তারাপদ বলল, “চাঁদু এখন কী হবে?”
“এরা কাউকে খবর দিক। কাছাকাছি বাড়িতে গিয়ে বলুক–যদি তাদের চেনা লোক হয় ভদ্রলোক। তারপর থানা…।”
“থানা?”
“থানায় তো বলতেই হবে। তাদের লোক এসে দেখুক। ডেডবডি তুলে নিয়ে যাক। যা করার তাদেরই করতে হবে। দায়িত্ব তাদের।”
আরও দু’-একজন এসে পড়েছে ততক্ষণে । আলপথে আসা-যাওয়া করে অনেকেই। হাঁকডাকও শুনেছে অন্যদের। ঝিলের পুব দিকে মেঠো রাস্তা। তার গায়ে-গায়ে চামেলিবাবুর বাগান। আসলে পাঁচিল-ঘেরা সাত-আট বিঘে জমি, গাছপালার শেষ নেই, নিম কাঁঠাল শিরীষ থেকে আম জাম পর্যন্ত। কলকে করবীর ঝোঁপও আছে। আছে বেলফুলের কুঞ্জ, গাদার ঝোঁপ। ওরই মধ্যে চামেলিবাবুর বসতবাড়ি। বাড়িটা এমন কিছু বড় নয়, সুদৃশ্যও নয়, একতলা বেছাদ বাড়ি। পুরনো দিনের ধরন-ধারণে জানলা দরজা।
চামেলিবাবুর এই বাড়িটাকেই লোকে বলে চামেলিবাবুর বাগান। বাগানের গা ঘেঁষে তার কিছু জমি আছে। সেখানে মামুলি ছাদের আরও কয়েকটা বাড়ি । বাড়িগুলোর তিনটি চামেলিবাবুর। তিনি ভাড়া দেন। সিজন টাইমে দু-তিনমাস ভাড়াটে থাকে। বাকি দুটি বাড়ি তার নয়। সেখানে স্থায়ীভাবে অন্য দুই পরিবার থাকে ।
চন্দন বলল, “চল আমরা যাই। মুখ ধোওয়া চা খাওয়া পর্যন্ত হয়নি। কিকিরাও বোধ হয় উঠে পড়েছেন। পরে আবার আসা যাবে।”
তারাপদ ইতস্তত করে বলল, “যাব?”
“দাঁড়িয়ে থেকে আর আমরা কী করব!” বলেই চন্দনের কী মনে হল, দেহাতি লোকগুলোকে বলল, “আরে, কোই যাকে কুছ খবর দে দেও চামেলিবাবুকো। জলদি।”
সামান্য অপেক্ষা করে কে যেন বলল, “বাত তো ঠিক হায়–” বলে ছোকরা মতন লোকটা আলপথ দিয়ে ছুটতে লাগল। চামেলিবাবুকে খবরটা দিতে হবে ।
চন্দনরা আর দাঁড়াল না, ফিরতে লাগল। তারাপদ বলল, “ব্যাপারটা কী বল তো?”
“কীসের?”
“লোকটা কি জলে নেমেছিল? কেন নামবে?”
“বুঝতে পারছি না।”
“অত বড় পাথরটাই বা কেন থাকবে ওখানে?”
“পাথর আরও দু-একটা আছে এদিক-ওদিক। কাল আমরা যখন বেলায় ফিরছিলাম বাজার থেকে রাস্তা ধরে, আমি দেখেছি দুটো ধোপা ওখানে ভাটির কাপড় আছড়াচ্ছিল।”
“ধোপারা ওখানে কাপড় কাঁচে?”
