অনেককাল আগে রেল কোম্পানি লাইন পাতার কাজ চলার সময় এখানে কুলি-লাইন বসিয়েছিল বলে শোনা যায়। তারপর গত বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সাহেবরা এখানেই চুপিচুপি বিশাল কাটাতারের বেড়া দিয়ে ছোট একটা পি. ও. ডবলু, মানে প্রিজনারস অব ওয়ার-এর ক্যাম্প বসিয়েছিল। সেসব কথা পুরনো। তারও পরে আশেপাশের রেল কলোনির কিছু অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সাহেবরা ছোট ছোট বাংলো বাড়ি বা কটেজ করে বসবাসের চেষ্টা করে । মন হয়তো বসেনি শেষপর্যন্ত; কেউ কেউ মারা গেল, কেউবা দেখল ছেলেমেয়েরা অন্যত্র চলে যাচ্ছে একে একে, তারা নিঃসঙ্গ, একা। এই পর্বও ঘুচে গেল একদিন। এখন হাবিলগঞ্জ নিতান্তই এক স্বাস্থ্যকর ছোট মফস্বলি শহর।
কিকিরা তার দুই চেলা নিয়ে এখানে দিন কয়েকের জন্য বেড়াতে এসেছেন। তাও চামেলিবাবুর জন্য। চন্দন আর তারাপদ অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ছুটি নিয়েছে। দিন পনেরো না হলেও দিন দশেক থাকার ইচ্ছে তাদের।
চামেলিবাবুর কথা পরে, আগে আজ সাত সকালে যে-ঘটনাটি ঘটে গিয়েছে তার কথা বলা যাক।
.
চন্দন আর তারাপদ প্রায় ছুটতে ছুটতে ঝিলের দিকে যাচ্ছিল।
চন্দন বলল, “ব্যাপারটা কী?”
তারাপদ বলল, “ভোর ভোর উঠে আমি খানিকটা বেড়াতে বেরিয়েছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে ওই ঝিলের দিকে গিয়েছি, ঝিলের গায়ে বড় আল দেওয়া যে পথ সেখান দিয়ে যাচ্ছি, দেখি একটা লোক ঝিলের পাশে পড়ে আছে। তার মাথাটা বড়সড় এক পাথরের ওপর, কোমরের দিকটা জলের তলায়। আমি ভাবলাম, লোকটা হয়তো পা পিছলে বেকায়দায় পড়ে গিয়ে চোট পেয়েছে। মাথায়। তাকে ডাকলাম, জল ছিটিয়ে দিলাম চোখে মুখে। কোনও সাড়া নেই। ভেবে দেখ, এখন ঝিলের জল কত ঠাণ্ডা! সারারাতের হিমে জল তো বরফ।”
চন্দন অবাক হয়েই বলল, “চল, দেখি!”
বাড়ি থেকে ঝিল অন্তত সাত আট শ গজ। হাজারও হতে পারে। ওটাকে ঠিক ঝিল বলাও যাবে না। বড় পুকুর বা দিঘি হতে পারে। ঝিলের গা ধরেই এদিককার বড় রাস্তা। উত্তর দিকে। রাস্তাটা কাঁচা, নুড়ি পাথর আর কাদাটে মাটি ছড়ানো। ঝিলের উত্তর দিকের রাস্তাটাই এদিককার বড় রাস্তা। রাস্তাটা চলে গিয়েছে বরাবর; আধ মাইলটাক দূরে বাজার, রেলস্টেশন। লোকে সাধারণত এই পথ ধরেই আসা-যাওয়া করে স্টেশন বা বাজারে। তবে চামেলিবাবুর বাগান আর তার এলাকার মধ্যে যেসব ছোটখাটো ঘরবাড়ি আছে, এমনকী সামান্য তফাতে এক দেহাতি ছোট গাঁ –সেখানকার লোজন কাজেকর্মে এ দিকে আসতে হলে ঝিলের দক্ষিণ দিকের রাস্তা ধরেই আসে। অবশ্য ওটা রাস্তা নয়, মাটির উঁচু পাড় বা আলপথ । চওড়া মন্দ নয়। আলপথের এ-পারে