সে যাই হোক ভাল পাওয়া যায়। খেপা যদু দরাদরিতেও ওস্তাদ। এখানকার লোক বলে তাকে সিজনবাবু ভেবে দু পয়সা বেশি কামাবার উপায় নেই।
তারাপদ বলল, “গুড মর্নিং নয় সার, ভেরি ব্যাড মর্নিং!”
“ব্যাড মর্নিং! কেন?”
“সাত সকালে একটা খারাপ জিনিস দেখলাম! মৃত্যুদৃশ্য!”
“মৃত্যুদৃশ্য! বলো কী?” কিকিরা অবাক। চন্দন বলল, “আমি এখনও মুখে জল দিইনি। মুখ ধুয়ে চা নিয়ে আসছি, তারা। তুই কিকিরাকে ব্যাপারটা বল।” চন্দন চলে গেল ।
কিকিরা কিছুই জানেন না। অনুমান করারও উপায় নেই। তাকিয়ে থাকলেন তারাপদর দিকে।
তারাপদ সকালের ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করতে লাগল। কিকিরা মন দিয়ে শুনছিলেন।
তারাপদ শেষ পর্যন্ত থামল। কিকিরা অল্পক্ষণ চুপচাপ। তারপর বললেন, “বাঙালি?”
“হ্যাঁ। আমাদের তো তাই মনে হল। বাঙালি ছাপ আছে।”
“কত বয়েস বললে, চল্লিশ-পঞ্চাশের মাঝামাঝি?”
“ওইরকম!”
“স্ট্রোক হয়েছিল নাকি? ভদ্রলোক জলেই বা নামতে যাবে কেন! আশ্চর্য! আর চাঁদুর কথা যদি ঠিক হয় তবে তো ভদ্রলোক শেষরাত বা মাঝরাতে মারা গিয়েছে। অত রাতে সে ঝিলের পাড়ে যাবে কেন! আশ্চর্য ব্যাপার!” বলে মাথা নাড়তে লাগলেন কিকিরা।
.
।। ২ ।।
খানিকটা বেলায় কিকিরা চন্দনদের নিয়ে যখন ঝিলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন, তখন সেখানে বেশ ভিড় জমে গিয়েছে।
এখানকার থানা ছোট। নামেই পুলিশ স্টেশন। কাজকর্ম বিশেষ থাকে না। ছোটখাটো চুরি, গাঁ-গ্রামে দু’পক্ষের ঝগড়া লাঠালাঠি, কখনও বা বাজারের দিকে হইহল্লা থামিয়েই পুলিশের কাজ মিটে যায়। অবশ্য কদাচিৎ গাঁয়ের দিক থেকে খুনখারাপি, বিষ-খাওয়ার ঘটনাও এসে পড়ে। তখন দারোগাবাবুকে খানিকটা নড়েচড়ে বসতে হয় ।
কিকিরারা গিয়ে দেখলেন, থানা থেকে দারোগাবাবু এসে গিয়েছেন, সঙ্গে জনা দুয়েক গোঁফওয়ালা সেপাই। ওদিকে চামেলিবাবুও এসেছেন, তাঁর এলাকার দু-চারজন বাবু আর বাড়ির কাজের লোক। কৌতূহলী মানুষও রয়েছে।
কিকিরাদের দেখে চামেলিবাবু এগিয়ে এলেন।
কিকিরা বললেন, “কী হল চামেলিবাবু? হুট করে একটা লোক এভাবে মারা গেল।”
চামেলিবাবু বললেন, “এখানে কেউ এভাবে মরেনি রায়সাহাব! আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।” বলে দারোগার দিকে তাকালেন। “আমাদের থানার অফিসার। আসুন পরিচয় করিয়ে দি।” কিকিরাকে চামেলিবাবু কখনও বলেন ‘রায়সাহাব’, কখনও ‘রায়বাবু।
দারোগাবাবুর নাম কৈলাসনাথ শর্মা। লোকে সাধারণত শর্মাজি বলে ডাকে। বয়েসে ছোকরাই; বছর পঁয়ত্রিশ হয়তো। মজবুত স্বাস্থ্য। চোখেমুখে পুলিশ অফিসারের রূঢ়তা ও কাঠিন্য নেই। বরং মোলায়েম ভাব। মুখে সামান্য দাড়ি। গোঁফটি ছোট করে ছাটা।
পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর শর্মাজি তারাপদ আর চন্দনকেও দেখলেন। কে যেন কিছু বলল ভিড়ের মধ্যে থেকে। চন্দনকে দেখিয়ে। গোড়া থেকেই ছিল বোধ হয় সে।
শর্মাজি চন্দনকে বললেন, “আপ ডক্টর? আপনি ডাক্তার?” হিন্দি বাংলা মিশিয়েই বললেন। “এরা বলছে, আপনি ওই লোকটির হাত তুলে পাস দেখেছেন?”
