হীরালাল কথা বলতে পারছিলেন না। অসহায়ের মতন মুখ করে যশোদার দিকে তাকালেন। তাঁর চোখ জলে ভরে আসতে লাগল। বিপন্ন, হতবুদ্ধি মানুষ।
কিকিরা বললেন, “কী হয়েছিল?…আমি আপনার লেখা কাগজের টুকরোগুলো পড়েই বুঝেছিলাম–আত্মহত্যা করার মানুষ আপনি নন। এখানেই। কোথাও লুকিয়ে আছেন।”
হীরালাল আধ-বোজা গলায় বললেন, “আপনারা আমায় ধরে আনলেন!”
“আমরা নিমিত্ত; আপনাকে ধরে এনেছে–আপনার কৃষ্ণধাম। আপনার এত সাধের, এমন ভক্তি-ভালবাসার বাড়ি, বিগ্রহ পুড়ে যাবে-সে কি আপনি জীবন থাকতে সইতে পারেন! দেখুন মশাই–মানুষ যা ভালবাসে অন্তর দিয়ে, ভক্তি করে, বিশ্বাস করে তার ক্ষতি সইতে পারে না। আপনি ধার্মিক মানুষ, বিশ্বাসী মানুষ, ন্যায়-অন্যায় বোধ রয়েছে। কিন্তু কোন আঘাতে অভিমানে আপনি চিঠিগুলো লিখেছিলেন বলুন তো?”
হীরালাল প্রথমটায় কথা বলতে পারছিলেন না। ঠোঁট কাঁপছিল।
“বলুন! সত্যি কথাই বলুন।”
“আমার বড় ছেলে–” হীরালাল বললেন। “আমার বড় ছেলে কানাই যা করতে যাচ্ছিল তার চেয়ে বড় অন্যায় অধর্ম কী হতে পারে!”
“কী করতে যাচ্ছিল?”
“আমাদের শ্যামবাজারের আদি দোকানে আগুন লাগাবার ফন্দি করেছিল। দোকানের গায়ে একটা ছোট দরজির দোকানও আছে। ভাল চলে না আজকাল। আমাদের দোকান অনেক আগেই ইনসিওর করিয়ে নিয়েছিল ছেলে। পরে আরও মোটা টাকায় ইনসিওর করায়। দোকান বেড়েছে, মালপত্র বেড়েছে, কাজেই অসুবিধে হয়নি।”
কিকিরা তারপদদের দিকে তাকালেন।
হীরালাল বললেন, “হঠাৎ একদিন আমার কানে গেল, কানাই দোকান থেকে তলায় তলায় দামি শাড়ি কাপড়চোপড় সরাচ্ছে। এর পর ভাড়াটে লোক দিয়ে আগুন ধরাবে। তারপর ইনসিওরেন্স থেকে টাকা নেবে। বখরার ব্যবস্থাও করে রেখেছিল বোধ হয়। দোকান পুড়িয়ে সে নতুন করে সাজিয়ে পশার বসাবে। এয়ারকন্ডিশন করবে। দরজির দোকানটাকে কিছু টাকা দিয়ে তুলে দেবে।…বলুন, এ অধর্ম নয়, পাপ নয়, জুয়াচুরি নয়। আমি আমার কাঁধে, মাথায় শাড়ির বোঝা বয়ে জীবন শুরু করেছিলাম। অনেক রক্ত জল করে আমার ওই দোকান। প্রায় চল্লিশ বছরের…! সেই দোকানে আজ ও আগুন লাগাবে!” হীরালাল কপাল চাপড়ে ছেলেমানুষের মতন কেঁদে ফেললেন।
তারাপদ বলল, “আপনি ছেলেকে বলতে পারেননি কিছু?”
“না বাবা, পারিনি। যদি অস্বীকার করত! তা ছাড়া কী জানো? সন্তানস্নেহ মানুষকে শুধু অন্ধ করে না, তার বিবেককেও বোবা করে রাখে। ধৃতরাষ্ট্রের কথাই মনে করো।”
কিকিরা বললেন, “আপনার বড় ছেলে দেখছি অতি ধূর্ত, সে নিজে গিয়ে কাশীতে বসে থাকল কাজের ছুতোয়, আর এখানে দোকান পোড়াবার জন্যে লোক লাগিয়ে গেল! যেন তাকে কেউ সন্দেহ না করে।”
“ঠিকই বলেছেন আপনি।…আমি ভেবেছিলাম চিঠিগুলো ছেলেদের হাতে পড়লে হয়তো…”
“আপনার মেজো ছেলে, ছোট ছেলে–এসব কিছু জানে না?”