ঝিল, অন্য পারে খেত-খামারি। গরমের দিন দু’চার হাত আল কেটে মাটি সরিয়ে জল দেওয়া হয় খেতিতে। এপাশে কোনও নদীনালা নেই। ঝিলটা নেহাতই প্রকৃতির দয়ায় কোনওকালে দেখা দিয়েছিল কি না কে জানে! তবে বেশ বড় ঝিল বা দিঘি। জল তেমন পরিষ্কার নয়; শ্যাওলা শালুক জলজ লতাপাতাও যথেষ্ট। আলের পাশে হেলে-পড়া দু-একটা বড় গাছগাছালিও আছে। চোখে দেখতে ভালই লাগে।
ততক্ষণে রোদ উঠে গিয়েছে। একেবারে কাঁচা রোদ নয়, আকাশ পরিষ্কার, সূর্য ঝকঝক করছে। পাখি উড়ে যাচ্ছিল, বাতাসে হালকা শীত।
তারাপদরা প্রায় ছুটতে ছুটতে ঝিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
দু-তিনজন দেহাতি জুটে গিয়েছে ইতিমধ্যে। হয়তো তারা কাজেকর্মে যাচ্ছিল আলপথ ধরে, একজন বাবু-লোক ওইভাবে পড়ে আছে দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছে জায়গাটায় ।
তারাপদ বলল, “ওই যে–!”
চন্দন আগেই দেখতে পেয়েছিল। একবার দেহাতি মানুষগুলোর দিকে তাকাল চন্দন, তারপর জলের কাছে নেমে গেল।
দেখল লোকটিকে। বাঙালি বলেই মনে হয়। দিন দুই হল চন্দনরা এখানে এসেছে। ঘোরাঘুরি সামান্য যা করেছে এ পর্যন্ত–তাতে এই লোকটিকে নজরে পড়েনি কোথাও।
চন্দন জলের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে লোকটির মুখ দেখল। ডাক্তারি চোখে নজর করল যেন। তারপর একটি হাত তুলে নিল তার। নাড়ি দেখল। মুখ গম্ভীর হয়ে গেল কখন। হাত নামিয়ে দিল লোকটির। বোজা চোখের পাতা টেনে টেনে চোখ দেখল। গলার কাছে হাত দিল একবার, চোয়ালের তলায়। লোকটির মাথা একপাশে কাত হয়ে আছে শুকনো পাথরের ওপর। খানিকটা রক্ত। জমাট, কালচে।
উঠে এল চন্দন।
“কী রে?”তারাপদ বলল উদ্বিগ্ন গলায়।
“ডেড!”
“মারা গিয়েছে,” আঁতকে উঠল তারাপদ। “কীভাবে? কখন?”
চন্দন চারপাশে তাকাল। সকালটি নিশ্চয় সুন্দর; একঝক বক উড়ে যাচ্ছে, দূরে ট্রেনের হুইসিল, মাঠ এখন খাঁখা, প্রথম শীতের বাতাস, রোদের রং আরও গাঢ় হয়ে এল। এমন এক সকালে এ কী বিশ্রী কাণ্ড!
চন্দন বলল, “কখন মারা গিয়েছে বলতে পারব না। তবে দু-এক ঘণ্টার মধ্যে নয়। আমার মনে হয় মাঝরাতের দিকে। আন্দাজে বলছি।”
দেহাতি লোকগুলো চন্দনকে দেখছিল। তারা জানে না, চন্দন ডাক্তার । কিন্তু ওর জলে নামা, নাড়ি দেখা, চোখ দেখা থেকে অনুমান করে নিল ওই বাঙালিবাবু নিশ্চয় ডাক্তার বদ্যি হবে। তারা তাকিয়ে থাকল, শুনতে চাইল বাবু কী বলে!
“তোমরা একে চেনো?” চন্দন বলল, “জান-পয়ছান?”
“না।” মাথা নাড়ল ওরা।
“বাবু জিন্দা নেই। মারা গিয়েছে।”
না-জানুক বাবুকে ওরা, হয়তো ওরাও এই রকম খারাপ কিছু অনুমান করছিল, চন্দনের কথায় একটা গুঞ্জন উঠল। সকলেই যেন হতবাক, বিষণ্ণ।