চন্দন মাথা হেলিয়ে বলল, “হ্যাঁ। আমি ডাক্তার। আমি ওকে দেখেছি। দেখেছি যখন তখন ও আর বেঁচে নেই। ডেড। “
“আপনিই প্রথম দেখেছেন?”
তারাপদ বলল, “না দারোগাজি, আমিই প্রথম দেখেছি।” বলে যা যা ঘটেছিল তারাপদ বলল পর পর।
দারোগা শর্মা কিছু বলার আগেই এক সেপাই এগিয়ে এসে বলল, “খাঁটিয়া আর হরিয়া ডোম আসছে, সঙ্গী নিয়ে।”
একটা ভাঙাচোরা দড়ির খাঁটিয়া নিয়ে দুজন লোক আসছিল। পুব দিকের মেঠো রাস্তা দিয়ে।
শর্মাজি মানুষটি ভাল। কিন্তু পুলিশ তো! আইন তাঁকে মানতেই হয়। চন্দনদের বললেন, “আপনাদের একবার থানায় যেতে হবে। ডর পাবেন না। রুটিন স্টেটমেন্ট নিতে হবে আমাকে।… আধা ঘণ্টা এক ঘণ্টা পরে আসবেন আপনারা, আগে এই বডিটা তুলে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করি।”
কিকিরা চামেলিবাবু আর তারাপদরা একপাশে সরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল, অন্যপাশে ভিড়ের মানুষ।
গাঁয়ের লোক বোধ হয় এ-ধরনের মরা মানুষ ছোয় না। জাত-পাত তো আছেই। তার ওপর বেমক্কা এক মরা লোক টানাটানি করে কে আর কোতোয়ালির নানান ফঁদে জড়িয়ে পড়তে চায়।
হরিয়া ডোমরা মাত্র দু’জন। জল আর পাথরের জায়গাটা তারা একটু পরিষ্কার করে নিল জল সরিয়ে–তারপর লোকটাকে টেনে তুলল। অর্ধেক শরীর ভেজা, কয়েকটা জলো লতা জড়ানো পায়ের দিকে। ভিজে সপসপে পাজামা। পায়ে স্ট্র্যাপ বাঁধা চটি, কোমরের তলায় একটা চামড়ার বেল্ট। পাজামার ওপর বেল্ট–বেশ অদ্ভুত ব্যাপার। তার চেয়েও অদ্ভুত বেল্টের বাঁ দিকে একটা খাপ। দেখলেই বোঝা যায়, পিস্তল নয়, ছোরা বা ড্যাগার রাখার খাপ। খাপটায় অবশ্য কিছু নেই। বাঁট বা মুখ দেখা যাচ্ছিল না ড্যাগারের।
লোকটাকে খাঁটিয়ায় শোয়ানো হল। প্রায় ধপ করে ফেলে দিল ডোমরা। নোংরা মারকিন বড় কাপড় সঙ্গেই ছিল তাদের। লোকটিকে দেখে গায়ে ফেলে দিল, মুখও ঢেকে দিল। এক সেপাই একটা কালো চাদর রেখে দিল খাঁটিয়ার পাশে। গরম চাদর।
চামেলিবাবু শর্মাকে জিজ্ঞেস করলেন, “চাদর কোথায় পেলেন?”
“মাঠে পড়ে ছিল–” বলে জায়গাটা দেখালেন। “একটা টর্চও পাওয়া গিয়েছে। এ টর্চ উইদাউট ব্যাটারি।”
“আচ্ছা! আজব ব্যাপার। টর্চ আছে ব্যাটারি নেই।”
“ওহি তো বাত।”
