্মাজি?”
শর্মাজি দাঁড়িয়ে পড়ে হেসে ফেললেন প্রথমে; পরে জোরেই হাসলেন। বললেন, “আমি দাদা সেভেন্টি পার্সেন্ট বাঙালি। বর্ধমানে আমার মামার বাড়িতে থেকে স্কুলে লেখাপড়া করেছি। গ্রাজুয়েশান করেছি কলকাতায়। সেন্ট পলসে পড়তাম। পুলিশ লাইনে আসার মতলব আমার ছিল না। আমার বাবা নেই। আমি যখন বালবাচ্চা তখনই মারা গিয়েছেন। মামারা গার্জেন ছিলেন। আমার বড়মামা পুলিশের লোক। ধানবাদে ছিলেন, মামা আমায়…”
বাকিটা আর বলতে হল না, তারাপদরা বুঝে নিল।
সামান্য পথ চুপচাপ। তারপর কিকিরাই চামেলিবাবুকে বললেন, “চামেলিবাবু ভদ্রলোক কে? আপনি চেনেন না?”
“না।” মাথা নাড়লেন চামেলিবাবু।
“আপনি এখানকার বরাবরের বাসিন্দে। ঘোরাফেরাও করেন। ভদ্রলোককে দেখেননি?”
“না, রায়সাহাব। দেখিনি। লোকটা নতুন। একদম নয়া এসেছে।” বলে একটু থেমে আবার বললেন, “আমি থাকি একদিকে, এই শহরটার তিনদিকে চারটে মহল্লা। কে কোথায় আসছে জানব কেমন করে! একটু পুরনো হয়ে গেলে হয়তো স্টেশনে বাজারে পোস্টঅফিসে মুখটা দেখা যায়। এ লোক নতুন।“
তারাপদ নিশ্বাস ফেলে, বিষণ্ণ গলায় বলল হঠাৎ, “ভদ্রলোক এখানে মরতে এসেছিল। কী কপাল!”
প্রথমে চুপচাপ, পরে শর্মা বললেন, “কমপ্লিকেটেড কেস। যে মরতে আসে তার কোমরে ড্যাগারের বেল্ট থাকে? ফাঁকা বেল্ট পরেই বা সে আসবে কেন?” কী যেন ভাবছিলেন শর্মা। টর্চটা দেখছিলেন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। “অ্যান্ড এ টর্চ উইদাউট ব্যাটারি! স্ট্রেঞ্জ!”
আর কোনও কথা বলল না কেউ।
চামেলিবাবুর বাগানে বসে চা খাওয়া শেষ হতেই শর্মাজি উঠে পড়লেন। তাঁর অনেক কাজ। যাওয়ার সময় চামেলিবাবুকে বললেন, “লোকটার পাত্তা আমি নিয়ে নেব। ডেডবডি থানায় পড়ে থাকবে এখন। বিকেলে চালান করে দেব সদরে। বাদে যা হয় বড়সাহেবরা করবেন। চলি..” বলে চন্দনদের দিকে তাকালেন, “থানায় আপনারা একবার আসবেন। প্লিজ। সাড়ে দশ বাজে আসুন। ও. কে।”
শর্মা চলে যাওয়ার পর কিকিরারা চুপচাপ। সাত সকালে এমন একটা ঘটনা ঘটবে কে জানত! মন খারাপ না হয়ে উপায় কী!
চামেলিবাবু যেন হঠাৎ অনুতাপ বোধ করে বললেন, “রায়সাহাব, আমার বড় খারাপ লাগছে। আপনাদের বলেকয়ে বেড়াতে নিয়ে এলাম এখানে। দু দিন যেতে না যেতে ঝাট! মাফি চাইছি।”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। “না না, এতে আর আপনার দোষ কোথায়! জগতে কত কী তো হঠাৎ হয়ে যায়। ট্রেনে আসার সময় যদি একটা অ্যাকসিডেন্ট হত, ডাকাতের হাতে পড়তাম–আপনার কি তাতে দোষ থাকত!”
“আপনারা যখন থানায় যাবেন আমি সঙ্গে থাকব।”
“কোনও দরকার নেই। থানা চিনতে আমাদের অসুবিধে হবে না।”
তারাপদ বলল, “ডেডবডি সদরে পাঠাবার মানে কী, চামেলিবাবু?”
“সদরে হেড কোয়ার্টার। বড় পুলিশ অফিসাররা আছেন। সরকারি হাসপাতাল আছে। মর্গ আছে। বডির পোস্টমর্টেম হবে ওখানে।”
চন্দন মাথা হেলিয়ে বলল, “সাধারণ প্রসেসটা তাই। পোস্টমর্টেমটা জরুরি। অ্যাবনরমাল যে-কোনও মৃত্যুরই পোস্ট মর্টেম হওয়া উচিত। ওটা আইন। তবে আমাদের এখানে সব কাজ আইন মেনে হয় না।“ ।
চামেলিবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “এইসব ছোট গাঁ-গঞ্জে আইন বলতে পুলিশ । যা খুশি করতে পারে। … তবে শর্মা ভাল লোক। ভেরি গুড অফিসার। ওর বড়মামা ধানবাদ শহরে টেরার ছিলেন। মাফিয়াদের ঠাণ্ডা করে রাখার চেষ্টা করতেন ভদ্রলোক। অনেকবার ওঁকে মারার চেষ্টা হয়েছে…।”
কিকিরা যেন শুনছিলেন না কথাগুলো। অন্যমনস্ক। বললেন, “চামেলিবাবু আপনার এই বাগানের বাইরে গোটা পাঁচেক বাড়ি আছে, না?”
“হা, পাঁচ…।”
“বাড়িগুলো সব আপনার নয়?”
“তিনটে আমার। বাকি দুটো অন্যের। আমার কাছ থেকেই খানিকটা জমি কিনে বাড়ি করেছে।”
“কোন দুটো?”
“পশ্চিম দিকের। একটা বাড়ি শীতলবাবুর। ঘোলাটে দেখতে। হলুদ। ছোট বাড়ি। ভাঙাচোরা চেহারা। শীতলবাবু এখানেই কাজ করতেন একসময়। পোস্টমাস্টারবাবু। চাকরির পর এখানেই বাড়ি করে থাকতে শুরু করেন। প্রায় বুড়োমানুষ। ওঁর স্ত্রী আছেন। ছেলে ছিল। জোয়ান। বাপের সঙ্গে ঝগড়া করে রাঁচির দিকে চলে যায়। সেখানে কাজকারবার করে। বাপের সঙ্গে সম্পর্ক নেই বলতে পারেন। বিয়ে-থা করে নিজের মতন থাকে তফাতে।”