“তাই তো দেখলাম।”
ব্যাপারটা ঠিক লক্ষ করেনি তারাপদ। এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে! মাত্র তো দু’দিন হল এসেছে তারা। গত পরশু বিকেলের দিকে। স্টেশন থেকে ওদের বাড়িটা মাইল খানেকের কম নয়। শর্টকাট করে মাঠ ভেঙে এলে সামান্য কম হয়। প্রথম দিন কে আর মাঠ ভেঙে আসে। তার ওপর সকালের দিকে বাজারে চক্কর মেরে বেড়িয়ে ফেরার সময় তারাপদ গাছপালা, দু-একটা ঘরবাড়িই লক্ষ করছিল। বিকেল বলতে এখন এক ফোঁটা । আলো মরছে কি সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার। স্টেশন, ডাকবাংলো, বাজারের জায়গাটুকু ছাড়া আলো নেই। তাও ইলেকট্রিকের আলো শুধু স্টেশন, বুকিং অফিস আর মুসাফিরখানায়, বাকি সব কেরোসিন ল্যাম্প। দোকানে পেট্রম্যাক্স।
তারাপদদের বাড়িটা চামেলিবাবুর জুটিয়ে দেওয়া। ছাদ পাকা, তবে মেঝে যেন খরখরে । সিমেন্ট আছে ঠিকই, কিন্তু কতটুকু কে জানে! বাড়িতে সরাসরি জলের ব্যবস্থা নেই; পাশের কুয়া থেকে একটা ছোকরা সকাল দুপুর জল তুলে দিয়ে যায়। রান্নার লোক খেপা যদু। পুরো নাম যাদব রায়। আদি বাড়ি বর্ধমান জেলার কোনও গ্রামে। যাদব অনেককাল থেকেই এখানে। অভয়বাবুর ভাত ডালের সস্তা হোটেল থেকে নিমাদের মিঠাইয়ের দোকানে কাজ করেছে। একবার পানের দোকান দিয়েছিল, ফেল মেরে গেল। তারপর কী খেয়াল হল দরজির দোকান বসাল বাজারে। সেটাও উঠে গেল। এখন সে যমুনাবাবুর কুঠিতে থাকে। নজরদারি করে। বাকি সময়টায় চামেলিবাবুর বাড়িতে ফাঁই ফরমায়েশ খাটে।
চামেলিবাবুই খেপা যদুকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। লোকটা দেখতে কাঠি, কিন্তু গলায় যেন মাইক ফিট করা। জোরালো গলা। ভাঙা ভাঙা স্বর। বকবক করে ভীষণ। তারাপদর ধারণা, খেপা যদু গাঁজা ভাঙ খায়।
তারাপদ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। চন্দনের কথায় ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। “কিছু বললি?” চন্দন বলল, “লোকটা–মানে ভদ্রলোকের বয়েস কত বলে তোর ধারণা?”
“কার! যে মারা গিয়েছে?”
“হ্যাঁ।”
“কত! চল্লিশের কম নয়, পঞ্চাশের বেশিও না। মাঝামাঝি।”
“স্বাস্থ্য তো ভালই মনে হল।”
“সলিড । ফাপা নয়। গায়ে ক্ষমতা আছে বলে মনে হয়।”
“দেখতেও মোটামুটি ভাল। তবে মাথার চুল কম। মনে হল, সবেই চুল ছেটেছে।”
“কী জানি! গায়ের রং একরকম ফরসা! তাই না! পরনে পাজামা, গায়ে পাঞ্জাবি। বাঙালি বলেই মনে হল। হাতের আঙুলে একটা তামার তারের আংটি। কেন কে জানে?”
“আমারও তাই মনে হয়। বাঙালি।”
“বেচারা!”
কথা বলতে বলতে বাড়ির কাছে এসে পড়ল দু’ জনে।
কিকিরা বাইরে একচিলতে বারান্দায় বসে আছেন। কাঠের মামুলি চেয়ারটা প্রায় বারান্দার শেষ প্রান্তে। রোদ এসেছে বারান্দায়। কিকিরার হাতে চায়ের পেয়ালা। পেয়ালা না বলে মগ বলাই ভাল। বসে বসে চা খাচ্ছিলেন। গায়ে হালকা গরম চাদর, গলায় মাফলার জড়ানো।
কিকিরা বললেন, “এই যে চন্দ্র-তারা! গুড মর্নিং। কোথায় গিয়েছিলে তোমরা? মর্নিং ওয়াক! চা যে জুড়িয়ে জল হয়ে গেল! যাও চা-টা ঢেলে নিয়ে খেয়ে নাও। আমিই করেছি। যদুবাবু এখনও আসেননি।”
খেপা যদু একটু বেলা করেই আসে। আসার সময় বাজার ঘুরে এটা-ওটা কিনে নিয়ে আসে। বলাই আছে তাকে। সকালের দিকে আনাজগুলো–তা