“না।”
“আপনি কোত্থেকে জানলেন?” হীরালাল মুখে বললেন না কিছুই। শুধু ঘাড় তুলে একবার যশোদার দিকে তাকালেন।
“তা কোথায় লুকিয়ে ছিলেন এতদিন?”
“মিশনারিদের বাড়িতে। ওখানকার সরকারবাবু আমার জানাশোনা। বন্ধুর মতন। ওঁর আশ্রয়েই ছিলাম।”
কিকিরা তারাপদদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
৩.২ ঝিলের ধারে একদিন
চাঁদু, শিগগির ওঠ। চাঁদু–” তারাপদ জোরে ধাক্কা মেরে চন্দনকে জাগিয়ে তোলবার চেষ্টা করল।
চন্দন যে ঘুমকাতুরে স্বভাবের তা নয়। ডাক্তার মানুষ, এক সময় হাসপাতালে দিনের পর দিন রাত জেগে কাজ করেছে। এখন অবশ্য তা করতে হয় না। তবে রাতবিরাতে তাকে ঠেলাঠেলি সহ্য করতেই হয়। পেশাদারি প্রাইভেট প্র্যাকটিস করা ডাক্তার না হলেও কখনও কখনও কিছু সামাজিক কর্তব্য তো থাকেই।
গায়ের হালকা কম্বলটা মুখের ওপর টেনে নিয়ে চন্দন পাশ ফিরল। মানে, বোঝাতে চাইল, যা ঝামেলা করিস না, ঘুমোতে দে।
চন্দনের গায়ের কম্বল টান মেরে উঠিয়ে নিল তারাপদ। “ওঠ, শিগগির ওঠ। সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড হয়ে গিয়েছে, তুই পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস! উঠে পড়। হারি আপ।”
চন্দন চোখ চাইল। সকাল হয়ে গিয়েছে বুঝতে তার কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল। মাথার দিকের জানলা বন্ধ থাকলেও পায়ের দিকের জানলা খোলা। পাশের একটা আধ-ভেজানো জানলা দিয়েও সকালের ফরসাটে ভাব বোঝা যায় ।
চন্দন হাই তুলতে তুলতে উঠে বসল। “তোর মর্নিং ওয়াকে আমি নেই। কেন ডিস্টার্ব করছিস ফর নাথিং। ঘুমোতে দে।”
“ঘুমোতে হবে না। শিগগির চল। একটা লোক ঝিলের কাছে পড়ে আছে। হয়তো মারা গিয়েছে।”
মারা গিয়েছে–শোনামাত্রই চন্দন যেন চমকে উঠল। চোখের পাতায় ঘুমের রেশ থাকলেও চেতনায় আর না-ঘুম না-আলস্য। অবাক হয়ে বলল, “কী বলছিস?”
“দেখবি চল।”
চন্দন লাফ মেরে উঠে পড়ল। পরনে পাজামা, গায়ে পাতলা কস উলের
এক খাটো ঢলঢলে পাঞ্জাবি। কোনও রকমে গায়ের গরম চাদর টেনে নিয়ে চটিতে পা গলিয়ে দিল চন্দন। “চল। কিকিরাকে ডেকেছিস?”
“না। কাল ওঁর কঁচা সর্দিতে জ্বর-জ্বর ভাব হয়েছিল। এত সকালে ডেকে কাজ নেই।”
দু’জনেই বেরিয়ে পড়ল।
বাড়িটা ছোট। দু’কামরার মতন। রান্নাবান্না স্নানের ব্যবস্থা অবশ্য আছে। হাত কয়েকের বুনো বাগান। ছোট কাঠের ফটক। কাটাতার আর কাঠকুটোর একটা মামুলি ফেন্সিং।
এখন যে শীতকাল তাও নয়। হেমন্তের শেষ প্রায়। অগ্রহায়ণ মাস। তবু এখানে শীত এসে গিয়েছে। এ তো কলকাতা শহর নয়, শ’ তিন মাইল দূরের বিহারের আধা মফস্বলি পাহাড়ি জায়গা। না, ঠিক পাহাড়িও বলা যাবে না, পাহাড়তলির ছোট্ট জায়গা বলা যেতে পারে। পাহাড় অনেকটাই দূরে। তবে এখানকার মাটি শক্ত, মাঠঘাট উঁচুনিচু, সমতল ভূমি বড় একটা চোখেই পড়ে না, চারপাশে কত যে বুনো ঝোঁপ আর পাথরের টুকরো ছড়ানো রুক্ষ মাঠ, তার হিসেব পাওয়া ভার। গাছের মধ্যে নিম জাম কাঁঠাল আর হরীতকী বেশি। পলাশ মহুয়াও আছে।
